মো. নমশের আলম, শেরপুর
তুলা একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তুলা চাষ হলেও উৎপাদন চাহিদার তুলনায় অনেক কম। তবে আশার কথা, শেরপুরের কৃষকরা দিন দিন তুলা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় এ অঞ্চলের কৃষকরা এখন তুলা চাষের দিকে ঝুঁকছেন। শেরপুর জেলার উর্বর মাটি ও অনুকূল আবহাওয়া তুলা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। তুলা চাষে তুলনামূলক কম খরচ হলেও লাভের পরিমাণ বেশি হওয়ায় কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। শেরপুরের তুল চাষীরা জানান, একরপ্রতি তুলা চাষে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়, আর ফলন হয় ৪০-৪৫ মন। এতে একরপ্রতি ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ হচ্ছে।
নন্দীর বাজার এলাকার তুল চাষি আমিনুল ইসলাম বলেন, “আমি তিন বছর ধইরা তুলার আবাদ করতাছি। আগে এই জমিতে কোনো ফসল ভালা হইত না। তুলা আবাদ কইরা এহন এই ৩ বিঘা জমি থাইকা প্রতি মৌসুমে লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ থাকে। তুলা বেচার জন্যও কোনো ঝামেলা নাই, তুলা অফিস থাইকা সব তুলা নগদ টাকায় কিইনা নেয়।”
কান্দশেরী চরের কৃষক ঈদু মিয়া বলেন, “অন্য আবাদের চাইতে তুলার আবাদে লাভ বেশী। একরে খরচ হয় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা আর ফলন হয় ৪০-৪৫ মন। তাতে একরে লাখ টাকা লাভ পাওয়া যায়। তুলা অফিস এবছর ৪ হাজার ২০০ টাকা মন দাম দিতাছে। তবে দাম বাড়ালে তুলার আবাদ আরও বাড়বে।”
শেরপুরের তুলা উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জেলায় ১১০ হেক্টর জমিতে তুলা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা শতভাগ অর্জিত হয়েছে।
বাংলাদেশে তুলার সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় সুতা ও কাপড় তৈরিতে। এছাড়াও লেপ-তোশক, টিস্যু, ভোজ্যতেল, সাবান ও পশুখাদ্য তৈরিতে তুলার বীজ ব্যবহৃত হয়। তুলা গাছের শুকনো ডাল জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশে তুলার বার্ষিক চাহিদা ৮৫ লাখ বেল হলেও, উৎপাদন হয় মাত্র ২ লাখ বেল। ফলে প্রতিবছর ৮৩ লাখ বেল তুলা আমদানি করতে হয়। এতে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। আমদানি নির্ভরতা কমাতে ১৯৯১ সাল থেকে তুলা উন্নয়ন বোর্ড আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
শেরপুরে তুলা চাষ বৃদ্ধির লক্ষ্যে তুলা উন্নয়ন বোর্ড কৃষকদের প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী প্লট স্থাপন, ও সরকারি প্রণোদনা সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। তুলা চাষীদের তুলা বিক্রির ব্যবস্থা সহজ করতে এবং ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে সরকার নির্ধারিত মূল্যও বৃদ্ধি করেছে। জেলা তুলা উন্নয়ন বোর্ডের ফিল্ড অফিসার শাবনাজ আক্তার বলেন, “শেরপুর জেলার অধিকাংশ জমি তুলা চাষের জন্য বেশ উপযোগী। কৃষকদের আমরা সব ধরনের পরামর্শ ও সহায়তা দিচ্ছি। তাদের উৎপাদিত তুলা ন্যায্যমূল্যে বিক্রির ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।”
শেরপুরের কৃষকদের তুলা চাষে আগ্রহ বাড়লেও কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো রয়েছে। বিশেষ করে জেলার মানুষের মধ্যে তুলা চাষের বিষয়টি এখনো সিংহভাগ কৃষকের অজানাই রয়ে গেছে। এজন্য প্রচার প্রচারণ বৃদ্ধি,মাঠ পর্যায়ে চাষিদের চাষিদের সহযোগিতার জন্য মাঠ কর্মীর ঘাটতি, চাষ সম্প্রসারণে কৃষকের নগদ অর্থঋণ প্রদান, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার ও আন্তর্জাতিক বাজার মূল্য অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করা দরকার।
তুলা উন্নয়ন বোর্ড শেরপুর কটন ইউনিটের অফিসার মো. নূরুল আলম বলেন, “বেলে মাটি বিঘাপ্রতি ১২ থেকে ১৪ মণ আর দোয়াশ মাটিতে ১৬ থেকে ১৭ মন ফলন হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য কৃষকদের তুলা চাষে আরও উদ্বুদ্ধ করা। অল্প খরচে বেশি লাভ হওয়ায় প্রতি বছর তুলা চাষের পরিমাণ বাড়ছে। চলতি বছর ৫ শতাধিক কৃষক তুলা চাষ করেছেন। নতুন করে আরও অনেকেই তুলা চাষ করার আগ্রহ নিয়ে আমাদের সাথে যোগাযোগ করছেন।আগামী মৌসুমে শেরপুরে তুলা চাষ আরও অনেক বাড়বে বলে আশা করছি। শেরপুরে তুলা চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার, সরকারি সহায়তা বৃদ্ধি, প্রচারণা ও তুলার বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে এ জেলায় তুলা উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব। এতে কৃষকরাও লাভবান হবেন এবং দেশের তুলা আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে।