• বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:২১ অপরাহ্ন

অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে

প্রভাত রিপোর্ট / ১১৭ বার
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই, ২০২৫

প্রভাত রিপোর্ট: অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। ঘোষিত সময়ের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাষ্ট্রের সংস্কার, মার্কিন শুল্কনীতির চাপসহ অর্থনৈতিক অবস্থায় গুমট পরিস্থিতি, মব ভীতি, অনাকাঙ্ক্ষিত নিত্যনতুন ইস্যু-এসব নিয়ে সরকারের প্রতি আস্থার সংকট স্পষ্ট হচ্ছে। সরকারের দুজন উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবি উঠেছে। স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে খোদ প্রধান উপদেষ্টার বিরুদ্ধেও।
সংস্কার দৃষ্টান্তমূলক না হলে, একই সঙ্গে নির্বাচনও যদি সুষ্ঠু না হয়, তাহলে প্রধান উপদেষ্টাকে ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পরামর্শও দেয়া হয়েছে।
গত এক বছরে সরকারের কার্যক্রম নিয়ে শক্ত কথা বলার সময় এসেছে বলেও বিশিষ্টজনদের মন্তব্য আসছে। বলা হচ্ছে, এই সরকারের কোনো নৈতিক অবস্থান নেই। এসব মন্তব্য, দাবি, অভিযোগ ও আস্থার সংকটের মধ্যেও জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলো এখনো ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্যে অটুট থেকে অন্তর্বর্তী সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
একই সঙ্গে নির্বাচনপ্রক্রিয়া দ্রুত করার তাগিদও দেয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ৫ আগস্টের পর যে রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে উঠেছিল তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দেশ এক গভীর সংকটে পতিত হওয়ার পথে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে দ্রুত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিকল্প নেই। তবে সে নির্বাচন হতে হবে সুষ্ঠু প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ও নির্ভরযোগ্য।
পর্যবেক্ষকমহলের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কয়েকটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা না করলেও দেশের সংকটময় মুহূর্তে দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্যে অটুট থাকার প্রতিশ্রুতি নেয়। ভারতে বাংলাদেশবিরোধী বিভিন্ন তৎপরতা, আগরতলায় সহকারী হাইকমিশনে হামলা এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চলাকালে গত বছরের ৪ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক দল ও শক্তিগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। সে সময় দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এবং অপপ্রচার ও আগ্রাসন ঠেকাতে দলগুলো সরকারের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। গত ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ এবং দুষ্কৃতকারীদের হামলা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হওয়া; গত সোমবার রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে অনেক শিশুশিক্ষার্থীর মৃত্যু; পরদিন ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গেলে আইন উপদেষ্টা, শিক্ষা উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবকে অবরুদ্ধ করে রাখা; রাষ্ট্রীয় শোক দিবসেও এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিতে কেন বিলম্ব হলো এই প্রশ্নে শিক্ষা উপদেষ্টা ও শিক্ষাসচিবের পদত্যাগ দাবিতে সচিবালয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভÍএসব ঘটনার মধ্যে গত মঙ্গলবার ও বুধবার প্রধান উপদেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন বলেন, গত এক বছরে সরকারের উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য চোখে পড়ছে না। বরং সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও সংশয় দেখা দিয়েছে। আমরা লক্ষ করছি, যখনই সরকারের কোনো ব্যর্থতা বা ত্রুটি নিয়ে সমালোচনা হয়, তখনই প্রধান উপদেষ্টা এক ধরনের নির্লিপ্ততার ভঙ্গিতে জানিয়ে দেন, আমি সরকারে থাকতে চাই না, আমাকে অনুরোধ করে রাখা হয়েছে। এ ধরনের মনোভাব থেকে বোঝা যায়, সরকার আসলে কোনো দায়দায়িত্ব নিতে আগ্রহী নয়। গত মঙ্গলবার সরকার চারটি রাজনৈতিক দলকে সংলাপের জন্য আহবান করেছিল। অনেকেই আশা করেছিল যে উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে ঘটে যাওয়া হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা নিয়ে আলোচনা করা হবে এবং সরকার জরুরি ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলোর পরামর্শ ও সহযোগিতা চাইবে। কিন্তু বৈঠকে সেই বিষয়ে কোনো আলোচনাই করা হয়নি। বরং প্রধান উপদেষ্টার অপ্রাসঙ্গিক মিষ্টি হাসি দেশবাসীকে বিব্রত এবং লজ্জিত করেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, আমাদের সন্তানদের মর্মান্তিক মৃত্যু যেভাবে সাধারণ মানুষকে নাড়া দিয়েছে, সরকারকে কি তেমনভাবে নাড়া দিয়েছে?
অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন আরো বলেন, সরকারের অভ্যন্তরে সমন্বয়হীনতা এখন একেবারেই স্পষ্ট। প্রতিদিন বিশ্লেষকরা সরকারের নানা ব্যর্থতার দিক তুলে ধরছেন, কিন্তু সরকার সেগুলো আমলে নিচ্ছে বলে মনেই হয় না। ফলে এখন স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠছে, আসলে সরকার চালাচ্ছে কে? কেউ মনে করছে, সরকার পরিচালনায় সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা আছে। কেউ বলছে, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মতো কিছু দল মূলত সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আবার সরকারের প্রেস সচিবের বক্তব্যের ধরন দেখে অনেকে মনে করছে, তিনি একাই যেন সরকার। কেউ কেউ মনে করছে, সরকারে যাঁরা আছেন তাঁরা বিশেষ কোনো দেশ বা শক্তির ইশারায়ই রাষ্ট্র চালাচ্ছেন!’ তিনি বলেন, ‘সরকারের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা আছে, আবার নেই। শুরুর দিকে সরকারের প্রতি বিএনপি যতটা ভরসা করত এখন সেটা অনেকটাই কমে গেছে। এনসিপি, জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি ইসলামী দল সরকারের প্রতি শুরু থেকেই আস্থাশীল। আসলে দুর্বল সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ, এই বাস্তবতা এই দলগুলোকে সরকারের ঘনিষ্ঠ করে তুলেছে। রাজনৈতিক দল ও বিদেশি শক্তির সঙ্গে সরকারের কী ধরনের বন্দোবস্ত হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, গত এক বছরে মুক্তিযুদ্ধ ও প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধে যত আঘাত এসেছে, সরকার তার কোনো প্রতিবাদ করেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে ঘুরিয়েফিরিয়ে সমর্থনই জানিয়েছে। সারা দেশে, বিশেষ করে ঢাকায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না। যদি সামনে কোনো রাজনৈতিক দুর্যোগ বা সহিংসতা তৈরি হয়, এই সরকারের পক্ষে তা মোকাবেলা করা কঠিন হবে। বেসামরিক প্রশাসনে চেইন অব কমান্ড কার্যত ভেঙে পড়েছে। এই পরিস্থিতি যত গভীর হবে, সরকারের সমন্বয়হীনতা যত প্রকট হবে, ততই দেশের ভেতরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা বাড়বে। যারা অস্থিরতা ও অরাজকতা চায়, তাদের জন্য এটি অবশ্যই সুবিধাজনক পরিবেশ। পরিহাসজনক হলেও সত্য যে এই অস্থিরতা অনেকভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষেও সুবিধা তৈরি করতে পারে।’


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও