• মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬, ০৫:৪৯ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
হামলায় অবৈধভাবে ‘সাদা ফসফরাস’ ছুড়েছে ইসরায়েল রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারে কমিটি; প্রজ্ঞাপন জারি সারাদেশে জ্বালানি তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে মাঠে নামছে ভ্রাম্যমাণ আদালত মধ্যপ্রাচ্য সংকট, শ্রমবাজারে নতুন চ্যালেঞ্জ ভর্তুকির চাপে দিশেহারা বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত শিক্ষাকে মুখস্থনির্ভরতা থেকে বের করতে চায় সরকার: শিক্ষামন্ত্রী রমজানের পরই সারাদেশে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তামাকের ‘প্রকাশ্যে ব্যবহার নিষিদ্ধ’ করার প্রস্তাব দেয়া হবে: তথ্যমন্ত্রী ভোজ্যতেলের দাম এক ফোঁটাও বাড়বে না: বাণিজ্যমন্ত্রী নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করে যাচ্ছে সরকার : স্থানীয় সরকার মন্ত্রী

সুবর্ণচরে সুপেয় পানির সংকট

প্রভাত রিপোর্ট / ১২৪ বার
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৫

মাহফুজুর রহমান, নোয়াখালী: নোয়াখালীর শস্যের ভান্ডার নামে পরিচিত সুবর্ণচর উপজেলায় টিউবওয়েলে, পুকুর ও খাল-বিলে মিলছে না সুপেয় পানি। পানি সংগ্রহ করেত যেতে হয় দূর-দূরান্তে। এদিকে খাল-বিল পুকুরেও নেই পানি। ফলে এ জনপদে দেখা দিয়েছে তীব্র পানির সংকট। জানা গেছে, গত এক দশক থেকে এ জনপদে বদলে গেছে কৃষির চিত্র। এক সময় রবি মৌসুমে পানি সেচ ছাড়াই কৃষক উৎপাদন করতো মূল্যবান রবিশস্য। আমনের মৌসুম শেষ হতেই রবি মৌসুমে এসব ফসল উৎপাদনে চলতো মহা কর্মযজ্ঞ। এ অঞ্চলে উৎপাদিত এসব রবিশস্য স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে সরবরাহ হতো সারাদেশে। কালের বিবর্তনে কৃষিতে যুক্ত হলো উচ্চ পানি শোষণ ক্ষমতা সম্পন্ন উফশি ধানের বীজ। যা উৎপাদনে প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। উপকূলীয় এ অঞ্চলে প্রাকৃতিক পানির আধার সৃষ্টি না করায় কৃষক সেচের ৮০ ভাগ পানি ভূগর্ভ হতে অপরিকল্পিতভাবে উত্তোলন করে ইরি-বরো ধানের পানির চাহিদা মেটাচ্ছে। এতে করে ভূ-গর্ভের সুপেয় পানির স্তর গাণিতিক হারে নেমে যাচ্ছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে সুপেয় পানির চরম হাহাকার চলছে এ জনপদে। শুষ্ক মৌসুমে ধান চাষই এখন সুবর্ণচরের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে বড় ধরনের অভিশাপে পরিণত হচ্ছে।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ঘুরে দেখা যায়, কৃষকরা মৌসুমি ফসল চাষ না করে ৭০ ভাগ ভূমিতেই ইরি-বোরো ধানের চাষ করছেন। যে দিকে চোখ যায় সেদিকেই শুধু ধান আর ধানের সবুজ জমি। মৌসুমি ফসলের চাষ তেমন চোখেই পড়ে না। যত্রতত্র ফসলি মাঠের পাশে, পুকুর পাড়ে নিজেদের ইচ্ছেমতো গভীর নলকূপ স্থাপন করে অপরিকল্পিতভাবে তুলছে ভূগর্ভের সুপেয় পানি। ধান চাষে ভূগর্ভের পানি অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে বাড়িঘরের (৭০০-১২০০ ফুট) গভীর নলকূপে এখন আর পানি ওঠে না। এক কলসি সুপেয় পানির জন্য এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে ছুটছে মানুষ। এ যেন এক কলসি পানির জন্য প্রাণপণ যুদ্ধ। এতে গৃহস্থালির কাজেও দেখা দিয়েছে অচলাবস্থা। বিশুদ্ধ পানির অভাবে সুবর্ণচরের লাখ লাখ মানুষ দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সুবর্ণচরে ৩৮ হাজার ৫০০ হেক্টর আবাদি ভূমির মধ্যে ২০০০ সালে খালবিল ও পুকুরের পানি ব্যবহার করে মাত্র ২০০ হেক্টর ভূমিতে বোরো চাষ হতো। বাকি ভূমিতে কৃষক রবি ফসলের আবাদ করতো। ২০০০ সাল থেকে ক্রমাগত হারে সুবর্ণচরে চলতি মৌসুমে শুধু ১৮ হাজার হেক্টর ভূমিতে বোরো ধানের চাষ করেছে কৃষক এবং ২ হাজার ৭৫০ হেক্টর ভূমিতে খেসারিসহ অন্যান্য ফসলের আবাদ করা হয়েছে। এই বোরো ধান চাষে ৫০ কোটি ১৬ লাখ ২০ হাজার ২৮০ কিউসেক পানি খরচ হচ্ছে। এর মধ্যে মাত্র ২৫ শতাংশ পানি ব্যবহার হয় উপরিভাগ থেকে। ৪ লাখ ১৪০ কিউসেক পানি খরচ হচ্ছে প্রতি হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিমাত্রায় ভূগর্ভের পানির ওপর নির্ভরশীলতায় ঝুঁকি বাড়াচ্ছে এ অঞ্চলে। ইরি-বোরো ধান আবাদ কমিয়ে আনলে পানির সংকট ধীরে ধীরে কেটে যাবে। শুস্ক মৌসুমে ধান চাষাবাদে কৃষককে নিরুৎসাহিত করতে হবে। কৃষি কাজের জন্য প্রাকৃতিক পানির আধার সৃষ্টি করে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে তা মহাবিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
উচ্চ ফলনশীল ও উচ্চ পানি শোষণ ক্ষমতা সম্পন্ন জাতের ধানের বীজ, সার, কীটনাশক এবং প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে বছরজুড়ে। এদিকে রবিশস্য ধ্বংস করে ধান চাষ বিস্তারের কারণে পুরো জনপদে পানিশূন্য হয়ে যাওয়ার বিষয়টি আমলেই নিচ্ছে না কৃষি বিভাগ। বিএডিসির ছাড়পত্র ছাড়াই সেচের জন্য যত্রতত্র বিদ্যুৎ সংযোগ দিচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ। অন্যদিকে পরিকল্পনাবিহীন অনুমোদন ছাড়া স্থানীয় চাষিরা নিজের খেয়াল খুশি মতো বোরো চাষের জন্য ১৫শ থেকে ২ হাজার ফুট গভীর নলকূপ বসিয়ে পানি তোলার কারণে উপজেলাজুড়ে তীব্র সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। সাধারণত নলকূপের গভীরতা হয় ৮০০-৯০০ ফুট। ব্যবহার করা হয় ১.৫ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ। কিন্তু সুবর্ণচরের অনেক নলকূপে ৪.৫ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ ব্যবহার করে ১৫শ থেকে ২ হাজার ফুট গভীর থেকে পানি উত্তোলন করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) সূত্রে জানা যায়, সুবর্ণচরের চাষাবাদের জন্য ২৪৫টি গভীর নলকূপের (সেচপাম্প) অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে চাষিরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে আরও তিন হাজারের বেশি সেচ পাম্প স্থাপন করেছেন, তবে সেগুলো অনুমোদনহীন। একটি গভীর নলকূপ ভূগর্ভ থেকে প্রতি ঘণ্টায় ১ হাজার ৮০০ কিউসেক পানি তোলা হয়। কোনো গবেষণা ও ভূগর্ভের পানির পরিমাণ সমীক্ষা না করে গভীর নলকূপ অনুমোদন দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ভূগর্ভে কি পরিমাণ পানির মজুদ রয়েছে কিংবা গভীর নলকূপ স্থাপনে পরিবেশ প্রকৃতি ও ভূগর্ভের ক্ষতিকর প্রভাবের বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে সর্বোচ্চ পানি শোষণকারী উফশী জাতের বীজ কৃষকের হাতে সরবরাহ করেছে কৃষি বিভাগ।
সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সুরাইয়া আক্তার লাকী ঢাকা পোস্টকে বলেন, অবৈধ গভীর নলকূপের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে। এছাড়া সুপেয় পানির সংকটে আপদকালীন চাহিদা পূরণে জেলা জনস্বাস্থ্য ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহযোগিতায় সুপেয় পানি ও প্লাস্টিকের কনটেইনার বিতরণ করা হচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও