প্রভাত রিপোর্ট: আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে সবার আকাক্সক্ষার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। জাতির উদ্দেশে তার দেওয়া এ ঘোষণায় নির্বাচন নিয়ে জনমনে অনিশ্চয়তা কাটলেও, পক্ষে-বিপক্ষে চলছে নানা সমীকরণ। দ্রুত নির্বাচন না হওয়ার ব্যাপারে সক্রিয় রাজনীতি যেমন চলছে, তেমনি নির্বাচন আদায় করে নিতেও তৎপর দলগুলো।
বিএনপি বলছে, জনগণ ভোট দিতে মুখিয়ে আছে; ফলে দ্রুত নির্বাচন দরকার। জামায়াতে ইসলামী বলছে, পিআর পদ্ধতিতে হতে হবে নির্বাচন। এনসিপি বলছে, আগে সংস্কার-বিচার, তারপর নির্বাচন।
এদিকে জুলাই সনদ নিয়েও চলছে নানান সমালোচনা। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে অংশ নেয়া দলগুলোর বিভিন্ন বক্তব্য সনদে স্বাক্ষর নিয়ে সংশয়-সন্দেহ তৈরি করেছে। সনদে স্বাক্ষরের জন্য বুধবার (২০ আগস্ট) ধার্য করা হলেও এরই মধ্যে বিএনপি সনদে স্বাক্ষর না করার ইঙ্গিত দিয়েছে। বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি স্বাক্ষর নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছে। দলটি সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স জুলাই সনদের খসড়ায় আলোচনা হয়নি এমন বিষয় উঠে এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন।
রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনায় উঠে আসে, আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের সুস্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া হলেও নির্বাচন নিয়ে সব জটিলতা দূর হয়ে গেছে এটা পরিষ্কার করে বলা যাবে না। জামায়াত ও এনসিপির দাবিতে রয়ে গেছে জটিলতা। ফলে নির্বাচন হওয়া না হওয়ার আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছে এখন। একাধিক উপদেষ্টা ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবেই এমন জোরালো বক্তব্য দিলেও স্বস্তি নেই কারোর ভেতরই। তবে নির্বাচন অনিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো রাজনীতি বিএনপি করবে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন এখন জনদাবি। এটি বুঝতে পেরেছে অন্তর্বর্তী সরকার। তাই গত ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা জামায়াত ও এনসিপির দাবির চেয়ে বিএনপির নির্বাচনের দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে সেদিকেই হাঁটছে সরকার। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের পক্ষে নয় বিএনপি। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য জাতীয় নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। মঙ্গলবার চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, দেশের মানুষ নির্বাচন চায়, সংকট নিরসনের একমাত্র পথ দ্রুত নির্বাচন। যারা সংস্কার চাচ্ছে না, সেটা তাদের দলের ব্যাপার।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, কোনো সনদই সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়। জুলাই সনদ নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না, এমন বক্তব্য যথার্থ নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর এমন বক্তব্য সনদে স্বাক্ষর নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রাখে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক নেতা গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা মনে করতে চাই সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানে সুবিধাবাদি গোষ্ঠীর চেয়ে জনসমর্থিত রাজনৈতিক দলের দাবিকে বেশি গুরুত্ব দেবে। নির্বাচন আটকাতে পিআর পদ্ধতির ট্রামকার্ড মাঠে ছাড়ে জামায়াত। সংস্কার ও বিচারে গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচন আটকানোর আরেকটি ট্রামকার্ড ছুড়েছে এনসিপি। নির্বাচনের চেয়ে তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জুলাই সনদ। দলটি অর্ন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এর আইনি ভিত্তি পেতে চায়। এজন্য গণপরিষদ নির্বাচনই সমাধান মনে করে তারা।
এসব নানা দাবির ভেতরে নির্বাচনের জোরালো দাবি জানিয়েছে বিএনপি। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য জাতীয় নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। জনদাবিকে সামনে এনে জামায়াত-এনসিপির ছোড়া দুটি ট্রামকার্ডকে ওভার ট্রাম করে নির্বাচনের দাবি করে কার্ড মেরেছে বিএনপি। বিএনপির নীতিনির্ধারণী মহল এই মুহূর্তে যেকোনো মূল্যে নির্বাচন আদায়ের রাজনীতি করতে চায়। নির্বাচন নিয়ে জট তৈরি করা, নির্বাচন ইস্যুতে সরকারের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি করার রাজনীতি করতে চায় না বিএনপি।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘পিআর (সংখ্যানুপাতিক) পদ্ধতিতে নির্বাচন, ভোটের আগে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন চাই আমরা। ঐকমত্য কমিশনে যে মতামত দেব, তাতে এর উল্লেখ থাকবে। বিএনপি একটা বড় দল। তাদের ছাড় দিতে হবে। আশা করি তারা রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামে যারা ছিলেন, তাদের দাবির প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে।’
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শরিক দলগুলোর মধ্যে যে বিভেদ চলছে, তাতে নির্বাচন নিয়ে জনমনে নানা শঙ্কা তৈরি হয়েছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ‘নির্বাচনের আগে আমাদের হাতে সময় রয়েছে। ঐকমত্য কমিশন প্রথমে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক করবে। এরপর আবার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করবে। বৈঠকে আলোচনার মাধ্যমে আমরা একটা সমাধানে আসতে পারব বলে মনে করি। নির্বাচন নিয়ে এখনই শঙ্কার কিছু দেখছি না।’