আজ
|| ৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ১২ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
জনজীবনের ঝুঁকি বাড়ছে অপরিকল্পিত নগরায়নে
প্রকাশের তারিখঃ ২৪ জুলাই, ২০২৫
প্রভাত রিপোর্ট: আগুন, ভূমিকম্প, ভবন ধ্বসের ঘটনার পর রাজধানীতে ভবন নির্মাণের নীতিমালা মানা হচেছ কিনা- এ প্রশ্ন তো অতীতে বহুবারই উঠেছে৷ বেইলি রোডের আগুনের সময় প্রশ্ন উঠেছে আবাসিক ভবন বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যায় কিনা। সব প্রশ্নেরই এক জবাব, ঢাকায় কোনো ক্ষেত্রেই কোনো আইন বা নিয়ম মানা হচ্ছে না। ফলে, এই শহর বলতে গেলে একটা মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হয়েছে।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে জঙ্গি বিমান বিধ্বস্ত হয়ে অন্তত ৩২ জনের মৃত্যুর পর ঢাকার ‘লো ফ্লাই জোন’ নিয়ে কথা হচ্ছে। মাইলস্টোন স্কুলে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় স্পষ্টতা দাবি করে প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা৷ এক এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন করছেন, ‘‘যে যুদ্ধ বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে সেটি ছোট। একজন পাইলট। একটি ইঞ্জিন। তাতেই এত মানুষের মৃত্যু। যদি দুই ইঞ্জিনের একটি বড় যাত্রীবাহী বিমান ঢাকার জনবহুল এলাকায় বিধ্বস্ত হয় তাহলে কী পরিস্থিতি হবে। অপরিকল্পিত নগরায়নে জনজীবনের ঝুঁকি বাড়ানো আরো অনেক বিষয়ই উঠে আসছে আলোচনায়৷ এমন ঘনবসতিপূর্ণ এক নগরীতে আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থাকতে পারে কিনা, কমার্শিল উড়োজাহাজ ও জঙ্গি বিমান একই রানওয়ে ব্যবহার করতে পারে কিনা - এসব প্রশ্নও উঠছে৷
ঢাকার মোট জনসংখ্যা এখন আড়াই কোটির মতো। আর এখানে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে বসবাস করেন প্রায় ২৩ হাজার মানুষ। পুরো শহর উঁচু-নিচু ভবনে ঠাঁসা। এখানে প্রতি পদে পদে মৃত্যু ফাঁদ - এ কথা বলেন অধ্যাপক ড. আখতার মামুদ। তার মতে,” ঢাকা থেকে বিমান বন্দর সরিয়ে নিতে হবে। আর বিমানঘাঁটিও থাকতে হবে জনবিরল এলাকায়। জনবহুল এলকায় তো যুদ্ধ বিমানের প্রশিক্ষণ হতে পারে না। পুরো ঢাকা শহর রিলোকেট করার সময় এসেছে, এখান থেকে বিমান বন্দর, বিমান ঘাঁটিসহ অনেক কিছু সরিয়ে নিতে হবে, মানতে হবে ড্যাপ ও ইমারত নির্মাণ বিধিমাল, কথাগুলো বললেন অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান।
বাংলাদেশ ইন্সটিউট অব প্ল্যানার্স(বিআইপি)-এর সভাপতি অধ্যাপক ড.আদিল মুহাম্মদ খান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ঢাকা তো এখন আর ঢাকার মধ্যে নাই। ঢাকা তার আশপাশ গাজীপুর, সাভার, কেরানীগঞ্জ, রূপগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে আগে যেসব স্থাপনা জনবিরল এলাকায় নিরাপদ ভেবে তৈরি হয়েছে, এখন নিয়ম না মানায় তা জনবহুল এলাকায় পরিণত হয়েছে। ফলে ঢাকা এক ঝুঁকির শহরে পরিণত হয়েছে।
ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)-র ২০২৫ সালের গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্সে বিশ্বের বসবাসযোগ্য ১৭৩ টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১। ঢাকার চেয়ে খারাপ আছে আর মাত্র দুইটি শহর। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক ও লিবিয়ার ত্রিপোলি।
এই সূচক তৈরিতে প্রধানত পাঁচটি মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়। সেগুলো হলো: স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা এবং অবকাঠামো। দূষিত বাতাস, ভয়াবহ যানজট, নালা-নর্দমার উপচে পড়া ময়লা, দুর্বল স্বাস্থ্যসেবা আর নগর পরিকল্পনার চরম অভাবেএখন ঢাকা বিশ্বের বসবাসযোগ্য ১৭৩ টি শহরের মধ্যে ১৭১তম স্থানে।
২০২২ সালে গেজেটভুক্ত হওয়া রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) জরিপের তথ্যমতে, রাজউক এলাকায় প্রায় ২১ লাখ ৪৫ হাজার ভবন রয়েছে। এর মধ্যে একতলা থেকে বহুতলা ভবন রয়েছে পাঁচ লাখ ১৭ হাজার। এসব ভবনের মধ্যে মাত্র দুই লাখের অনুমোদন রয়েছে, বাকি প্রায় তিন লাখ ১৭ হাজার ভবনের কোনো অনুমোদন নেই। এছাড়া ১৬ লাখের বেশি সেমিপাকা ভবনও অবৈধ। রাজউকের আওতাধীন এলাকা এক হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের ৩০৫ বর্গকিলোমিটার, সাভার উপজেলা, কেরানীগঞ্জ উপজেলা, নারায়ণগঞ্জ, ভুলতা ও গাউছিয়া।
মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় বলা হয়েছে, কোনো ভবনে বসবাস বা ব্যবহারের আগে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থেকে ব্যবহার বা বসবাস সনদ নিতে হবে। ২০০৮ সালে এই আইন চালুর পর ১৬ বছর পেরিয়ে গেছে। এই দেড় দশকে অন্তত ৬৪ হাজার ভবন হয়েছে রাজধানীতে। অথচ মাত্র দুই থেকে পাঁচ শতাংশ ভবন এই সনদ নিয়েছে। সংখ্যায় হিসাব করলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় এক হাজার ২৮০ থেকে তিন হাজার ২০০টি। রাজউক বলছে, ঢাকায় ৭৪ ভাগ ভবনই গড়ে উঠেছে নকশার বাইরে। বাকি ২৬ ভাগ ঠিকঠাক আছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর ২০২২ সালে রাজধানী ঢাকার এক হাজার ১৬২টি ভবন পরিদর্শন করে। এর মধ্যে ৬৩৫টি ভবনকে আগুনের ঝুঁকিতে থাকা চিহ্নিত করে নোটিশ দেয়। তার মধ্যে আবার ১৩৬টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। মোট ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ৬৩৪টি, যা মোট ভবনের ৫৪.৬৭ ভাগ।
আর ২০০৯ সালে সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (সিডিএমপি) ও জাইকার এক যৌথ জরিপের ফল বলছে, ঢাকায় সাত বা এর বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হলে শহরের ৭২ হাজার ভবন ভেঙে পড়বে; এক লাখ ৩৫ হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আখতার মামুদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, “ঢাকা শহরের অধিকাংশ ভবনই আগুনের ঝুঁকিতে আছে। ভূমিকম্প হলে ক্ষতির মুখে পড়বে। ব্যাপক প্রাণহানি হবে। ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) ও ইমারত বিধিতে ভবনের অগ্নি নিরাপত্তা , ভবনের উচ্চতা, কতটুকু ফাঁকা জায়গা রাখতে হবে- সবই বলা আছে। কিন্তু এটা তো মানা হচ্ছে না। রাজউক তো তা কার্যকর করছে না।”
বিআইপি সভাপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “এই অর্ন্তবর্তী সরকারের সময়েও ভূমি এবং ফ্ল্যাট ব্যবসায়ীরা সংস্কারের নামে ড্যাপে পরিবর্তন এনে যেখানে বহুতল ভবন নির্মান নিষেধ সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমোদন নিচ্ছে।”
এখন উত্তরায় মাইলস্টোন কলেজে যুদ্ধ বিমান ভেঙে পড়ার পর দুইটি বিষয় আলোচনায় আসছে। ঢাকার লো ফ্লাই জোন এবং জনবহুল এলকায় যুদ্ধ বিমান উড্ডয়নের বিষয়ে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এবং বিমানের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, “মাইলস্টোন কলেজে যুদ্ধ বিমান ভেঙে পড়ার তিনটি দিক আছে। প্রথমত, ঢাকায় কুর্মিটোলা যে বিমান ঘাঁটি, তারা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের একই রানওয়ে ব্যবহার করে। আর কলেজটি লো ফ্লাই জোনে। মানে হলো ওই এলাকায় বিমান উড্ডয়ন ও অবতরনের সময় নীচুতে থাকে। ফলে, বহুতল কলেজ ভবন ওই এলাকায় নির্মাণ নিয়েই প্রশ্ন আছে। আর তৃতীয়ত, জনবহুল এলাকায় যুদ্ধবিমান প্রশিক্ষণ কেন হবে?” তার কথা, “ শাহজালাল বিমান বন্দরই তো এখান থেকে অনেক আগে সরিয়ে ফেলার কথা ছিল। এটা তো মুন্সিগঞ্জের আঁড়িয়াল বিল এলাকায় নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটা তো নেয়া সম্ভব হয়নি প্রতিবাদের মুখে। আমাদের আশপাশের দেশেও কোথাও এরকম জনবহুল এলাকায় আর বিমানবন্দর নাই।”
“আর শাহজালালের রানওয়ে বিমান বাহিনীও ব্যবহার করে। এখন যে ২০-২৫টি প্রাইভেট হেলিকপ্টার অপারেটর হয়েছে, তারও এই বিমানবন্দর ব্যবহার করে। ফলে এটা একটা ঝূঁকিপূর্ণ বিমানবন্দরে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে এখানে যুদ্ধ বিমান পরিচালনা করা হয়, যা আরো ঝুঁকি তৈরি করেছে.” বলেন তিনি। ”
বিমানবন্দরে প্রতিদিন কমপক্ষে ৪০০ বাণিজ্যিক বিমান ওঠানামা করে। একই রানওয়েতে যুদ্ধ বিমান ওঠানামা করায় অনেক সময়ই ফ্লাইটের শিডিউল বিপর্যয় হয়। ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে শাহজালাল বিমান বন্দর এখানে থাকলেও, বিমান বাহিনীর ঘাঁটি এখান থেকে সরিয়ে নেয়া উচিত। আর জনবহুল এলাকায় যুদ্ধ বিমানের প্রশিক্ষণ হতে পারে না বলেও মনে করেন তিনি। “শাহজালাল বিমান বন্দরের আশপাশের কয়েক বর্গকিলোমিটার এলাকা লো ফ্লাই জোন। বিমান উড্ডয়ন এবং অতরণের সময় নীচ দিয়ে ওড়ে। সেই কারণে তিন তলার বেশি ভবনের অনুমোদন দেয়ার নিয়ম নেই। কিন্তু এই নিয়ম-নীতি তো মানা হচ্ছে না। মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজ ভবনটি তো তিন তলার বেশি। আট তলা। কিন্তু উত্তরার ওই এলাকা লো ফ্লাই জোন, বলেন তিনি। এখন জনবহুল এলাকায় শুধু যুদ্ধ বিমান কেন, প্যাসেঞ্জার বিমানও পরিচালনা করা হচ্ছে। যে যুদ্ধ বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে সেটি ছোট। একজন পাইলট। একটি ইঞ্জিন। তাতেই এত মানুষের মৃত্যু। একবার ভাবুন তো, যদি দুই ইঞ্জিনের একটি বড় যাত্রীবাহী বিমান ঢাকার জনবহুল এলাকায় বিধ্বস্ত হয় তাহলে কী পরিস্থিতি হবে!
অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, শাহজালাল বিমানবন্দরের আশপাশে এক সময় জলাভূমি ছিল। ওইসব এলাকা ছিল ফ্লাড ফ্লো জোন। এখনো তাই। কিন্তু সেইসব জায়গা ভরাট করে এখন বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে ঝুঁকি অনেক বেড়ে গেছে। রাজউক নিজেই নীতিমালা মানেনি। উত্তরা থার্ড ফেজ আবাসিক এলাকাও করা হচ্ছে নিয়ম ভেঙে। এসব নিয়ে রাজউকের নানা পর্যায়ে কথা বলার চেষ্টা করেও কারো মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
এদিকে মঙ্গলবার ঢাকাসহ দেশের সব জনবহুল এলাকায় ত্রুটিপূর্ণ বিমান এবং যুদ্ধ বিমান উড্ডয়নের নিষেধাজ্ঞা চেয়ে হাইকোর্টে রিট হয়েছে। বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন ও অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান রায়হান বিশ্বাস এ রিট দায়ের করেন। রিটে একই সঙ্গে মাইলস্টোন কলেজের নিহত শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকের জন্য ৫ কোটি টাকা এবং আহত শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকের জন্য ১ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছে।
Copyright © 2026 প্রভাত. All rights reserved.