প্রভাত রিপোর্ট: ঢাকার ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৮ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার; যেখানে ভবন নির্মাণ, নকশা অনুমোদন, সংস্কার, সংরক্ষণ, অপসারণ এবং জমির ব্যবহারের জন্য যেসব অনুমোদন বা সনদ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) থেকে নিতে হয় বা নবায়ন করতে হয়—সেগুলোর ফি বাড়ানো হচ্ছে। কর্মকর্তারা জানান, নতুন নিয়ম কার্যকর হলে রাজধানীতে ব্যক্তিপর্যায়ের বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প ও বাণিজ্যিক ভবনের নির্মাণ ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে।
খসড়া ‘কনস্ট্রাকশন রুলস ২০২৫’-এ নকশা অনুমোদন, সময় বাড়ানো ও ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রের ফি ১ হাজার টাকা থেকে ৫ হাজার টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব রয়েছে। বহুনিবাসী বা মাল্টি-ইউনিট আবাসিক ব্লক নির্মাণ আবেদনের ক্ষেত্রে প্রতি কাঠায় নতুন করে ৫ হাজার টাকা ফি আরোপের কথাও বলা হয়েছে।
১৮ নভেম্বর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় নতুন ফি’র বিষয়ে সম্মতি চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে, যেখানে রাজউকের সুপারিশ অনুযায়ী সংশোধিত ফি অনুমোদনের অনুরোধ করা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে , সেখানে বর্তমান আর্থ-সামাজিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার পরিপ্রেক্ষিতে এসব সেবা ফি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি গৃহায়ণ ও গণপুর্ত মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮ সংশোধন করা হচ্ছে, তার অংশ হিসেবে নতুন করে ফি নির্ধারণ করা হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, সামগ্রিকভাবে কর বহির্ভুত রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এই সংশোধন আনা হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিলেই গৃহায়ণ মন্ত্রণালয় গেজেট প্রকাশ করে নতুন নিয়ম কার্যকর করবে।
রাজউকের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাড়তি ফি অনুমোদন-সংক্রান্ত ব্যয় অনেকটা বাড়িয়ে দেবে—বিশেষত ব্যক্তির একক উদ্যোগের আবাসন প্রকল্পগুলোতে। প্রস্তাবিত ফি অনুমোদিত হলে ৫ কাঠার একটি প্লটে দুই ইউনিটের ১০ তলা আবাসিক ভবন নির্মাণ ও অন্যান্য অনুমোদন খরচ বর্তমানের তুলনায় এক লাখ থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়বে বলে জানান তিনি।
বিদ্যমান ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৮ এর আওতায় মূলত রাজধানীতে রাজউকের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ইমারত নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণের অনুমোদন–সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। ভবন নির্মাণের জন্য নকশা অনুমোদন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয় এই বিধিমালার অন্তর্ভুক্ত। প্রতিটি অনুমোদন, নবায়ন এবং কোনো ক্ষেত্রে আপিলের প্রয়োজন হলে রাজউকে নির্দিষ্ট ফি জমা দিতে হয়।
আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন–রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সহ-সভাপতি প্রকৌশলী আব্দুল লতিফ গণমাধ্যমকে বলেন, এতে রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারদের চেয়ে ব্যক্তিপর্যায়ের ভবন নির্মাণের ব্যয়টাই বেশি বেড়ে যাবে। বাণিজ্যিক ভবনের ক্ষেত্রে এই বাড়তি ফি ফ্ল্যাটের দাম বিশেষ প্রভাবিত করবে না। তিনি বলেন, “পাঁচ কাঠার জমিতে ভবন নির্মাণের অনুমোদন নিতে বর্তমানে ৫ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে, নতুন নিয়মে এটি বেড়ে ২৫ হাজার টাকা হবে। ওই জমিতে ২০টি ফ্ল্যাট হলে প্রতি ফ্ল্যাটে মাত্র ১,২৫০ টাকা খরচ দাঁড়াবে। এভাবে অন্যান্য খরচ মিলে একটি ভবনে মোট খরচ এক থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়লেও, সেটি একটি ফ্ল্যাটের মোট দামে বিশেষ প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু একজন ব্যক্তি যখন পাঁচতলা একটি ভবন তৈরি করবেন, তার নির্মাণ খরচের বাইরে এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা খরচ বেড়ে গেলে—সেটা অনেক চাপ সৃষ্টি করবে।”
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি আদিল মোহাম্মদ খান এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, যেকোনো ফি বাড়তে পারে। তবে দেখতে হবে সেটি যৌক্তিকভাবে বাড়ছে কিনা। সেবাগ্রহীতার সাধ্যের মধ্যে থাকছে কিনা। জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এমনভাবে ফি নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। তিনি আরও বলেন, “রাজউকের ফি বাড়ানোর আগে সঠিক সময়ে সঠিক সেবা নিশ্চিত করা উচিত। এর আগেও রাজউক ফি বাড়িয়েছে। কিন্তু কোনো কোনো কর্মকর্তার ঘুষ নেওয়া বন্ধ হয়নি। বাড়তি খরচ ছাড়া রাজউকের সেবা পাওয়া গেলে—বাড়তি ফি দিতে মানুষের অসুবিধা হবে না।”
২০২৫ সালের প্রস্তাবিত বিধিমালার আওতায়, ভবনের পরিকল্পনা অনুমোদন, আপিল ও মেয়াদ বাড়ানোর ফি ১ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা করা হচ্ছে। ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র, আপিল ও নবায়ন ফিও একইভাবে ১ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকায় উন্নীত করা হবে।
বহুনিবাসী ব্লকের আবেদনের জন্য প্রতি কাঠায় নতুন করে ৫ হাজার টাকার ফি প্রস্তাব করা হয়েছে। মিশ্র-উদ্দেশ্যের ভবনের ক্ষেত্রে যে ব্যবহারের ফি বেশি—নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে সেই ফি নির্ধারিত হবে।
এদিকে প্রস্তাবিত ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় ভবনের শ্রেণি স্পষ্ট করা হয়েছে। আবাসিক ভবনকে আয়তন ও ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী ৬টি ক্যাটাগরিতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। এছাড়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিল্প কারখানা, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, গুদাম, পার্কিং ভবনের জন্য আলাদা আলাদা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০০৮ সালের বিধিমালায়, কেবল জমির পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে ফি নির্ধারিত রয়েছে। প্রস্তাবিত বিধিমালায়, জমির পরিমাণের পাশাপাশি ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। এই ফি’র পরিমাণ প্রতি বর্গমিটার মেঝের জন্য সর্বনিম্ন ৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা (ভবনের শ্রেণি ও উদ্দেশ্যভেদে)।
এছাড়া ইমারত নির্মাণ অনুমোদন ফি ভবনের সকল তলা মিলিয়ে মোট মেঝের আয়তনের ওপর নির্ধারণ করা হচ্ছে। সর্বনিম্ন ৫০ বর্গফুট পর্যন্ত মেঝের আয়তন হলে তার অনুমোদন ফি হবে ১৭৫ টাকা। এই আয়তনকে ১৬টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। সর্বোচ্চ আয়তন ধরা হয়েছে ৩,০০০ বর্গমিটারের উর্ধ্বে। কোনো ভবনের মোট মেঝের আয়তন ৩,০০০ বর্গমিটার বা তার বেশি হলে—তার নির্মাণ অনুমোদনের ফি ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। তবে পাহাড় কাটার অনুমোদন ফি আগের মতো ৩০ হাজার টাকা অপরিবর্তিত রয়েছে। একইভাবে পুকুর খনন ফি ১০ হাজার টাকা এবং ব্যবহার উপযোগিতা সনদপত্র ও সনদপত্র নবায়ন ফি এক হাজার টাকায় অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। অন্যদিকে বিশেষ প্রকল্প ছাড়পত্র ও আপিলের জন্য আবেদন ফি বাতিল করা হয়েছে প্রস্তাবিত বিধিমালায়। বর্তমানে প্রতিবারের আবেদনের ১০ হাজার টাকা ফি দিতে হয়।
প্রাচীর নির্মাণ অনুমোদনের ফি ধরা হয়েছে প্রতি বর্গমিটারে ২০ টাকা বা সর্বনিম্ন ২,০০০ টাকা। বিলবোর্ড স্থাপনের অনুমোদন ফি প্রতি বর্গমিটারে ৫০ টাকা বা সর্বনিম্ন ৫,০০০ টাকা, এবং জলাধার নির্মাণ অনুমোদন ফি প্রতি ঘনমিটারে ১০০ টাকা বা সর্বনিম্ন ১০,০০০ টাকা ধরা হয়েছে।
মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা, গির্জা ইত্যাদি ধর্মীয় উপাসনালয়ের জন্য ইমারত নির্মাণ অনুমোদন ফি লাগবে না। তবে এসব উপাসনালয়ের কোন অংশ ধর্মীয় উপাসনা এবং আনুষঙ্গিক ব্যবহার ব্যতীত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না।