• বুধবার, ০৭ জানুয়ারী ২০২৬, ০৬:০৩ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
শুধুমাত্র মিছিল মিটিং করার জন্য জাতীয়তাবাদীর নাম ব্যবহার নয় : রিজভী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নৈরাজ্য বন্ধে সরকারের উদ্যোগ নেই: দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আ.লীগ ভারতের সেবাদাস সরকার ছিল : সালাহউদ্দিন আহমেদ পাতানো নির্বাচনের চেষ্টা চলছে, রুখে দেয়া হবে: আসিফ মাহমুদ এনইআইআরের মাধ্যমে অবৈধ ও নকল মুঠোফোন নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে ‘সিন্ডিকেটের কারসাজিতে এলপিজির দাম বৃদ্ধি’ পূর্বাচলে বাণিজ্য মেলায় ক্রেতাদের আগ্রহে মাটির তৈরি তৈজসপত্র নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাচ্ছে না জাতিসংঘ: স্টিফেন দুজারিক মোবাইল ব্যবহারকারীদের যে বার্তা দিলো বিটিআরসি ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতায় নিহত বেড়ে ৩৫

এলপিজি সংকট কাটাতে ভ্যাট , সুদহার ও এলসি প্রক্রিয়া সহজ করার সিদ্ধান্ত

প্রভাত রিপোর্ট / ৯ বার
আপডেট : সোমবার, ৫ জানুয়ারি, ২০২৬

প্রভাত অর্থনীতি: চলমান এলপিজি সরবরাহ সংকট কাটাতে আমদানিতে ভ্যাট অব্যাহতি, স্বল্প সুদে ঋণ ও ব্যাংকে ঋণপত্র (এলসি) খোলার প্রক্রিয়া সহজ করাসহ বেশ কিছু সাময়িক পদক্ষেপ গ্রহণে একমত হয়েছে সরকার ও এলপিজি খাতের স্টেকহোল্ডাররা। ৪ জানুয়ারি এক সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পর্যালোচনার পর এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে সভার পর জানান কর্মকর্তারা।
সভায় স্থানীয় বটলিং (সিলিন্ডারে গ্যাস ভরা) পর্যায়ে সাময়িক সময়ের জন্য ভ্যাট কমাতে এনবিআরকে এবং এলপিজিকে গ্রিন এনার্জি ঘোষণা দিয়ে ব্যাংকের সুদহার গ্রিন ফাইন্যান্সিংয়ের মতো এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অনুরোধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জ্বালানি সচিব এই প্রস্তাবগুলো নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠাবেন বলে বৈঠক সম্পর্কে অবগত সূত্র নিশ্চিত করেছে।
খুচরা পর্যায়ে দামের কারসাজি ও কৃত্রিম সংকট রোধে জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বাজার তদারকি জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
সভা শেষে যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনায় নিশ্চিত হওয়া গেছে যে কোম্পানিগুলো বাড়তি দামে এলপিজি বিক্রি করেনি। দামের কারসাজি হয়েছে মূলত খুচরা পর্যায়ে।
খুচরা বাজারে সরবরাহ ঘাটতি ও দামের তীব্র ঊর্ধ্বগতি নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সঙ্গে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
কর্মকর্তারা খুচরা পর্যায়ে অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্য খুচরা বিক্রেতারা ইচ্ছেমতো দামে বিক্রি করতে পারেন না। পেট্রোল পাম্পে যেমন নির্ধারিত দামের বাইরে জ্বালানি বিক্রি করা যায় না, তেমনি এলপিজির ক্ষেত্রেও তা হওয়া উচিত।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ: তারা বলেন, এলপিজির খুচরা বাজারে এখনো কার্যকর নজরদারি নেই। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান ভূমিকা না থাকায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।
লোয়াব সভাপতি ও ডেল্টা এলপিজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, ‘বিশ্ববাজারে বর্তমানে এলপিজি একটি অস্থির পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ নতুন উৎস থেকেও এলপিজি আমদানির চেষ্টা করছে। এমনকি আগে কখনো না আসা দেশ, যেমন আর্জেন্টিনা থেকেও এলপিজি আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ তিনি জানান, অপারেটররা সরকারকে আমদানিতে কোটাভিত্তিক বা অনুমতিনির্ভর সীমাবদ্ধতা তুলে নিয়ে মুক্তবাজার নীতির আওতায় এলপিজি আমদানির সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার ইতিমধ্যে এলপিজি আমদানি পুরোপুরি উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত দিয়েছে; ফলে এখন আর আলাদা অনুমতির প্রয়োজন নেই।
আমিরুল আরও বলেন, এলপিজির ওপর আরোপিত ভ্যাট সাময়িকভাবে প্রত্যাহারের দাবিও জানানো হয়। বলা হয়, এলপিজির দামে কোনো সরকারি ভর্তুকি নেই, যেখানে এলএনজিতে সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ভ্যাট অব্যাহত থাকলে ভোক্তা ও বাজারের ওপর চাপ আরও বাড়বে। তিনি বলেন, বাজারের এই কঠিন পরিস্থিতিতেও লোয়াবের কোনো সদস্য বা কোনো এলপিজি বটলিং প্ল্যান্ট বিইআরসি-নির্ধারিত দামের বাইরে এক টাকাও বাড়িয়ে সিলিন্ডার বিক্রি করেনি।
শিল্প প্রতিনিধিরা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে কিছু বড় কোম্পানি সরাসরি আমদানিতে যেতে না পেরে স্থানীয় বাজার থেকে এলপিজি সংগ্রহ করে বিক্রি করছে।
লোয়াবের সহসভাপতি ও এনার্জিপ্যাকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন রশীদ বলেন, বিশ্বব্যাপী এলপিজি শিল্প সহজ শর্তে ঋণ পায়, অথচ বাংলাদেশি অপারেটরদের প্রায় ১৫ শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, এলপিজি একটি পরিবেশবান্ধব জ্বালানি হিসেবে স্বীকৃত। তাই গ্রিন ফাইন্যান্সিংয়ের আওতায় এর সুদহার হওয়ার কথা এক অঙ্কের। বাংলাদেশে এটি বাস্তবায়ন হলে ভোক্তা পর্যায়ে এলপিজির দাম কমবে।
রশিদ গ্যাসের দামে বৈষম্যের বিষয়টিও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের কিছু অংশের মানুষ সস্তায় পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহার করছে, বাকিরা বেশি দামে এলপিজি কিনছে। এই বৈষম্য দূর করতে তিনি নীতি সহায়তার আহ্বান জানান।
মেঘনা, ওমেরা, জেএমইআইসহ সভায় অংশ নেওয়া অন্যান্য কোম্পানিগুলোও এলসি সহজীকরণ এবং অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব করে।
বর্তমান এলপিজি সংকট: বাজারসংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, বেশ কিছু কোম্পানি আমদানি কমিয়ে দেওয়ায় এবং শীতকালে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।
ঢাকা ও অন্যান্য অঞ্চলের ভোক্তারা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে এলপিজি সিলিন্ডার পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ২৫৩ টাকার সিলিন্ডারের জন্য অনেক খুচরা বিক্রেতা ২ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম রাখছেন।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলেন, ডিসেম্বরে এলপিজি আমদানি অনেক কমে গেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে প্রতি টনে দাম অন্তত ৩৫ ডলার বেড়ে যাওয়ায় কোম্পানিগুলো আমদানির পরিমাণ কমিয়ে দেয়। তবে শিল্প খাতের নেতারা পরে বৈঠকে জানান, নভেম্বরে আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫ হাজার টন, যা ডিসেম্বরে বেড়ে ১ লাখ ২৭ হাজার টনে দাঁড়ায়। অর্থাৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার পেছনে যৌক্তিক কোনো কারণ নেই।
তাদের অভিযোগ, বিইআরসি দাম সমন্বয় করতে পারে—এমন ধারণা থেকে কিছু খুচরা বিক্রেতা কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন। উল্লেখ্য, রোববার সন্ধ্যায় বিইআরসি ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম বাড়িয়ে ১ হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করে।
অনিয়ম রোধে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন যাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে পারে, সেজন্য জ্বালানি মন্ত্রণালয় মন্ত্রিপরিষদ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়েছে।
দিনের শেষভাগে দেওয়া এক বিবৃতিতে লোয়াব বলেছে, খুচরা বাজারে সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি ভোক্তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও ভোগান্তি তৈরি করেছে। যদিও সরকারের দাবি, দেশে কোনো সরবরাহ সংকট বা আমদানিতে বিধিনিষেধ নেই। বিবৃতিতে বলা হয়, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। সেখানে শিল্প প্রতিনিধিরা সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার মূল কারণ হিসেবে বিশ্বব্যাপী জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি ও ইউরোপসহ অন্যান্য বাজারে এলপিজির দাম বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন।
লোয়াব বলেছে, এত সব চাপের মধ্যেও দেশে এলপিজির সার্বিক মজুদ ‘সন্তোষজনক’ পর্যায়ে রয়েছে। পাশাপাশি মন্ত্রণালয় আশ্বস্ত করেছে যে এলপিজি আমদানির ওপর কোনো সর্বোচ্চ সীমা আরোপ করা হবে না। তবে সংগঠনটি উল্লেখ করেছে, কিছু খুচরা বিক্রেতা সরকারি দরের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি করছে। এতে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে এবং ভোক্তাদের ওপর বাড়তি আর্থিক বোঝা চাপছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এ ধরনের কর্মকাণ্ড ভোক্তাদের জন্য অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি এবং বাজারে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।’
প্রচলিত আইন লঙ্ঘন করে যেসব খুচরা বিক্রেতা অতিরিক্ত দাম আদায় করছেন, তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে লোয়াব। ভোক্তাদের সুরক্ষা ও বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কঠোর নজরদারি ও আইন প্রয়োগের দাবিও জানিয়েছে তারা। সংগঠনটি আরও অনুরোধ করেছে, সরকার-নির্ধারিত ন্যায্যমূল্যে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করতে যেন বাজার তদারকি জোরদার করা হয়।


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও