• শুক্রবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৬:৩৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম
হয় ইউক্রেনীয় সেনারা নিজ থেকে সরে যাবে, নাহয় আমরা জোর করে দনবাস দখলে নেব: পুতিন ১২০০ কোটি বছর পুরনো গ্যালাক্সি খুঁজে পেলেন ভারতীয় বিজ্ঞানীরা তারেকের দেশে ফেরার তথ্য নেই; হাসিনাকে ফেরত দেয়ার ব্যাপারে ভারত ইতিবাচক সাড়া দেয়নি: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা লিবিয়া থেকে ফিরলেন ৩১০ বাংলাদেশি কাশির জন্য সিরাপ না লেবু-মধু: কোনটি বেশি ভালো? বিশ্বরাজনীতির মাঠে ধীরে ধীরে বন্ধুহীন হয়ে পড়ল পাকিস্তান দেশে এলো সেই ‘বুলেটপ্রুফ গাড়ি’, নিবন্ধন বিএনপির নামে খালেদা জিয়াকে দেখতে হাসপাতালে জুবাইদা রহমান শারীরিক অবস্থা ঠিক থাকলে রোববার খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নেয়া হবে বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ গাড়ি অরাস সেনাটে চড়েন পুতিন

আর কত রক্ত ঝরলে সাংবাদিকরা নিরাপত্তার আশ্বাস পাবে?

প্রভাত রিপোর্ট / ৩০১ বার
আপডেট : শুক্রবার, ৮ আগস্ট, ২০২৫
গাজীপুর নগরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় ধারালো অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে। ছবি: সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে

…………………মীর আব্দুল আলীম………………

.
গাজীপুরের দুপুরটা ছিল অন্য দিনের মতোই ব্যস্ত। দিনের আলোয় একজন সাংবাদিক লাইভে এসে স্থানীয় চাঁদাবাজ চক্রের কার্যক্রম ও দুর্নীতির বিবরণ তুলে ধরলেন। লাইভ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা বাদেই প্রকাশ্যে ঘটে গেল অকল্পনীয় এক ঘটনা-সেই সাংবাদিককে গলা কেটে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। একটি হত্যাকাণ্ডের এই নির্মম ধারাবাহিকতা শুধু একজন মানুষের জীবন কেড়ে নিল না; এটি গোটা জাতির বাকস্বাধীনতার গলা কেটে দিলো। এই এক ঘটনা যেন বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলার নির্মম বাস্তবচিত্র আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল- এই দেশে সত্য বলা মানে মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানানো। শুধু সাংবাদিক নয়, সাধারণ মানুষও আজ ভয়, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে আছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা, নিরাপদ চলাফেরা কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস-সবকিছুকেই যেন এক অদৃশ্য ছুরি দিয়ে কেটে ফেলা হচ্ছে প্রতিদিন। শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা পৃথিবীতেই সাংবাদিক নির্যাতন ও হত্যার সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু আমাদের দেশে এর ভয়াবহতা যেন প্রতিদিন নতুন মাত্রা পাচ্ছে। আজকের এই লেখায় আলোচনা করা হবে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড, আহত ও নির্যাতনের পরিসংখ্যান, আন্তর্জাতিক তুলনা, ভয়াবহ বিচারহীনতা এবং সম্ভাব্য সমাধান।
‘কলম ধরলেই কফিন’- বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যার সাম্প্রতিক চিত্র: বাংলাদেশে ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত অন্তত ৯ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১২০ জনের বেশি—তাদের অধিকাংশ চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, মাদক সিন্ডিকেট বা রাজনৈতিক অপরাধ নিয়ে রিপোর্ট করছিলেন। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়, প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে একেকটি নিভে যাওয়া কণ্ঠস্বর, কলমের কালির বদলে রক্তে ভিজে যাওয়া কাগজ, এবং শোকাহত পরিবার। এর চেয়েও ভয়াবহ হলো-প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পরপরই একই দৃশ্যপট দেখা যায়, স্থানীয় প্রশাসনের ‘তদন্ত’ নাটক, রাজনৈতিক নেতাদের শোক প্রকাশ, কয়েক দিনের মিডিয়া হৈচৈ, তারপর সব কিছু চুপ। এই চক্র এমনভাবে পুনরাবৃত্তি হয় যে, সাংবাদিক সমাজের মধ্যে এক ধরনের নীরব আতঙ্ক জন্মেছে—কোনো খবর করা আগে ভাবতে হচ্ছে, জীবন কি এর চেয়ে বেশি দামী নয়?
গাজীপুরের রক্তাক্ত শিক্ষা; লাইভে প্রতিবাদ, রাতে গলা কাটা: গাজীপুরের ঘটনা যেন একটি সতর্কবার্তা, যা স্পষ্ট ভাষায় বলে-‘তুমি যত বেশি সত্য বলবে, তত দ্রুত তোমার কণ্ঠ রোধ করা হবে।’ গাজীপুরে আসাদুজ্জামান তুহিন (৩৮) নামের এক সাংবাদিককে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। ৭ আগষ্ট বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে মহানগরীর ব্যস্ততম চান্দনা চৌরাস্তায় মসজিদ মার্কেটের সামনে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার সময় একটি চায়ের দোকানে বসে ছিলেন ওই সাংবাদিক। বিকেলের লাইভে সাহসী সাংবাদিক প্রকাশ্যে চাঁদাবাজদের কথা বলেছিলেন। তাঁর পিছনে ছিলেন না কোনো মিডিয়া কনগ্লোমারেট, ছিল না নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারা। ছিল কেবল সত্য বলার মনোবল। কিন্তু সেই মনোবলই তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাতের আঁধারে কুপিয়ে, গলা কেটে, এমনভাবে হত্যা করা হয় যাতে ভয় ছড়িয়ে পড়ে প্রত্যেক সাংবাদিকের মনে। গাজীপুরের একাধিক সাংবাদিক প্রকাশ্যে বলেছেন- এখন তারা খবর বাছাই করে করেন, ‘সংবেদনশীল’ বিষয় এড়িয়ে যান। এই ভীতি সাংবাদিকতার হৃদয়ে এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছে, যা হয়তো বছরের পর বছর ভরাট হবে না।
সাধারণ মানুষেরও ‘খুনের তালিকায়’ নাম উঠছে। সাংবাদিকরা একা নন-নিরাপত্তাহীনতার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষও। চাঁদা না দেওয়ায় ব্যবসায়ী খুন, রাজনৈতিক প্রতিশোধে গৃহবধূকে নির্যাতন করে হত্যা, ছিনতাইয়ে কলেজ ছাত্রের মৃত্যু-প্রতিদিন এমন খবর ছাপা হচ্ছে। দেশে সম্প্রতি প্রকাশ্যে নির্মমভাবে খুন করার ঘটনা বেড়েছে। মানবাধিকার সংস্থার হিসাবে, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই (জুন পর্যন্ত) খুন হয়েছেন প্রায় ২৭০০+ সাধারণ মানুষ। এই সংখ্যা প্রতিদিনের গড় হিসেবে ভয়াবহ-প্রায় ১৫ জন নাগরিক প্রতিদিন নিহত হচ্ছেন। আরও উদ্বেগজনক হলো-এসব খুনের অনেকগুলোই পুলিশের নথিতে ‘অপরিচিত হামলাকারী’ বা ‘পারিবারিক বিরোধ’ হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়, যাতে মূল অপরাধীরা আড়াল পায়। এর ফলে জনগণ বুঝে গেছে-এই দেশে হত্যা শুধু সম্ভব নয়, বরং তা করে রেহাই পাওয়াও সম্ভব।
সাংবাদিক হত্যার বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশর অবস্থান শীর্ষে। আন্তর্জাতিক সংগঠন ঈচঔ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে ৮৭ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন। মেক্সিকো, ফিলিস্তিন, ফিলিপাইন, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশও শীর্ষে রয়েছে। বিশ্বের ১৯৫টি দেশের মধ্যে এ সময়ে বাংলাদেশেই খুন হয়েছেন ৯ জন সাংবাদিক। পার্থক্য হলো-মেক্সিকো বা ফিলিস্তিনে আন্তর্জাতিক চাপ প্রায়শই তদন্তকে এগিয়ে দেয়। বাংলাদেশে সেই চাপ কিছুদিন থাকে, পরে মিলিয়ে যায়। আর এখানে বিচারহীনতা এতটাই গভীরে প্রোথিত যে, খুনিদের জন্য এটি কোনো ‘ব্যতিক্রমী ঘটনা’ নয়, বরং স্বাভাবিক ফলাফল। ফলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর রিপোর্টে বাংলাদেশকে ‘সাংবাদিকদের জন্য অন্যতম বিপজ্জনক দেশ’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হলেও, অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের তেমন কোনো আলামত দেখা যায় না।
সত্যের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের কারিগর কারা? সত্যের সবচেয়ে বড় শত্রু কেবল প্রকাশ্য অপরাধী নয়-প্রকৃত বিপদ লুকিয়ে থাকে রাজনৈতিক দলের নেতা আর ক্ষমতার অন্ধকার গলিতে। এখানে রয়েছে সেই চক্র, যারা চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক দৌরাত্ম্যের জাল বুনে সমাজের ওপর আধিপত্য কায়েম করেছে। এরা জানে, একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের হাতে যদি তাদের অপরাধের দলিল-প্রমাণ চলে আসে এবং তা প্রকাশ্যে আসে, তবে তাদের ক্ষমতার সাম্রাজ্য মুহূর্তেই ভেঙে পড়তে পারে। তাই তারা সবসময় ভয় দেখানো, অপপ্রচার, শারীরিক আক্রমণ, এমনকি হত্যাকাণ্ড পর্যন্তকে বৈধ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। আরও ভয়ংকর হলো-এই চক্রের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, এমনকি প্রশাসনের কিছু দুর্বৃত্ত সদস্যেরও আঁতাত থাকে। ফলে একজন সাংবাদিক খুন হওয়ার পরও প্রকৃত অপরাধীদের হাত ধরা যায় না; প্রমাণ গায়েব হয়ে যায়, সাক্ষীরা অদৃশ্য হয়ে যায়, আর মামলা বছরের পর বছর ধুলায় ঢেকে পড়ে থাকে। এতে গোটা সাংবাদিক সমাজ ও সাধারণ মানুষ একটি ভয়ঙ্কর বার্তা পায়-‘আমরা শুধু ক্ষমতাধরই নই, আমরা আইনের চেয়েও শক্তিশালী।’ এমন পরিস্থিতি কেবল মুক্ত সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধই করে না, রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের ভিত্তিকেও ভেঙে দেয়।
বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সাংবাদিকতায় ঢাল নাকি ছুরি? ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ) প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য ছিল সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড দমন করা। কিন্তু বাস্তবে এর ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে বিপজ্জনক দিকে মোড় নিয়েছে। আইনটির অস্পষ্ট ও ব্যাপক ব্যাখ্যার সুযোগ নিয়ে ক্ষমতাসীন মহল ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলার হাতিয়ার হিসেবে এটি ব্যবহার করছে। একবার কোনো সংবেদনশীল প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে, প্রতিবেদনের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই সাংবাদিককে থানায় ডেকে পাঠানো হয়, গ্রেফতার করা হয় বা একাধিক মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হয়। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিকটি হলো আত্ম-সেন্সরশিপ। সাংবাদিকরা জানেন-যদি কোনো বিষয় প্রভাবশালীদের স্বার্থের বিরোধিতা করে, তাহলে ডিএসএ মামলার মুখোমুখি হতে হবে। তাই অনেকেই এমন খবরই লিখছেন না যা আসলেই প্রকাশ করা জরুরি। এর ফলে গণমাধ্যম ধীরে ধীরে সাহস ও সত্যের জায়গা হারিয়ে ফেলছে; বদলে যাচ্ছে ক্ষমতাবানদের প্রশংসা ও তোষামোদের যন্ত্রে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য এই প্রবণতা ধ্বংসাত্মক, কারণ এটি জনগণের চোখে স্বাধীন সাংবাদিকতার আস্থা নষ্ট করে দেয়।
বিচারহীনতার বিষবৃক্ষ সাংবাদিকতার অন্তরায়। বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৯০% মামলাই বিচারহীন থেকে যায়। এ এক ভয়ঙ্কর পরিসংখ্যান, যা শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতাই নয়, রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছার অভাবকেও প্রকাশ করে। অপরাধের পরপরই মামলার নথি হারিয়ে যাওয়া, প্রমাণ নষ্ট হয়ে যাওয়া, সাক্ষীদের ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করিয়ে দেওয়া-এসব যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি এক অদৃশ্য কিন্তু গভীর শেকড় বিস্তার করেছে। ফলে অপরাধীরা নিশ্চিত হয়ে যায় তারা যাই করুক, শেষ পর্যন্ত তাদের সাজা হবে না। নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকরা এ থেকে ভয়ঙ্কর শিক্ষা পাচ্ছেন-‘খুন হলেও হয়তো পত্রিকার শিরোনাম হব, কিন্তু ন্যায়বিচার পাব না।’ এই মানসিকতা কেবল সাংবাদিক সমাজকে নয়, গোটা রাষ্ট্রের আইনি ও নৈতিক ভিত্তিকে ক্ষয় করে দেয়। যখন একটি সমাজে বিচারহীনতা স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন সেখানে অপরাধের বিস্তার রোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
সাংবাদিকদের পেশাগত অনিরাপত্তায় তারা আজ বড় একা ও অসহায়। বাংলাদেশে অনেক সাংবাদিক চুক্তিভিত্তিক বা ফ্রিল্যান্স হিসেবে কাজ করেন। তাদের চাকরির কোনো স্থায়িত্ব নেই, মাসের পর মাস বেতন বকেয়া থাকে, স্বাস্থ্যবিমা নেই, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই। খুন বা হামলার শিকার হলে তাদের পরিবার কোনো ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পায় না; অনেক সময় মৃত সাংবাদিকের সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়, সংসার ভেঙে পড়ে। এই আর্থিক ও সামাজিক অনিরাপত্তা সাংবাদিকদের ভঙ্গুর করে তুলছে। যখন একজন সাংবাদিক জানেন—তার জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে কেউ দায় নেবে না- তখন তার মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ভয় কাজ করে। ফলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায়, যা গণতন্ত্রের জন্য ভয়াবহ সংকেত। কারণ স্বাধীন গণমাধ্যম হলো একটি দেশের চোখ ও কান; সেই চোখ অন্ধ হয়ে গেলে এবং কান বধির হয়ে গেলে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে স্বৈরতন্ত্রের অন্ধকারে ডুবে যায়।
সরকারের দায়বদ্ধতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার সংকট প্রকট আকার ধারন করেছে। প্রতিটি সাংবাদিক হত্যার পর সরকার শোকবার্তা দেয়, তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেয়। কিন্তু এগুলো যেন এক ধরনের ‘রুটিন প্রক্রিয়া’, যার ফলাফল প্রায় শূন্য। তদন্ত কমিটি রিপোর্ট জমা দেয় না, দিলেও তা প্রকাশ পায় না। অপরাধী ধরা পড়লেও প্রভাবশালী হলে জামিন পেয়ে মুক্ত হয়ে যায়, আবার ক্ষমতার ছায়ায় ফিরে আসে। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবই এখানে মূল সমস্যা। শাসক দল মনে করে-প্রভাবশালী অপরাধীর বিচার করলে রাজনৈতিক সমীকরণ নষ্ট হতে পারে। ফলে তদন্ত শুরু হয় ঢাকঢোল পিটিয়ে, কিন্তু শেষ হয় নীরবে। এই চিত্র শুধু সাংবাদিকদের নয়, সাধারণ নাগরিকদের আস্থাকেও ভেঙে দিচ্ছে। মানুষ বুঝে যাচ্ছে-রাষ্ট্র তাদের রক্ষা করবে না, বরং হয়তো নীরবে অপরাধীদের পক্ষ নেবে। আজ চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করলেই হত্যা হতে পারে, কাল রাস্তার দুর্নীতি তুলে ধরলেই মৃত্যু আসতে পারে-এই ভয় সমাজে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে মানুষ ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যাচ্ছে। এই নীরবতা একসময় স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় পরিণত হয়, যেখানে মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সাহস হারিয়ে ফেলে। এটি একটি জাতির জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ। কারণ ভয় ও নীরবতা মিলে সমাজে এক ধরনের অন্ধকারের সংস্কৃতি তৈরি করে, যেখানে অপরাধীই হয়ে ওঠে নিয়ম প্রণেতা। এই সংস্কৃতি যতদিন চলবে, ততদিন অত্যাচারীরা আরও শক্তিশালী হবে, আর সাধারণ মানুষ তাদের দাসে পরিণত হবে।
দেশে বিভক্ত গণমাধ্যম ও দুর্বল প্রতিবাদ সাংবাদিক নির্যাতন বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারন। বাংলাদেশের গণমাধ্যম এখন রাজনৈতিক বিভাজনে আক্রান্ত। কোনো সাংবাদিক নিহত হলে সব মাধ্যম একজোট হয়ে প্রতিবাদ করার বদলে কেউ কেউ দলীয় স্বার্থ দেখে নীরব থাকে। এতে সাংবাদিক সমাজের ঐক্য নষ্ট হয়, প্রতিবাদের শক্তি ক্ষয় হয়ে যায়। একটি স্বাধীন গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ঐক্য। যখন সেই ঐক্য ভেঙে যায়, তখন ক্ষমতাসীনরা বুঝে যায়-তাদের বিরোধিতা করার মতো কোনো শক্তিশালী ফ্রন্ট নেই। আর ঐক্যে ফাটল ধরাতে প্রায়সই রাজনৈতিক দলের নেতারা কাজ করে থাকেন। ফলে সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ বাড়তে থাকে, কারণ অপরাধীরা জানে, তাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে উঠবে না।
বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক সমাজের ‘নির্বাক দর্শক’ মনোভাব এসব অপরাধ বাড়িয়ে তুলেছে। গুম, খুন, নির্যাতন—সবই চোখের সামনে ঘটে, কিন্তু বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী, প্রভাবশালী নাগরিকরা অনেক সময় নীরব দর্শক হয়ে থাকেন। হয়তো ভয়, হয়তো স্বার্থ—কারণ যাই হোক না কেন, এই নীরবতা অপরাধীদের কাছে সবুজ সংকেতের সমান। ইতিহাস বলছে, সমাজে যখন সুশীল ও প্রভাবশালী শ্রেণি চুপ হয়ে যায়, তখন অত্যাচারীরা সবচেয়ে বেশি শক্তি পায়। কারণ তখন তারা জানে—তাদের বিরুদ্ধে বলার মতো কোনো বিশ্বাসযোগ্য কণ্ঠ নেই। এই পরিস্থিতি কেবল সাংবাদিক হত্যার বিচারকেই নয়, গোটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে।
সম্ভাব্য সমাধান ও করণীয় কি? সাংবাদিকদের সুরক্ষায় শুধু আবেগ নয়, কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, যাতে সাংবাদিকের নিরাপত্তা, বেতন, ক্ষতিপূরণ, এবং হুমকির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা বাধ্যতামূলক হয়। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে সাংবাদিক হত্যা বা নির্যাতনের মামলাগুলো দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার আওতায় এনে ৬ মাসের মধ্যে রায় ঘোষণা। তথ্যপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। ডিএসএ বা অন্য কোনো আইনের অপব্যবহার রোধ করে সাংবাদিকদের মুক্তভাবে কাজের সুযোগ দেওয়া। রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রদর্শন করতে হবে। ক্ষমতাসীন দলকে প্রমাণ করতে হবে-অপরাধী যেই হোক, বিচার হবে। প্রতিচি ঘটনায় সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। দলমত নির্বিশেষে সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তার জন্য একক মঞ্চ তৈরি করা এবং প্রতিটি ঘটনার শক্ত প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হেেব। সাংবাদিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি ও রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করা, যাতে রাষ্ট্র বাধ্য হয় ব্যবস্থা নিতে।
উপসংহার : ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি আজ সাংবাদিকতা। সত্যবক্তাদের কণ্ঠ যখন রক্তে রঞ্জিত হয়, তখন গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। গাজীপুরে একজন সাংবাদিক বিকেলে ফেসবুক লাইভে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান এবং সে সংবাদ পত্রিকায় ছাপার আগেই রাতে তাকে প্রকাশ্যে গলা কেটে হত্যা করা হয়। এ ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়, এটি এক ভয়াবহ বার্তা-‘সত্য বললে মরতে হবে’। এই হত্যাকাণ্ড যেন সাম্প্রতিক সময়ে বেড়ে চলা ভয়ংকর ট্রেন্ডের প্রতিফলন। শুধু সাংবাদিক নয়, সাধারণ মানুষও এখন নিরাপদ নন। দেশের আইনি কাঠামো, প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া এবং সামাজিক ভূমিকা-সবই আজ প্রশ্নবিদ্ধ। প্রশ্ন শুধু একটি-এই দেশে সত্য বলা কি পাপ? আর কত রক্ত ঝরলে আমরা নিরাপত্তার আশ্বাস পাবো।

লেখক:, সাংবাদিক, সমাজ গবেষক, মহাসচিব-কলামিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ।


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও