প্রভাত রিপোর্ট: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগে সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিয়োগে যোগ্যতা নির্ধারণে নীতিমালা করার সুপারিশ দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়; সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, বন্দর ও রাজস্ব আদায় কার্যক্রম অধিকতর গতিশীল করতে উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির আহ্বায়ক। রবিবার (১৩ জুলাই) সচিবালয় সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টা এ কথা জানান। এ সময় কমিটির সদস্য শিল্প মন্ত্রণালয় এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান উপস্থিত ছিলেন।
এনবিআরে সংস্কার উদ্যোগ বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে প্রায় দুই মাস আন্দোলন করেছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ আন্দোলনের বিষয়ে ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘আমরা দেখলাম যে সমস্যাটার সূত্রপাত কোথায়। সমস্যার সূত্রপাত বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে অন্যান্য ক্যাডারের যে বিরোধ শুল্ক, আবগারি, আয়কর কর্মকর্তাদের, এটি একটি পুরোনো বিরোধ। ২৪ ক্যাডার মিলে ওদের আরেকটি অ্যাসোসিয়েশন আছে। এটা হচ্ছে মূল কারণ।’ তিনি বলেন, ‘তবে কথা হলো অধ্যাদেশকে (রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫) কেন্দ্র করে এটা হলো কেন? দুটি কারণে এটি হয়েছে। অধ্যাদেশটাতে কিছু মৌলিক ত্রুটি আছে। আমরা বলবো- এখানে কিছুটা চতুরতার আশ্রয় নিয়েছেন যারা এই অধ্যাদেশ প্রণয়ন করেছেন তারা। যেমন ধরুন, অধ্যাদেশে আছে সরকার উপযুক্ত কোনো যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মকর্তাকে রাজস্ব নীতি বিভাগের সচিব নিয়োগ দিতে পারবেন। এখন উপযুক্ত যোগ্যতাসম্পন্ন কে? এক্ষেত্রে তো আপনি যে কোনো লোককে সচিব করতে পারবেন। এটা একটা সমস্যা। সরকারি রাজস্ব আহরণ কাজে অভিজ্ঞতার কথা বলা হয়েছে। কিছু সমস্যা আমরা কমিটি চিহ্নিত করেছি। আমরা এগুলোকে বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দেবো।
কমিটির আহ্বায়ক বলেন, ‘সামনের পথটা হচ্ছে, আমরা অধ্যাদেশের কিছু ত্রুটি চিহ্নিত করেছি। সেই ত্রুটিগুলো সংশোধনের জন্য আমরা সরকারকে পরামর্শ দেবো। এনবিআর কিন্তু আর থাকবে না, এটা সবার জন্যই ভালো। এনবিআরে চাকরি করছেন শুনে সবাই একটা লম্বা হাসি দেয়। আপনারা সবাই জানেন এই হাসিটার অর্থ কী! তাই এনবিআর না থাকাটাই সবার জন্য ভালো। দুটি বিভাগের কথা বলা হয়েছে, দুটি বিভাগ হবে।’ অধ্যাদেশ অনুযায়ী দুটি ক্যাডার কর্মকর্তাদের নিয়ে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব বিভাগ গঠিত হবে জানিয়ে ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘আমরা কমিটি থেকে মনে করি এটাও গ্রহণযোগ্য নয়। দুই বিভাগে প্রশাসন ক্যাডারের খবরদারি এটাও গ্রহণযোগ্য নয়। ওরা (শুল্ক, আবগারি ক্যাডার) বলছে সব লোক আমাদের হতে হবে, এটাও গ্রহণযোগ্য নয়। তাহলে আমাদের যেটা করতে হবে, সেটা হলো- এই যে নতুন দুটি বিভাগ হবে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব বাস্তবায়ন- এই দুটি বিভাগের সচিব কারা হবেন সেই বিষয়ে একটি নীতিমালা করতে হবে। সেখানে বলা হবে এই এই যোগ্যতা থাকতে হবে। শুধু সচিব না এটার ঊর্ধ্বতন যে পদগুলোতে নিয়োগের জন্য নীতিমালা করতে হবে, যাতে রাজস্ব আদায় কার্যক্রমটা আরও বেগবান হয়। আমাদের রাজস্ব আদায় হার অত্যন্ত কম, এটা যাতে বাড়ে, বন্দরে হয়রানি ও কন্টেইনার জটও যাতে আমরা পরিহার করতে পারি।’
কমিটি মাঠ পরিদর্শন করে একটা প্রতিবেদন দেবে জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, এনবিআরের কর্মকর্তাদের আন্দোলনের ফলে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি নিরূপণের বিষয়টি নৌপরিবহন উপদেষ্টা বিবেচনা করছে। এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তাদের আচার-আচরণের মাধ্যমে সরকারের হারিয়ে যাওয়া আস্থা অর্জন করতে হবে’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিশ্বব্যাংক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে তারা বলেছে, বাংলাদেশে যে পরিস্থিতি তাতে আগামীতে মঙ্গা দেখা দিতে পারে- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘না, আমি এটা মোটেই মনে করি না। আমি উল্টোটা মনে করি। অর্থনীতি এখন মূলত পিকআপ করছে। আপনি যে কোনো ইন্ডিকেটর নেন ইনফ্লেশন নেন রিজার্ভকে নেন- এটা সম্পূর্ণভাবে ইয়ে…।’
উপদেষ্টা বলেন, ‘এই প্রতিবেদনগুলোর ডেটাগুলো ছয় মাস আগের। ওই সময়টা তো আমরা পার হয়ে এসেছি। ডলারের দাম কমেছে আপনি শুনেছেন? ডলারের দাম তো কমেছে বাজারে, আপনাদের পত্রিকাতেই এসেছে। উল্টোটাই এখন সত্য- অর্থনীতি এখন গতিশীল হয়েছে। তবে আমরা যেখানে চাই সেখানে গেছে, এটা নয়। তবে মঙ্গা, ব্যাংকক্রাপসি আমরা পিছনে ফেলে এসেছি। শুল্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটা ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট হবে জানিয়ে ফাওজুল কবির খান বলেন, এটার ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। সামান্য হয়তো কিছুটা বাকি আছে। প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে সেগুলোর ব্যাপারে তারা ফিডব্যাক দেবে। অশুল্ক বাধার বিষয়ে তারা আমাদের জানাবে, আমরাও তাদের কী দিতে পারবো তা জানাবো। এই আলোচনাটা এখন শুরু হবে।’ গত ৩০ জুন ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, বন্দর ও রাজস্ব আদায় কার্যক্রম অধিকতর গতিশীল করতে উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি গঠন করে সরকার।
পাঁচ সদস্যের এই কমিটিতে আরও সদস্য হিসেবে রয়েছেন- নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন; বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।