• সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৪:১৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
আবারও ডিআরইউর সভাপতি সালেহ আকন, সাধারণ সম্পাদক সোহেল ষড়যন্ত্রের শিকার নাজিরপুর যুবদল নেতা রিয়াজ শেখ বাজারে মানুষ ধোয়ার মেশিন আনল জাপান রাণীশংকৈলে সমাজসেবা অফিসের ইউনিয়ন সমাজকর্মী সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত পিরোজপুর জেলা সরকারি চাকুরিজীবী কল্যাণ পরিষদের সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত মাদারীপুরে অনুষ্ঠিত হলো লক্ষ টাকার গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের জমজমাট ফাইনাল এসব খাবার আপনাকে সারা দিন চনমনে রাখবে ঘোড়াঘাটে দরিদ্র মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান করলেন ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া, সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন তারেক রহমানের তথ্য বিকৃত করে জনমত প্রভাবিত করার যুগ শেষ: প্রেস সচিব

দক্ষিণ কোরিয়ার অভিযোগ কেন্দ্র ও পাবলিক হিয়ারিং এবং বাংলাদেশ

প্রভাত রিপোর্ট / ২৪৮ বার
আপডেট : মঙ্গলবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

……………………….সাইফুর রহমান………………………..

জনগণের অভিযোগ শোনা ও সমাধান করার ব্যবস্থা যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ কোরিয়ায় মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত এ ধরণের একটি শক্তিশালী ব্যবস্থা বিকশিত হয়েছে, যা দুর্নীতি কমাতে ও জনগণের আস্থা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের অভিযোগ ব্যবস্থায় এখনও অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এই প্রতিবেদনে দক্ষিণ কোরিয়ার ঐতিহাসিক শিনমুনগো থেকে শুরু করে আজকের ডিজিটাল গুকমিন শিনমুনগো বা জাতীয় অভিযোগ পোর্টাল পর্যন্ত বিবর্তন তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অভিযোগ ও পাবলিক হিয়ারিং কীভাবে কাজ করে, এর বাস্তব উদাহরণ, সমাজে এর প্রভাব, এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কী কী ঘাটতি রয়েছে ও সেগুলো পূরণে কী করণীয় তা আলোচনা করা হবে। তথ্যসূত্রের ভিত্তিতে সংবাদধর্মী ও মানবিক দৃষ্টিকোণে বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো।

ইতিহাস: রাজদরবারের ঢোল শিনমুনগো থেকে heutigen

মধ্যযুগীয় কোরিয়ায় রাজপ্রাসাদের বাইরের দরজায় ঝুলানো শিনমুনগো (অভিযোগের ঢোল) ছিল জনগণের অন্যায়ের কথা সরাসরি রাজার কানে পৌঁছানোর উপায়। বলা হয়, চোসন রাজবংশের প্রতিষ্ঠার প্রায় ১০ বছর পর ১৪০১ সালে রাজা তেজং এই পিটিশনের ঢোল স্থাপন করেন, যাতে স্থানীয় প্রশাসনে বিচার না পেলে সাধারন মানুষ রাজাকে সংকেত দিতে পারে এবং রাজা সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন। অবশ্য শুরুতে শিনমুনগো ব্যবহার করতে বেশ বাধার সম্মুখীন হতে হত – ঢোল বাজানোর আগে উপজেলা প্রধান, জেলা প্রশাসক ও ইনস্পেক্টর জেনারেলের কাছে দুর্নিবার ঘুরে অনুমতি নিতে হতো, যা অনেককে নিরুত্সাহিত করত। তবু এটি জনগণের বক্তব্য সরাসরি শাসকের কাছে পৌঁছানোর প্রথম উদ্যোগ হিসেবে ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।
১৫শ শতাব্দীতে মহান রাজা সেজং জনগণের অভিযোগ শোনার পদ্ধতিকে আরও মানবিক ও উন্মুক্ত করতে উদ্যোগ নেন। একটি স্মরণীয় ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়: রাজা সেজং-এর সময় এক নারী গৃহপরিচারিকা রাজপ্রাসাদের ফটকে একটি ঘণ্টা বাজিয়ে অভিযোগ জানাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তাকে শিনমুনগো ঢোল বাজাতে বাধা দেন। রাজা সেজং বিষয়টি জানতে পেরে সেই কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেন এবং বলেন, “অভিযোগ যদি মিথ্যা হয়, তবে তদন্ত শেষে শাস্তি দেওয়া যাবে; কিন্তু অভিযোগ জানানোর সুযোগ কেন আটকালো?” । এই দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে যে সেসময়ের ন্যায়পরায়ণ শাসকেরা জনগণের কষ্টার্জিত কথা শোনাকে কতটা গুরুত্ব দিতেন।
রাজা সেজং-এর উত্তরসূরি রাজা সঙজং (Seongjong, শাসনকাল ১৪৬৯–১৪৯৪) শিনমুনগো ব্যবস্থা নিয়ে উল্লেখযোগ্য সংস্কার সাধন করেন। তিনি জটিল নিয়ম-কানুন সরল করে দেন, যাতে সাধারণ প্রজারা সহজে দরবারে আবেদন জানাতে পারে। ফলস্বরূপ সঙজং-এর শাসনামলে পিটিশন ব্যবস্থা ব্যবহারের হার বেড়ে যায় এবং আরও বেশি মানুষের ব্যক্তিগত দুর্দশার প্রতিকার হতে থাকে। অবশ্য সব সময় এই মুক্ত অভিযোগ প্রক্রিয়া চালু থাকেনি। কিছু স্বার্থান্বেষী আমলা শিনমুনগোর অপব্যবহারের ভয় দেখিয়ে রাজাদের চাপে রেখেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, অত্যাচারী রাজা ইয়নসানগুন-এর আমলে অভিযোগের ঢোল নিষিদ্ধ করা হয়, কারণ দেখা যায় রাজপুরুষ ও রাজধানীর উচ্চবর্গের লোকেরা এতে বেশি সুবিধা নিচ্ছে, সাধারণ মানুষ বা দাসরা ততটা সুযোগ পাচ্ছে না। পরবর্তীতে রাজা ইয়ংজো-এর যুগে (১৮শ শতাব্দীতে) এটি পুনরায় চালু হয় এবং “ট্যাংপিয়ং নীতি”র আওতায় জনমত জয়ের মাধ্যম হিসেবে জনপ্রিয়তা পায়।
কালের প্রবাহে কোরিয়ায় রাজতন্ত্র শেষ হয়েছে, কিন্তু জনগণের অভিযোগ শোনা ও সমাধানের “জনগণের শিনমুনগো” ভাবধারা রয়ে গেছে। আধুনিক দক্ষিণ কোরিয়ায় এই ঐতিহ্যের আধুনিক রূপ হলো “গুকমিন শিনমুনগো”, অর্থাৎ জাতীয় অভিযোগ কেন্দ্র, যা আজ সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে দেশটির স্বশাসিত অ্যান্টি-করাপশন অ্যান্ড সিভিল রাইটস কমিশন (ACRC) এই শিনমুনগো ধারার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করে। এর আওতায় রয়েছে “ই-পিপল” (e-People) নামে একটি অনলাইন পোর্টাল, যেখানে নাগরিকরা অভিযোগ, দাবিপত্র বা নীতি-প্রস্তাব জমা দিতে পারেন; অনলাইন প্রশাসনিক আপিল ব্যবস্থা; এবং “ক্লিন পোর্টাল” যেখানে দুর্নীতি বা জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের করা যায়। শত শত বছর আগের রাজদরবারের দরজায় ঝোলানো ঢোলের জায়গা আজ নিয়েছে অনলাইন ও মোবাইল প্রযুক্তি, কিন্তু উদ্দেশ্য একই – ক্ষমতাসীনদের কাছে সাধারণ মানুষের কণ্ঠ পৌঁছে দেওয়া।

আধুনিক কাঠামো: ডিজিটাল অভিযোগ কেন্দ্র ও পাবলিক হিয়ারিংয়ের কার্যপ্রণালী

দক্ষিণ কোরিয়ায় বর্তমানে অভিযোগ গ্রহণ ও জনশুনানির পুরো ব্যবস্থাটি কেন্দ্রীয়ভাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সমন্বিত। e-People নামের ওয়েব পোর্টালটির মাধ্যমে দেশের প্রায় সব সরকারি সংস্থা একই ছাতার নিচে সংযুক্ত হয়েছে। ২০০৫ সালে চালু হওয়ার পর থেকে এটি ক্রমাগত সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে e-People প্ল্যাটফর্মের সাথে ৪৩টি কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয়/সংস্থা, ২৪৪টি স্থানীয় সরকার, ১৯৪টি শিক্ষা বিভাগ, ১৪৪টি বৈদেশিক দূতাবাস/কনস্যুলেট এবং ১৯টি প্রধান রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সংযুক্ত – অর্থাৎ প্রায় পুরো সরকারি যন্ত্রপাতিই একীভূত অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থার আওতায় এসেছে। এর ফলে নাগরিকরা একক পোর্টালে প্রবেশ করেই যেকোনো সরকারি দপ্তরের বিরুদ্ধে অভিযোগ বা দাবি জমা দিতে পারেন, আলাদা আলাদা দপ্তর খুঁজে হয়রান হতে হয় না।
অভিযোগ দায়ের প্রক্রিয়াটিও ব্যবহারকারীবান্ধব এবং স্বচ্ছভাবে নকশা করা হয়েছে। নাগরিক অনলাইনে একটি নির্ধারিত ফর্ম পূরণ করে অভিযোগ জমা দেন। জমার আগে একই ধরনের অভিযোগ আগে কেউ করেছেন কি না, তা খুঁজে দেখার সুযোগ থাকে (যাতে ডুপ্লিকেট এন্ট্রি কমে) । অভিযোগ জমা হলে সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের কাছে সেটি ফরোয়ার্ড করে এবং অভিযোগকারীকে একটি ইউনিক রেফারেন্স নম্বরসহ গ্রহণের প্রাপ্তিস্বীকার পাঠায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, দক্ষিণ কোরিয়ায় কোনো নাগরিক যদি নিজের এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামতের অনুরোধ জানিয়ে e-People মাধ্যমে অভিযোগ করেন, সাথে সাথেই তাঁকে ই-মেইলে জানিয়ে দেওয়া হয় যে তাঁর অভিযোগ রেজিস্টার হয়েছে এবং একটি ট্র্যাকিং নম্বর প্রদান করা হয়েছে। এই নম্বরের সাহায্যে তিনি পরে অনলাইনে লগইন করে বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে তার অভিযোগের অগ্রগতি যেকোনো সময় দেখতে পারেন। এমনকি অভিযোগ কোন দপ্তরে পৌঁছেছে, কার কাছে অ্যাসাইন হয়েছে, কতদিনের মধ্যে সমাধান হবে – এসব তথ্যও সিস্টেম জানিয়ে দেয়। সমস্যা সমাধান হয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ অভিযোগকারীকে আবার ই-মেইল/এসএমএসের মাধ্যমে ফলাফল জানায় এবং ধন্যবাদ জানায় যে নাগরিক উদ্যোগ নিয়ে সমস্যাটি রিপোর্ট করেছেন। পুরো প্রক্রিয়াটি সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয় – দক্ষিণ কোরিয়ার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে সাধারণ প্রশাসনিক অভিযোগ নিষ্পত্তির গড় সময় ২০০৬ সালের ৭.৮ দিন থেকে কমে ২০১১ সালে ৫.৭ দিনে নেমে আসে, যা দ্রুততম সেবাপ্রদানের উদাহরণ।
অভিযোগ নিষ্পত্তি হওয়ার পর নাগরিকের মতামতও নেওয়া হয়। প্রতিটি ইস্যু বন্ধ করার আগে e-People প্ল্যাটফর্ম অভিযোগকারীকে সে সমাধানে সন্তুষ্ট কি না জিজ্ঞাসা করে এবং সন্তুষ্টি মূল্যায়ন সংগ্রহ করে। এই ফিডব্যাক ব্যবস্থার মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ সেবার মান নিয়ে নাগরিকদের মতামত জানতে পারে এবং প্রয়োজনে ব্যবস্থা উন্নত করতে পারে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ায় পাবলিক হিয়ারিং বা জনশুনানি প্রক্রিয়াও ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ACRC বহু ক্ষেত্রে সরাসরি জনগণের দোরগোড়ায় গিয়ে অভিযোগ শোনার উদ্যোগ নেয়, বিশেষ করে যেসব জনগোষ্ঠী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে অসুবিধায় পড়েন বা দূরবর্তী অঞ্চলে থাকেন। “মোবাইল জাতীয় শিনমুনগো” নামে ভ্রাম্যমাণ অভিযোগ কেন্দ্র চালু করা হয়েছে, যা একটি চলন্ত বাসের মত বিভিন্ন এলাকায় যায় এবং সেখানকার সাধারণ মানুষ যাতে মুখোমুখি হয়ে কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন, তা নিশ্চিত করে। প্রতি মাসে ভিন্ন ভিন্ন জেলায় এধরনের খুলনা-দিল্লি বাস সার্ভিসের মত “চলন্ত জাতীয় শিনমুনগো” ক্যাম্প করা হয়, যেখানে কেন্দ্র থেকে ACRC’র অভিজ্ঞ তদন্ত কর্মকর্তা, আইন সহায়তা সংস্থা, ভোক্তা অধিকার সংস্থা, ভূমি ও মানচিত্র করপোরেশন, ক্ষুদ্রঋণ ও আর্থিক সংস্থার প্রতিনিধি মিলিয়ে প্রায় ২০ জনের একটি বিশেষজ্ঞ দল অংশ নেন। এই দলের সাথে এলাকার সাধারণ মানুষ সরাসরি তাদের যেকোনো সমস্যা নিয়ে পরামর্শ করতে পারেন এবং তাৎক্ষণিক সমাধানের চেষ্টা করা হয়। যে বিষয়গুলো জটিল ও সমাধান সম্ভব নয়, সেগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ড করে পরে বিস্তারিত তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সাথে আলোচনা করে নিষ্পত্তির জন্য নিবন্ধিত করা হয়। এই ধরনের জনশুনানিতে পার্শ্ববর্তী জেলা থেকেও লোকজন এসে অংশ নিতে পারেন, এবং অনেক সময় স্থানীয় প্রশাসন ও জাতীয় পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিদের একই ছাদের নিচে এনে সবার সম্মুখে একটি সামষ্টিক শুনানির পরিবেশ তৈরি হয়। এতে প্রশাসনের উপর জনগণের আস্থা বাড়ে, কারণ তারা দেখে অভিযোগ লুকানো হচ্ছে না, বরং খোলা ময়দানে সমাধানের উদ্যোগ চলছে।
সাধারণ অনলাইন অভিযোগ থেকে শুরু করে অফলাইন পাবলিক হিয়ারিং পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাটিই এখন একটি সমন্বিত এক-স্টপ সেবা। নাগরিক চাইলে ১১০ নম্বর সরকারি কল সেন্টারে ফোন করেও অভিযোগ জানাতে পারেন, যা একই প্ল্যাটফর্মে এন্ট্রি হয়ে যায়। আবার স্মার্টফোনের মাধ্যমে e-People অ্যাপে অভিযোগ করা, আপডেট জানা – সবকিছুই সম্ভব। এককথায়, দক্ষিণ কোরিয়া অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়াকে আধুনিক প্রযুক্তি, আন্তঃসংস্থার সমন্বয় এবং স্বচ্ছতা দিয়ে এমনভাবে গড়ে তুলেছে যে তা সরকারের আরেকটি নাগরিক সেবা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

বাস্তব উদাহরণ: নাগরিকের অভিযোগ থেকে জনশুনানি ও সমাধান

দক্ষিণ কোরিয়ার অভিযোগ ব্যবস্থা যে বাস্তবে কতটা কার্যকর, তা বোঝার জন্য একটি বাস্তব কেস স্টাডি বিবেচনা করা যেতে পারে। কল্পনা করুন, একদল কৃষক দীর্ঘদিন ধরে সরকারি জমি চাষ করছেন, কিন্তু ঐ জমির মালিকানা বা লিজ নিয়ে সরকার অনেক বছর আগে একটা প্রতিশ্রুতি দিলেও তা পূরণ করেনি। এমনই একটি বাস্তব ঘটনা ঘটে যেখানে কোরিয়ান যুদ্ধের পর পরিত্যক্ত কিছু কৃষিজমি চাষ করে আসা কৃষকরা সরকারের কাছে জমির অধিকার চেয়ে আসছিলেন। দাবি করা হয়, প্রায় ৭০-৮০ বছর আগে সরকার এই ভূমি চাষীদের দিতে কথা দিয়েছিল, কিন্তু কথা রাখা হয়নি। অসন্তুষ্ট কৃষকরা অবশেষে দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় পিটিশন সিস্টেম (গুকমিন শিনমুনগো/e-People) এর মাধ্যমে সমষ্টিগত অভিযোগ (collective complaint) দায়ের করেন।
এই ধরনের বড় ও জটিল বিষয় সমাধানে ACRC বিশেষ পদ্ধতিতে উদ্যোগ নেয়। কমিশনটি সংশ্লিষ্ট ১০টি কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকার দপ্তর এবং সরকারি কোম্পানিকে নিয়ে একত্রে আলোচনার টেবিলে বসায়। অভিযোগকারীদের প্রতিনিধিরাও সেই আলোচনায় অংশ নেন – এক প্রকার জনসম্মুখে পাবলিক হিয়ারিং এর পরিবেশ তৈরি হয় যেখানে সকল পক্ষ নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। টানা কয়েক বছরের পরিশ্রমী মধ্যস্থতায় অবশেষে ২০২০ সালে সরকার একটি বিশেষ আইন প্রণয়ন করে যা সেই জমিগুলো রাষ্ট্রের অধীনে নিয়ে কৃষকদের কাছে নামমাত্র মূল্যে বিক্রয় করার ব্যবস্থা করে। ফলে বহু বছর ধরে ঝুলে থাকা একটি প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়, কৃষকরাও ন্যায্য অধিকার পান। এই প্রক্রিয়ায় ACRC কার্যত সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও নাগরিকদের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেছে, সবার মতামতের ভিত্তিতে এমন একটি সমঝোতা দাঁড় করিয়েছে যেটি সকলেই মেনে নিতে পারে।
আরেকটি উদাহরণ দেখা যায় পরিবেশ ও অবকাঠামো সংক্রান্ত বিরোধে। এক এলাকায় ৫,৪০০ বাসিন্দা রাস্তার পাশে অতিরিক্ত শব্দদূষণের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযোগ করেন। তদন্তে দেখা যায় নিকটবর্তী প্রধান সড়কের যানবাহনের শব্দই সমস্যার মূল এবং এর দায়িত্ব কোনো নির্দিষ্ট সংস্থার অধীনে রয়েছে। ACRC এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বৈজ্ঞানিক শব্দমাত্রা পরিমাপের ভিত্তিতে সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনার সুপারিশ করে এবং কর্তৃপক্ষ তা মেনে নেয়। একইভাবে দক্ষিণ উপকূলে একটি নতুন বন্দর নির্মাণের কারণে ১,২০০ জেলে জীবিকা হারানোর ঝুঁকিতে পড়লে, ACRC তাদের পক্ষ থেকে মধ্যস্থতায় নামে। দীর্ঘ আলোচনায় একটা সমাধান বের হয়: স্থানীয় সরকার কম দামে জেলেদের বিকল্প জমি দেবে ও পুনর্বাসনে সহায়তা করবে, যাতে তারা নতুনভাবে জীবিকা গড়ে নিতে পারেন। সব পক্ষের ঐকমত্যে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় এবং এক বড় সামাজিক সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয়।
উপরের ঘটনাগুলো থেকে স্পষ্ট, দক্ষিণ কোরিয়ায় নাগরিকের অভিযোগ যদি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ও বহুজনের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট হয়, তাহলে সেটি কেবল কাগুজে চিঠিপত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ACRC তা সংগ্রহ করে পাবলিক হিয়ারিং-মতো পরিবেশে সকল স্টেকহোল্ডারকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সামাধানের পথ খোঁজে। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, বিশেষজ্ঞ সংস্থা এবং নাগরিক সমাজ সবাইকে সম্পৃক্ত করে সমস্যা সমাধান করায় সিদ্ধান্তগুলো কার্যকর করতেও তেমন বাধা থাকে না। নাগরিকরা দেখেন যে তাঁদের অভিযোগে সরকার সত্যিই পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং প্রয়োজনে নীতি বা আইন পরিবর্তন করতেও দ্বিধা করছে না। এটি জনগণের মধ্যে একটি শক্ত বার্তা পাঠায় – “আপনার কণ্ঠ মূল্যবান, এবং প্রশাসন তা শ্রদ্ধা করে”।
সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রভাব: দুর্নীতি হ্রাস, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি ও জনগণের আস্থা
দক্ষিণ কোরিয়ার অভিযোগ কেন্দ্রিক সেবাপদ্ধতি কেবল ব্যক্তি বা স্থানীয় সমস্যার সমাধানেই থেমে নেই; সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের সুশাসন, স্বচ্ছতা ও দুর্নীতিদমনেও এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়েছে। ঐতিহাসিকভাবে রাজা জংজো বলেছিলেন, “রাষ্ট্রের উত্থান-পতন নির্ভর করে উন্মুক্ত যোগাযোগের উপর; জনমতের কণ্ঠ রুদ্ধ হলে দেশ টিকে থাকতে পারে না” । আধুনিক যুগে গুকমিন শিনমুনগো সেই উন্মুক্ত যোগাযোগের মাধ্যমকে প্রযুক্তিগত রূপ দিয়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে একটি কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
প্রথমত, এই সিস্টেমটি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি শক্ত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। নাগরিকরা এখন সহজেই যেকোনো অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা বা কর্মকর্তার দুর্ব্যবহারের ব্যাপারে অভিযোগ জানাতে পারেন। অনলাইন পোর্টালে অভিযোগ জমা হওয়ার সাথে সাথেই তা রেকর্ড হয়ে যায় এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নজরে আসে। ফলে আগের মতো অভিযোগ পত্রচালাচালির আড়ালে হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। জনসাধারণের দৃষ্টিতে আসে বলেই প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানেন যে তাদের কর্মকাণ্ড এখন নিবিড় পর্যবেক্ষণের আওতায়। দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার করলে যে নাগরিকরা রিপোর্ট করবেন এবং তার প্রমাণ রয়ে যাবে, এই কর্মকর্তাদের অনেক বেশি সাবধান ও দায়িত্বশীল করে তুলেছে। এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরাসরি অফিসে গিয়ে কাগজে দরখাস্ত দিলে অনেক সময় কর্মকর্তারা সেটি বছরের পর বছর ফেলে রাখতে পারতেন বা গোপন রাখতে পারতেন; কিন্তু অনলাইন ব্যবস্থায় অভিযোগের স্ট্যাটাস লুকানোর কোনো উপায় নেই – সব অগ্রগতি ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডে লিপিবদ্ধ থাকে। ফলে বাধ্য হয়ে হলেও কর্তৃপক্ষকে নিষ্পত্তি করতে হয়, নয়তো উর্ধ্বতন মহলে জবাবদিহি করতে হয়।
দ্বিতীয়ত, এই ব্যবস্থার ফলে দুর্নীতির সুযোগ হ্রাস পেয়েছে। আগে যদি নাগরিকরা সেবা পেতে অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করত (যেমন দ্রুত কাজ আদায়ে ঘুষ দেওয়া), এখন তার প্রয়োজন অনেক কমে এসেছে। কারণ নাগরিক জানেন যে অনিয়ম হলে তিনি সরাসরি অভিযোগ জানিয়ে দিতে পারবেন এবং সেটির আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও সমাধান হবে। উদাহরণস্বরূপ, সরকারি দপ্তরে ফাইল আটকে রাখার প্রবণতা কমেছে, কারণ ফাইল আটকালেই নাগরিক e-People-এ অভিযোগ দায়ের করছেন এবং উচ্চপর্যায় থেকে চাপ আসছে সমাধানের জন্য। সরকারের anticorruption নীতির অংশ হিসেবে ACRC’র এই Complaint সিস্টেমটি এতটাই গুরুত্ব পাচ্ছে যে ২০১১ সালে জাতিসংঘ দক্ষিণ কোরিয়ার e-People উদ্যোগকে পাবলিক সার্ভিস অ্যাওয়ার্ডেও স্বীকৃতি দেয় – যা বৈশ্বিক পর্যায়ে সুশাসনের উদ্ভাবনী দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
তৃতীয়ত, জনগণের আস্থা বৃদ্ধি ও সরকার-জনসাধারণের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনায় এ ব্যবস্থার বড় ভূমিকা রয়েছে। প্রতিবছর দক্ষিণ কোরিয়ায় গড়ে প্রায় ১.৩ কোটি অভিযোগ, পরামর্শ ও আবেদন e-People প্ল্যাটফর্মে জমা পড়ে। এটি বিপুল সংখ্যক নাগরিকের অংশগ্রহণের নির্দেশক। মানুষ বিশ্বাস করছে যে এই প্ল্যাটফর্মে কথা বললে তা শোনা হবে এবং কাজ হবে, তাই তারা সময় নিয়ে অভিযোগ লিখছে। আশ্চর্যের বিষয়, ACRC থেকে বিভিন্ন সরকারি সংস্থাকে সংশোধনের যে সুপারিশ দেওয়া হয়, তার প্রায় ৯৬% ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সেই পরামর্শ মেনে নিয়ে ব্যবস্থা নিয়েছে। প্রায় শতভাগই সুপারিশ মান্য করার এই হার বোঝায় যে সরকারি দপ্তরগুলোও এই সিস্টেমকে ভয় বা শ্রদ্ধার চোখে দেখছে – তারা জানে নাগরিকের অভিযোগ এলে আমলাদের পক্ষে উপেক্ষা করা মুশকিল। এর ফলে প্রশাসনে জবাবদিহিতা বেড়েছে।
আরেকটি দিকে লক্ষ্যণীয় উন্নতি হলো নীতিগত সংস্কার। লাখ লাখ অভিযোগের তথ্য big data হিসেবে বিশ্লেষণ করে ACRC বুঝতে পারে কোন খাতে বা নীতিতে বারবার সমস্যা হচ্ছে। এ থেকে প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। যেমন, দেখা গেল ভূমি রেজিস্ট্রেশন বা শিশুদের স্কুলে যাতায়াত নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়ে প্রচুর অভিযোগ আসছে; তখন সরকার প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিতে পরিবর্তন এনেছে যাতে সেই অভিযোগের কারণগুলোই দূর হয়। এভাবে অভিযোগ ব্যবস্থাকে শুধুই রিঅ্যাকটিভ (প্রতিক্রিয়াধর্মী) না রেখে প্রো-একটিভ (প্রাকৃতিক প্রতিকারধর্মী) তকমা দেওয়া হয়েছে – জনগণের মতামত ও অভিযোগ নীতিনির্ধারণে ব্যবহার করে আগাম সমস্যার সমাধান করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, দক্ষিণ কোরিয়ার এই অভিযোগ ও জনশুনানি ব্যবস্থা দুর্নীতির বিরুদ্ধে পাহারাদার, জনসেবায় স্বচ্ছতার পরিবেশক এবং জনআস্থার ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। মানুষের মনে এখন এই বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছে যে রাষ্ট্র তাঁদের কথা শুনছে এবং যেকোনো দুর্ভোগে আইনি ও প্রশাসনিক প্রতিকার পাওয়া নাগরিকের অধিকার। এমন একটি পরিবেশে নাগরিকরা সাহস করে দুর্নীতির বিরুদ্ধেও সরব হতে পারেন, কারণ জানেন যে নিরাপদ উপায়ে তা নথিভুক্ত হবে এবং যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এক কথায়, শিনমুনগোর ঐতিহ্যবাহী “জনতার ঢোল” আজকের ডিজিটাল যুগে এসে জনগণের শক্তিকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: বর্তমান অভিযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা
বাংলাদেশে নাগরিক অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির সংস্কৃতি এখনও উন্নয়নশীল পর্যায়ে রয়েছে। সরকারি অফিসগুলোতে অনেক সময় অভিযোগ বাক্স ঝুলতে দেখা যায়, যেখানে নাগরিকরা লিখিত অভিযোগ ফেলার সুযোগ পান। এছাড়া কিছু মন্ত্রণালয় ও সংস্থা হটলাইন নম্বর বা ইমেইল চালু করেছে অভিযোগের জন্য। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের “জনগণের আওয়াজ” বা পুলিশের “আইজিপি কমপ্লেইন সেল” ইত্যাদি উদ্যোগও আছে। তবুও এসব ব্যবস্থা সামগ্রিকভাবে এখনো খণ্ডিত, অপ্রতুল ও অনেকাংশে অকার্যকর বলে সাধারণ ধারণা।
বাংলাদেশে একটি কেন্দ্রীয় গ্রিভান্স রিড্রেস সিস্টেম (GRS) চালুর উদ্যোগ প্রথম হয়েছিল ১৯৮৬ সালে। কিন্তু পরবর্তী কয়েক দশকে এই ব্যবস্থা কাঙ্খিত উন্নতি করেনি – অনেক দপ্তরেই তা ছিল কাগজে-কলমে, জনগণের কাছে পরিচিতও নয়। ২০০৭ সালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ একটি সার্কুলারের মাধ্যমে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে একে সক্রিয় করার তাগিদ দেয় এবং প্রতিটিতে গ্রিভান্স রিড্রেস অফিসার (GRO) নিযুক্ত করার কথা বলে। সে সময় সচিবালয়ের গেট নাম্বার ৫ এ কেন্দ্রীয়ভাবে অভিযোগ সংগ্রহের বুথও স্থাপন করা হয়েছিল, যা ম্যানুয়ালভাবে পাইলট প্রকল্প হিসেবে কিছু অভিযোগ দ্রুত সমাধানে সহায়তা করে। তবে এটি বড় পরিসরে ছড়ায়নি।
ডিজিটাল বাংলাদেশের কর্মসূচীর আওতায় এক যুগ পরে এসে GRS কে প্রযুক্তিনির্ভর করার চেষ্টা শুরু হয়। ২০১৫ সালে সরকারের Aspire to Innovate কর্মসূচির সহায়তায় একটি অনলাইন GRS সফটওয়্যার/পোর্টাল চালু করা হয় এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহকে এতে সংযুক্ত করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় একই অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জনগণ অভিযোগ জানাতে পারবেন এবং তা কেন্দ্র থেকে মনিটর হবে। কিন্তু বাস্তবে ২০২3 সাল নাগাদ ৬৪ জেলার মধ্যে মাত্র ২১টি জেলায় পূর্ণাঙ্গ অনলাইন GRS কার্যকর হয়েছে। এছাড়া এই সিস্টেমটি এখন পর্যন্ত জেলা প্রশাসক কার্যালয় পর্যন্ত সীমাবদ্ধ – অথচ বাংলাদেশের বেশিরভাগ নাগরিক সেবা দেওয়া হয় উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে। ফলে তৃণমূলের মানুষ এখনো সেই পুরনো পদ্ধতিতেই উপজেলা বা ইউনিয়ন অফিসে গিয়ে দরখাস্ত জমা দিয়ে অপেক্ষা করেন, অনলাইনে অভিযোগ জানানোর সুবিধা তাঁদের জন্য সরবরাহ হয়নি।
বর্তমান অভিযোগ ব্যবস্থার আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো জনপ্রিয়তার অভাব ও স্বল্প-সচেতনতাবোধ। সরকারীভাবে GRS ওয়েবসাইট থাকলেও খুব কম সাধারণ নাগরিকই এর নাম জানেন বা ব্যবহার করেছেন। এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সিস্টেমটি উন্নত শাসন নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনো জনগণের কাছে ততটা জনপ্রিয় নয় এবং পরিষেবা ঠিকমতো হাতে না পৌঁছানোর কারণে চাহিদা-পক্ষ (demand side) এটি গ্রহণে দ্বিধাগ্রস্ত। সঠিক প্রচারণা ও সচেতনতার অভাবে বহু মানুষ জানেনই না যে অনলাইনে বা এসএমএসে অভিযোগ করার সুযোগ আছে। এখনও অনেকেই সমস্যা হলে সরাসরি উর্ধ্বতন অফিসার বা দপ্তরে গিয়ে ঘুরতে থাকেন। এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় হয়রানি, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য ও ঘুষ লেনদেনের সুযোগ রয়ে যায়, যা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এলে অনেকটাই কমে যেত।
বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন সংস্থায় আলাদা আলাদা হটলাইন ও অভিযোগ নম্বর থাকলেও সেগুলোর ফলো-আপ দুর্বল। বেশ কিছু বেসরকারি এনজিও হটলাইন চালায় নারী নির্যাতন বা দুর্নীতির অভিযোগের জন্য, কিন্তু সেসব অভিযোগের পরে কী হলো তার কোনও কেন্দ্রীয় ডাটাবেস বা অনুসরণ পদ্ধতি নেই। অর্থাৎ ফোনে অভিযোগ নিলেও বাস্তবে নাগরিককে ফল জানতে আবারও ধর্না দিতে হয়। অনেক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে অনলাইন অভিযোগ ফর্ম আছে, কিন্তু সেখানে অভিযোগ জমা দিলে তা কোন কর্মকর্তা দেখলেন, কবে দেখলেন বা আদৌ দেখলেন কিনা – এসব জানার উপায় সাধারণ নাগরিকের নেই। ফলে ট্র্যাকিং নম্বর ও স্বচ্ছতা নেই বলে জনগণের আস্থা গড়ে ওঠে না।
বাংলাদেশে অভিযোগ নিষ্পত্তির একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিলম্ব ও দীর্ঘসূত্রিতা। বহু সময় দেখা গেছে, অফিসে রাখা অভিযোগ বাক্সের দরখাস্ত মাসের পর মাস অব্যবহৃত অবস্থায় থাকে, কোনও কর্মকর্তা সেগুলো সময়মতো খোলেন না। আবার কোনও অভিযোগ কেউ জমা দিলেও সেটা ধীরে ধীরে ফাইলচাপা পড়ে যায়। সেন্ট্রাল GRS চালুর মূল লক্ষ্যই ছিল এই দীর্ঘসূত্রিতা কমিয়ে আনানো। কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ২০০৭ সালে ম্যানুয়ালভাবে অভিযোগ সমাধানে কিছুটা গতি এসেছিল শুধু এজন্য যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ নিষ্পত্তির রিপোর্ট চাওয়া শুরু করেছিল এবং এক্ষেত্রে GRO বা ফোকাল পয়েন্টদের জবাবদিহিতা ছিল। পরবর্তীতে ২০১৫তে সফটওয়্যার চালুর পর ধারণা করা হয়, নাগরিকেরা ঘরে বসেই অভিযোগ করতে পারবেন ও অগ্রগতি মনিটর করতে পারবেন। অনলাইনে Citizen’s Portal নামে একটি কেন্দ্রীয় ওয়েবসাইট/অ্যাপ চালু করা হয়েছে, যেটি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের অভিযোগ ব্যবস্থাকে একত্র করেছে বলে দাবি করা হয়। এই পোর্টালে অভিযোগ করলে নাগরিক একটি রসিদ বা অভিযোগ নম্বর পান এবং পরবর্তীতে তা দিয়ে স্ট্যাটাস দেখতে পারেন – এমন ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে এখানে কর্মকর্তারা অগ্রগতি আপডেট করবেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমাধান দেবেন। এমনকি অসম্পূর্ণ বা অসমাধানযোগ্য অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে উচ্চতর পর্যায়ে এস্কেলেট করার অপশনও রাখা হয়েছে বলে নীতিমালায় উল্লেখ আছে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, নীতিমালা ও আংশিক বাস্তবায়ন থাকলেও বাংলাদেশের অভিযোগ ব্যবস্থার পুরো সুফল এখনও মানুষ পাচ্ছে না। জেলা পর্যায়ের সীমাবদ্ধতা, উপজেলা-ইউনিয়নে ডিজিটাল সিস্টেমের অনুপস্থিতি, দপ্তরগুলোর আন্তঃসংযোগের অভাব এবং সবচেয়ে বড় যে বিষটি – রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছার ঘাটতি – এগুলো এর কারণ। অনেক সময় স্থানীয় বা কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেটি ধামাচাপা দিতে প্রভাব খাটানো হয়, অথবা অভিযোগ অনলাইনে জমা হলেও সেটি সচেতনভাবে দীর্ঘকাল ঝুলিয়ে রাখা হয়, যেহেতু কড়া মনিটরিং নেই। ফলে জনগণের একটা অংশ এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না যে “অভিযোগ করে কোন লাভ নেই, কেউ শোনে না” – এই মানসিকতা দূর হয়নি।

করণীয় ও বাস্তবায়ন কৌশল: দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা

বাংলাদেশ যদি দক্ষিণ কোরিয়ার মতো সফল অভিযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, তাহলে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কেবল প্রযুক্তি বা সাইট বানালেই হবে না; সমন্বিত প্রযুক্তি অবকাঠামো, প্রশাসনিক সংস্কার, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নাগরিক সচেতনতা এবং মিডিয়ার সক্রিয় ভূমিকা – সবগুলো দিকেই উন্নতি করতে হবে।
১. প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও একীভূত প্ল্যাটফর্ম: দক্ষিণ কোরিয়ার মতো একটি কেন্দ্রীয় ওয়ান-স্টপ পোর্টাল তৈরি করতে হবে, যেখানে সরকারির সব স্তরের অফিস যুক্ত থাকবে। বর্তমানে চালু Citizen’s Portal/GRS সিস্টেমকে উন্নত করে ইউনিয়ন-উপজেলা থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয় পর্যন্ত সব পর্যায়ের সংস্থাকে একই প্ল্যাটফর্মে আনতে হবে। এতে করে নাগরিক এক জায়গায় অভিযোগ করেই নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন যে সঠিক দপ্তরে এটি পৌঁছে যাবে। প্রতিটি অভিযোগ জমার সাথে সাথে স্বয়ংক্রিয় রসিদ ও ট্র্যাকিং নম্বর দেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে মানুষ প্রমাণ রাখতে পারে এবং পরে অগ্রগতি দেখতে পারে। অভিযোগের অবস্থা জানতে অনলাইন পোর্টাল ছাড়াও মোবাইল এসএমএস বা ফোন কলের মাধ্যমেও ট্র্যাক করার সুবিধা রাখা যেতে পারে, যেমন “অভিযোগ নম্বর পাঠিয়ে স্ট্যাটাস জেনে নিন” ধরনের ব্যবস্থা। তৃণমূল পর্যায়ে ইন্টারনেট সুবিধা যাদের নেই, তারা যাতে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার বা উপজেলা কার্যালয়ে গিয়ে কাউন্টার থেকে অনলাইন অভিযোগ করতে পারেন, সে ব্যবস্থাও রাখতে হবে। অর্থাৎ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মটিকে সব ধরনের নাগরিকের জন্য হাতের নাগালে আনা জরুরি।
২. প্রশাসনিক কাঠামো ও জবাবদিহিতা: প্রত্যেক মন্ত্রণালয়, বিভাগ থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যন্ত একজন করে স্থায়ী অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তা (GRO) নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এই কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট স্তরে অভিযোগ গ্রহণ, রেজিস্ট্রেশন, সমাধান সমন্বয় ও প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্বে থাকবেন। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বাংলাদেশেও কেন্দ্রীয়ভাবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এই GRO দের কার্যক্রম তদারকি করতে হবে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে (সাধারণত ১৫ কার্যদিবস বা ২ সপ্তাহ) প্রতি অভিযোগের নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগ সমাধান না হলে কেন হয়নি তার লিখিত কারণ চাওয়া এবং প্রয়োজনে তা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল/এস্কেলেশন করার নিয়ম থাকতে হবে। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ২০১৫ সালে একটি নির্দেশিকায় এসব কথা বলেছে, এখন এর বাস্তবায়ন কঠোরভাবে মনিটর করতে হবে।
প্রয়োজনে দক্ষিণ কোরিয়ার ACRC-এর আদলে একটি স্বতন্ত্র অভিযোগ কমিশন বা ওমবাডসম্যান প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেতে পারে, যা সকল মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের উপরে থেকে নাগরিক অভিযোগ খতিয়ে দেখবে এবং সুপারিশ বাস্তবায়নে চাপ প্রয়োগ করবে। এতে করে যেসব বিষয়ে মন্ত্রণালয় নিজেই গাফিলতি করছে, সেগুলো স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সমাধান করা যাবে। এছাড়া স্থানীয় সরকার পর্যায়ে বড় শহরগুলোতে স্থানীয় ওমবাডসম্যান নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে, যেটি ইতোমধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ায় ৫ লক্ষাধিক জনসংখ্যার শহরগুলোতে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই ধরনের ওমবাডসম্যান বা নাগরিক অভিযোগ কমিশনার স্থানীয় সমস্যাগুলো দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সমাধান করতে ভূমিকা রাখতে পারেন।
৩. রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আইনি ভিত্তি: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক অঙ্গীকার। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যদি এটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেখা হয়, তবে পুরো আমলাতন্ত্র নড়েচড়ে বসবে। দক্ষিণ কোরিয়ায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে ও জনঅভিযোগের ব্যাপারে “জিরো টলারেন্স” নীতির কারণে প্রশাসন সক্রিয় থাকে। বাংলাদেশেও নেতৃবৃন্দকে বার্তা দিতে হবে যে নাগরিকের অভিযোগ উপেক্ষা করা চলবে না। এজন্য পার্লামেন্টে একটি নির্দিষ্ট “প্রতিকার অধিকার আইন” পাস করা যেতে পারে, যেখানে নাগরিকের অভিযোগ জানানোর অধিকার এবং সময়মতো প্রতিকার পাওয়ার অধিকার সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। সেখানে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও অবহেলার জন্য শাস্তির ব্যবস্থাও থাকতে পারে। যেমন, যদি কোন GRO বা দপ্তর নির্ধারিত সময়ে জবাব না দেয়, তবে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনি ভিত্তি থাকলে কর্মকর্তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হবেন এবং নাগরিকও আইনের বলে নিজেদের দাবি জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন।
৪. নাগরিক সচেতনতা ও অন্তর্ভুক্তি: কেবল কাঠামো গড়ে তুললেই হবে না, মানুষকে এটি ব্যবহারে উদ্দীপিত করতে হবে। তাই ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচার অভিযান চালাতে হবে, বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক স্তরে। রেডিও, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে গ্রামীন নাটক/লোকগীতি – সব উপায়ে প্রচার করা দরকার যে সরকারের একটি পোর্টাল/নম্বর আছে যেখানে বিনা খরচে যে কেউ অভিযোগ জানাতে পারেন এবং তার প্রতিকার পাওয়ার আশা করতে পারেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইউনিয়ন পরিষদ, কমিউনিটি ক্লিনিক ইত্যাদি স্থানেও এই সেবা সম্পর্কে পোস্টার, লিফলেট, ব্যানার দেয়া যেতে পারে। পাশাপাশি, বিভিন্ন এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক বা উদ্যোক্তা তৈরি করে (উদাহরণস্বরূপ ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তারা) জনগণকে অভিযোগ লিখতে ও জমা দিতে সাহায্য করা যেতে পারে, যেমনটি BRAC কিছু ক্ষেত্রে করে যে যাদের লিখতে সমস্যা হয় তাদের পাশে থেকে ফর্ম পূরণ করে দেয়। এইভাবে কম শিক্ষিত বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীও অভিযোগপ্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন।
অন্তর্ভুক্তির আরও একটি দিক হলো পাবলিক হিয়ারিং বা উন্মুক্ত শুনানির ব্যবস্থা করা। বিশেষ করে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে মাসিক বা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে একদিন “জনঅভিযোগ দিবস” পালন করা যেতে পারে, যেখানে উন্মুক্ত মঞ্চে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক, থানার ওসি, প্রকৌশলী, চিকিৎসা কর্মকর্তা প্রমুখ থাকবেন এবং জনসাধারণ সবার সামনে তাঁদের অভিযোগ তুলে ধরবেন। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো হয়তো বাসে চড়ে বিভিন্ন গ্রামে ঘোরা আমাদের পক্ষে কঠিন, তবে প্রতি ইউনিয়ন বা উপজেলায় নির্দিষ্ট সময়ে একটিমাত্র স্থানে এই ওপেন হিয়ারিং করা যেতে পারে। এতে দ্বৈত সুফল হবে – জনগণ সরাসরি বলার সুযোগ পাবেন, এবং প্রশাসনের লোকজন জনসমক্ষে প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য থাকবেন, যা পরবর্তীতে তাঁদের কাজের চাপ হিসেবে থাকবে।
৫. গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা: একটি কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হতে পারে। প্রথমত, মিডিয়া বিভিন্ন সময় সফল অভিযোগ নিষ্পত্তির কাহিনী প্রচার করে জনমনে আস্থা বাড়াতে পারে। যেমন, কোনো অঞ্চলে নাগরিকের অনুরোধে রাস্তাঘাট মেরামত হয়েছে বা দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা শাস্তি পেয়েছেন – এগুলো পত্রিকা, টিভি, অনলাইনে তুলে ধরলে মানুষ উৎসাহিত হবে অভিযোগ জানাতে। দ্বিতীয়ত, সাংবাদিকরা তদন্তমূলক প্রতিবেদনের জন্য এই সিস্টেমের তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করতে পারেন। ধরুন একটি বিভাগে হাজারো অভিযোগ জমা পড়েছে পানির দূষণ নিয়ে কিন্তু সমাধান হয়নি – সাংবাদিকরা এ নিয়ে রিপোর্ট করলে কর্তৃপক্ষ লজ্জিত হবে এবং সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেবে। তৃতীয়ত, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ মিলে সরকারকে নীতিমূলক পরিবর্তনে চাপ সৃষ্টি করতে পারে যাতে এই ব্যবস্থার আইনি ও কাঠামোগত জোর বাড়ে। এছাড়া টকশো, সেমিনারে বিষয়টি আলোচনায় এনে জনগণ ও কর্তৃপক্ষের মধ্যে সেতুবন্ধনের ভূমিকা রাখতে পারে।
৬. বহুমুখী চ্যানেল ও ডিজিটাল উদ্ভাবন: বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহার দিনদিন বাড়লেও এখনো সবার হাতে নেই। তাই অভিযোগ গ্রহণের চ্যানেলও বহুমাত্রিক করতে হবে। কোরিয়ার অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু ওয়েব পোর্টাল নয় – ফোন কল সেন্টার, মোবাইল অ্যাপ, এসএমএস, ই-মেইল এমনকি সরাসরি মিলিত হওয়ার সুযোগ রাখতে হয়। তাই আমাদেরও ২৪x৭ চালু একটি টোল-ফ্রি নাম্বার রাখা যেতে পারে যেখানে ফোন করলে প্রশিক্ষিত এজেন্ট অভিযোগ গ্রহণ করে তা সিস্টেমে এন্ট্রি করে দেবেন। একইভাবে SMS দ্বারা অভিযোগ (নির্দিষ্ট ফরম্যাটে লিখে পাঠানো) গ্রহণের সুবিধা রাখা যেতে পারে। শহরাঞ্চলে মোবাইল অ্যাপ বানিয়ে দিলে অনেকে সহজেই ছবি-ভিডিওসহ অভিযোগ করতে পারবেন। এক কথায়, নাগরিক যেই মাধ্যমেই স্বচ্ছন্দ বোধ করেন, সেই মাধ্যম দিয়েই যেন অভিযোগ জানাতে পারেন।
৭. ফলাফল প্রকাশ ও প্রতিক্রিয়া: দক্ষিণ কোরিয়ায় big data প্ল্যাটফর্মে কোন বিষয় নিয়ে কত অভিযোগ আসছে তার ড্যাশবোর্ড সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। বাংলাদেশেও স্বচ্ছতার স্বার্থে ও জনআগ্রহ তৈরিতে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কিছু সামারি ডাটা প্রকাশ করা যেতে পারে। যেমন, প্রতি মাসে কোন বিভাগে কতগুলো অভিযোগ জমা পড়ল, তার কত শতাংশ সমাধান হলো – এ ধরণের পরিসংখ্যান অনলাইনে দিলে জনগণ ও সাংবাদিকরা বিষয়টি মনিটর করতে পারবেন। এতে করে সিস্টেমটিকে ঘিরে গণপর্যবেক্ষণ (social accountability) তৈরি হবে, যা কর্তৃপক্ষকে আরও দায়িত্বশীল হতে বাধ্য করবে।
সবচেয়ে বড় কথা, এ ধরণের সিস্টেম চালু করার পর ধৈর্য ধরে এর সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। দক্ষিণ কোরিয়ার আজকের সাফল্য একদিনে আসেনি; রাজা তেজং থেকে শুরু করে যুগে যুগে উন্নতি সাধনের ধারাবাহিকতার ফল এটি। বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে নাগরিকদের মাঝে “অভিযোগ করা মানে সমাধান পাওয়া যায়” এই বিশ্বাস সৃষ্টি করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজনে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু দৃষ্টান্তমূলক সফলতা সাজিয়ে দেখানো যেতে পারে – যেমন পাঁচজন সাধারণ মানুষের সমস্যা দ্রুত সমাধান করে সংবাদে প্রচার করা ইত্যাদি। যখন জনগণ দেখবে যে ব্যবস্থা আসলেই কাজ করছে, তখন তারা ব্যাপক হারে এতে অংশ নেবে। জনমতের চাপ তৈরি হলে প্রশাসনের মাঝেও সংস্কৃতি বদলাবে – কর্মকর্তারা নাগরিকের সমস্যাকে ফাইল হিসেবে ফেলে না রেখে মানুষ হিসেবে দেখতে শিখবেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার অভিযোগ কেন্দ্র ও পাবলিক হিয়ারিং ব্যবস্থা আজ বিশ্বে রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ঐতিহ্যের শিনমুনগো থেকে শুরু করে আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম – সবখানেই তারা মূল চেতনাকে ধারণ করেছে: জনগণের কথা শোনা এবং যথাসময়ে ন্যায়বিচার প্রদান। এই ব্যবস্থায় তাদের দুর্নীতি কমেছে, সরকারী সেবা প্রদানে গতি এসেছে, আর সবচেয়ে বড় কথা জনগণ ও সরকারের মাঝে পারস্পরিক আস্থা ও অংশীদারিত্ব গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল গণতন্ত্রে এমন একটি কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থার বিকল্প নেই। ইতোমধ্যে সূচনা হয়েছে, এখন প্রয়োজন যথাযথ বাস্তবায়ন ও সদিচ্ছার ধারাবাহিকতা। দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি বাংলাদেশ তার অভিযোগ ব্যবস্থাকে পুনর্গঠিত করতে পারে, তবে জনগণের বহুদিনের আস্থা সংকট দূর হবে, সেবার মান বাড়বে এবং গণতন্ত্রের ভিত্তি আরও মজবুত হবে – এটিই সকলের কামনা।

লেখক : ব্যবসায়ি ও নির্বাহী সম্পাদক দৈনিক প্রভাত

(এ বিভাগের লেখা একান্ত লেখকের নিজস্ব । মত প্রকাশের স্বাধীনতা। )


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও