প্রভাত রিপোর্ট: জনশক্তি রপ্তানি ব্যুরোর তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের প্রথম পাঁচ মাসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, লেবানন ও জর্ডানে প্রেরিত নারী শ্রমিকের সংখ্যা ২০২৪ সালের তুলনায় কোথাও অর্ধেকে, কোথাও এক-চতুর্থাংশে নেমে এসেছে। বিদেশি শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ কমার পাশাপাশি তৈরি পোশাক খাতেও নারীর উপস্থিতি হ্রাস পাচ্ছে। একসময় গার্মেন্টস খাতে মোট শ্রমিকের ৮০ শতাংশের বেশি ছিলেন নারী, বর্তমানে তা অনেক কমে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৪৫ লাখ ১০ হাজার, যা ২০২৪ সালে কমে দাঁড়ায় ২ কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজারে। একই সময়ে শ্রমশক্তির বাইরে থাকা নারীর সংখ্যা বেড়েছে ৩ কোটি ৫৬ লাখ ৪০ হাজার থেকে ৩ কোটি ৮০ লাখ ১০ হাজারে। অর্থাৎ, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ১৬ লাখ ৩০ হাজার।
আসক-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১,৬২৫ জন, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি। ধর্ষণ, হত্যা, পারিবারিক সহিংসতা বেড়েছে ১০-১৫ শতাংশ। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৫১৬টি, আর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই হয়েছে ৪৮১টি। দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, যৌতুকজনিত হত্যা, যৌন নিপীড়ন- সব ধরনের সহিংসতাই বেড়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ধর্ষণের মামলা ছিল ৩৯২টি, জুনে বেড়ে হয় ৪৯২টি। অপহরণের মামলাও বেড়েছে- প্রথম ছয় মাসেই ৫১৭টি, যা আগের বছরের পুরো সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। ফওজিয়া মোসলেমের মতে, রাজনৈতিক, সামাজিক বা প্রাকৃতিক অস্থিরতার সময় নারী ও শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতা বেড়ে যায়, তাই বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি ছিল।
নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভিন হক বলেন, গত বছর এই সময়টায় আমাদের আকাশচুম্বি প্রত্যাশা ছিল। আমরা মনে করেছি নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্যের বিলুপ্তি ঘটবে এবং নারীর জন্য সহিংসতা মুক্ত জীবন নিশ্চিত হবে। আমরা জানি মৌলিক পরিবর্তন রাতারাতি হবে না। সংস্কার কমিশনগুলো প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। কিন্তু সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের কোনো পদক্ষেপই দৃশ্যমান না। আমরা সংবিধান কমিশন ছাড়া সকল কমিশনের সাথে কথা বলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বাস্তবায়নের জন্য কিছু সুপারিশ করেছি। কিছু পরবর্তীতে নির্বাচিত সরকারের জন্য। দীর্ঘ দিনের নারী আন্দোলনের চাওয়াগুলোও উল্লেখ করেছি। আমরা সংসদে আসন বাড়ানোর কথা বলেছি, কারণ এখন জনসংখ্যা অনেক বেড়েছে। মোট ৬০০ আসন, এর মধ্যে নারীর জন্য সরাসরি নিবার্চনের মাধ্যমে সংরক্ষিত ৩০০ আসনের কথা বলেন শিরীন হক। তিনি বলেন, বিকেন্দ্রীকরণে আমরা জোর দিয়েছি। বিকেন্দ্রীকরণের মধ্য দিয়েই তৃণমূলের নারীর কথাগুলো আমরা শুনতে পাবো। শিরীন হক দুঃখ করে বলেন, ঐক্যমত কমিশনে আমাদের অংশগ্রহণ ছিল না। এ বিষয় আমরা প্রধান উপদেষ্টাকে চিঠি দিয়েও কোনো উত্তর পাইনি।
বাংলাদেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে কমছে, যা দেশের অর্থনীতি ও নারীর ক্ষমতায়নের জন্য বড় ধাক্কা। ইউএন উইমেনের সহযোগিতায় ২০২৫ সালের মে মাসে প্রকাশিত ‘জেন্ডারভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) প্রায় ২১ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ১৮ লাখই নারী, যা মোট চাকরি হারানো মানুষের ৮৫ শতাংশ। বর্তমানে মাত্র ১৯ শতাংশ নারী শ্রমবাজারে সক্রিয়, যা কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
নারী অধিকার ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, অর্ন্তবর্তী সরকারের এক বছর পূর্ণ হলেও নারী সমাজের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠন হলেও তার প্রতিবেদন সমালোচনার মুখে পড়ে, কমিশনের প্রধান ও সদস্যদের অসম্মান করা হয় এবং সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। তাদের মতে, কর্মজীবী নারীর সংখ্যা কমার পাশাপাশি নারী নির্যাতন ও বিচারহীনতা পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করেছে।
বিশ্বব্যাংক ঢাকার কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, নারীর অংশগ্রহণ কমার দুটি প্রধান কারণ রয়েছে- পরিসংখ্যানগত সংজ্ঞার পরিবর্তন এবং প্রযুক্তি ব্যবহার বৃদ্ধি। আগে কৃষি বা গৃহপালিত পশু পালন করা নারীদেরও শ্রমশক্তির অন্তর্ভুক্ত ধরা হতো। আর এখন কেবল অর্থের বিনিময়ে কাজ করা নারীদের গণনা করা হয়। গার্মেন্টস সেক্টরে প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে শ্রমিক পর্যায়ে কাজ কমেছে, যেখানে নারী শ্রমিকই বেশি ছিলেন।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব, নারী নির্যাতনের বৃদ্ধি এবং দুর্বল আইনি কাঠামো কর্মজীবী নারীর সংখ্যা কমার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। তার অভিযোগ, সরকারের এজেন্ডায় নারীর অবস্থান স্পষ্ট নয় এবং যৌন নির্যাতনের বিচার না হওয়ায় নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, অর্ন্তবর্তী সরকারের উচিত ছিল ধর্ষণের দ্রুত বিচার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় সমন্বয় নিশ্চিত করা। কিন্তু দক্ষ সরকারি আইনজীবীর ঘাটতি, পুলিশের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা নারীদের অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। তিনি মনে করেন, দীর্ঘদিনের নারীর ক্ষমতায়নের অগ্রগতি এখন পিছিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে।