• বুধবার, ০৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:১৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
শুধুমাত্র মিছিল মিটিং করার জন্য জাতীয়তাবাদীর নাম ব্যবহার নয় : রিজভী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নৈরাজ্য বন্ধে সরকারের উদ্যোগ নেই: দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আ.লীগ ভারতের সেবাদাস সরকার ছিল : সালাহউদ্দিন আহমেদ পাতানো নির্বাচনের চেষ্টা চলছে, রুখে দেয়া হবে: আসিফ মাহমুদ এনইআইআরের মাধ্যমে অবৈধ ও নকল মুঠোফোন নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে ‘সিন্ডিকেটের কারসাজিতে এলপিজির দাম বৃদ্ধি’ পূর্বাচলে বাণিজ্য মেলায় ক্রেতাদের আগ্রহে মাটির তৈরি তৈজসপত্র নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাচ্ছে না জাতিসংঘ: স্টিফেন দুজারিক মোবাইল ব্যবহারকারীদের যে বার্তা দিলো বিটিআরসি ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতায় নিহত বেড়ে ৩৫
ক্লোনিংয়ের ভয়াবহ চিত্র

২০ লাখ মোবাইলে একই আইএমইআই, সংযোগ ৪ কোটি

প্রভাত রিপোর্ট / ১৩ বার
আপডেট : রবিবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২৬

প্রভাত অর্থনীতি: বাংলাদেশে মোবাইল ফোন ক্লোনিং যে কতটা গভীর ও বিস্তৃত, তার একটি ভয়াবহ চিত্র সামনে এনেছে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর)। গত ১ জানুয়ারি থেকে এনইআইআর কার্যকর হওয়ার পর সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে—দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে কোটি কোটি ডিভাইস দীর্ঘদিন ধরে ডুপ্লিকেট বা ভুয়া ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি (আইএমইআই) ব্যবহার করে সক্রিয় ছিল।
এনইআইআরের তথ্য অনুযায়ী, একটি মাত্র আইএমইআই নম্বর—৪৪০০১৫২০২০০০—ব্যবহার করে সক্রিয় ছিল ১৯ লাখ ৪৯ হাজার ৮৮টি ফোন। একইভাবে ৩৫২২৭৩০১৭৩৮৬৩৪ নম্বরটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার, ৩৫২৭৫১০১৯৫২৩২৬ নম্বরটি ১৫ লাখ ২০ হাজার ফোনে ব্যবহৃত হয়েছে। এমনকি ‘০’ আইএমইআই নম্বর ব্যবহার করেই চালু ছিল ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৩৩১টি হ্যান্ডসেট।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্যটি উঠে এসেছে গত এক দশকের রেকর্ড বিশ্লেষণে। এতে দেখা গেছে, কেবল ‘৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯’ আইএমইআই নম্বরের বিপরীতে বিভিন্ন পরিচয়পত্র ও মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে ৩ কোটি ৯১ লাখ ২২ হাজার ৫৩৪টি সংযোগ সচল করা হয়েছে। মোবাইল ক্লোনিং সংকটের মাত্রা বোঝাতে এই একটি উদাহরণই যেন যথেষ্ট।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) জানিয়েছে, ‘০০০০০০০০০০০০০’, ‘১১১১১১১১১১১১১’ ও ‘৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯’–এর মতো প্লেসহোল্ডার আইএমইআই ব্যবহার করে লাখ লাখ হ্যান্ডসেট সচল থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
এ পর্যন্ত অন্তত ২৪টি ভুয়া বা ডুপ্লিকেট আইএমইআই শনাক্ত হয়েছে, যেগুলোর প্রতিটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এক লাখের বেশি হ্যান্ডসেট। এর মধ্যে কয়েকটি আইএমইআইয়ের সঙ্গে যুক্ত ডিভাইসের সংখ্যা পাঁচ লাখ ছাড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি বিচ্ছিন্ন কোনও অপরাধ নয়; বরং বড় ধরনের ক্লোনিং নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত দেয়। তবে এত বড় অনিয়ম ধরা পড়লেও এসব ফোন তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা হচ্ছে না। জনভোগান্তি এড়াতে এনইআইআরের মাধ্যমে এসব হ্যান্ডসেটকে আপাতত ‘গ্রে’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেছেন, কোটি কোটি মানুষ না জেনেই নিম্নমানের নকল ফোন ব্যবহার করছেন, যেগুলো কখনোই রেডিয়েশন বা এসএআর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়নি। তবে হঠাৎ করে এসব ফোন বন্ধ করা হলে সাধারণ মানুষ বিপাকে পড়বে। তাই আপাতত এগুলো বন্ধ না করে গ্রে হিসেবে ট্যাগ করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, অতীতে অপারেটররা আইওটি ডিভাইস—যেমন সিসিটিভি ও সিমভিত্তিক মোবাইল ফোনের মধ্যে পার্থক্য করতে না পারায় কিছু আইএমইআই ডুপ্লিকেশন ঘটেছে। বর্তমানে বৈধভাবে আমদানি করা আইওটি ডিভাইস আলাদাভাবে ট্যাগ করা হচ্ছে।
এনইআইআরের তথ্য গ্রে মার্কেটের ব্যাপক দাপটও স্পষ্ট করেছে। দেশে বর্তমানে সক্রিয় প্রায় ১৯ লাখ ৮০ হাজার আইফোনের মধ্যে আনুমানিক ১৯ লাখ ৫০ হাজারই বৈধভাবে আমদানি হয়নি। একইভাবে সক্রিয় ২ কোটি ৩১ লাখ স্যামসাং ফোনের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৪৯ লাখই কর না দিয়ে বাজারে এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, মাত্র ১০টি আইএমইআই দিয়েই প্রায় ৫০ লাখ ফোন সক্রিয় থাকার তথ্য গ্রে মার্কেটের গভীর নেটওয়ার্কের প্রমাণ।
অবৈধ ও ক্লোন ফোনের সঙ্গে ডিজিটাল অপরাধের সরাসরি সম্পর্কও উঠে এসেছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে সংঘটিত ডিজিটাল জালিয়াতির ৭৩ শতাংশই হয় অনিবন্ধিত ডিভাইস ব্যবহার করে। অন্যদিকে, বিটিআরসি ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের যৌথ তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩ সালে সংঘটিত ই-কেওয়াইসি জালিয়াতির ৮৫ শতাংশে ব্যবহৃত হয়েছে অবৈধ বা রিপ্রোগ্রাম করা ফোন। একই বছরে দেশে ১ লাখ ৮০ হাজার মোবাইল ফোন চুরির ঘটনাও নথিভুক্ত হয়, যার বেশিরভাগই আর উদ্ধার হয়নি।
এনইআইআরের এই তথ্য প্রকাশের পর গত ১ জানুয়ারি বিটিআরসি কার্যালয়ে সহিংস বিক্ষোভের ঘটনাও নতুন প্রেক্ষাপটে দেখা হচ্ছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি ছিল, ৩৫ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ করহার ব্যবসায়ীদের গ্রে মার্কেটে ঠেলে দিচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কর কাঠামো যাই হোক, ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণা করে নকল ফোনকে ‘অফিশিয়াল নতুন’ হিসেবে বিক্রি করার এই চক্র ভেঙে দিতেই হবে।


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও