প্রভাত রিপোর্ট: তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে সার শিল্প নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। এলএনজির দাম প্রতি ঘনমিটারে ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৯ টাকা ২৫ পয়সা নির্ধারণ করার সময় সরকার নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তা মিলছে না। এতে আসন্ন বোরো মৌসুমে সারের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
দেশের ইউরিয়া কারখানাগুলোর তত্ত্বাবধানে থাকা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) জানিয়েছে, পূর্ণ সক্ষমতায় কারখানা চালানোর মতো পর্যাপ্ত গ্যাস তারা পাচ্ছে না। এ অবস্থায়, সম্প্রতি এক চিঠিতে আসন্ন বোরো মওসুমের আগে ৫টি সার কারখানার মধ্যে অন্তত ৪টি কারখানা চালু রাখতে কমপক্ষে ১৯৭ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করতে অর্থ মন্ত্রণালয়, জ্বালানি মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলাসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করেছে সংস্থাটি।
এই সরবরাহ নিশ্চিত না হলে ইউরিয়া উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কম হবে বলে সতর্ক করেছে বিসিআইসি। সেক্ষেত্রে সরকারকে আমদানি বাড়াতে হবে, ফলে কৃষি খাতে ভর্তুকির চাপ আরও বাড়বে।
ডিসেম্বর থেকে মার্চ বোরোর পিক বা সর্বোচ্চ মৌসুমে দেশে ইউরিয়ার চাহিদা প্রায় ১৫ লাখ টন। কিন্তু বর্তমান গ্যাস বরাদ্দ অনুযায়ী বছরে উৎপাদন সম্ভব হবে মাত্র ৯.২৪-১১ লাখ টন, যা লক্ষ্যমাত্রার অনেক কম।
এদিকে বিসিআইসির চাহিদা অনুযায়ী, গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে না বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। এতে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সার উৎপাদন কম হলে আমদানি করে চাহিদা মেটানো হবে বলেও জানান তিনি।
উপদেষ্টা আরও বলেন, সার কারখানার মতো শিল্পখাত ও বিদ্যুৎখাতেরও গ্যাসের বাড়তি চাহিদা আছে। কিন্তু, আমাদের বছরে ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানি করার সক্ষমতা রয়েছে, যেখানে ইতোমধ্যে ১০৯ কার্গো আমদানি করা হয়েছে। ফলে চাহিদা থাকলেও আমদানি বাড়ানোর কোন সুযোগ নেই। তাছাড়া, জাতীয় পাইপলাইনে সর্বোচ্চ ১,০০০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করার সক্ষমতা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘’দেশে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে ৪,০০০ এমএমসিএফডি। কিন্তু, আমদানি সরবরাহ করতে পারছি ২,৮০০-২,৯০০ এমএমসিএফডি। ফলে আমাদের শিল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানা- সব জায়গায়ই কিছু কিছু গ্যাস কম সরবরাহ করতে হচ্ছে। তবে গ্যাস সংকটের কারণে সার উৎপাদন ব্যাহত হলেও দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে না, ইউরিয়া আমদানি করে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে বলে জানান তিনি।
অর্থ, জ্বালানি, শিল্প ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবদের কাছে পাঠানো বিসিআইসির চিঠিতে বলা হয়েছে, চলতি বছরে ইউরিয়ার জাতীয় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১৮ লাখ টন হলেও বর্তমান গ্যাস বরাদ্দে ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজারসহ মাত্র দু’টি কারখানা চালু রাখা সম্ভব হবে, যাতে বছরজুড়ে প্রায় ১১ লাখ টন ইউরিয়া উৎপাদন করা যাবে।
বিসিআইসির চিঠিতে বলা হয়েছে, বছরের অর্ধেকের বেশি সময় কারখানা বন্ধ থাকায় মূল্যবান যন্ত্রপাতির অবক্ষয় ঘটেছে। পাঁচটি কারখানার সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা একসময় ছিল ৩১ লাখ টন, গ্যাস সংকটে বেশি সময় কারখানাগুলো বন্ধ থাকায় তা কমে দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ টনে। প্রকৃত উৎপাদন নেমে এসেছে বছরে ৮-১১ লাখ টনে।
বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. ফজলুর রহমানের চিঠিতে গ্যাস সংকটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী সার উৎপাদন না হওয়ার সংকট নিরসনে বিদেশ হতে এলএনজি আমদানি করে দেশীয় সার কারখানাগুলো কিভাবে চালু রাখা হয়, তা যাচাই বাছাই করতে অর্থ বিভাগ, জ্বালানি বিভাগ, কৃষি মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিসিআইসির কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে সরকার একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে।
কমিটির সুপারিশে বলা হয়, পাঁচটি সার কারখানার মথ্যে ৪টি কারখানা সার্বক্ষণিক চালুর রাখার মাধ্যমে ১৮ লাখ টন ইউরিয়া উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে। এর জন্য দৈনিক গড়ে ১৮০.৮১ এমএমসিএফডি গ্যাস দরকার হবে। এতে বলা হয়, এলএনজি আমদানি বাড়ানোর মাধ্যমে সার কারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে ইউরিয়া উৎপাদন বাড়ানো হলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
অতিরিক্ত এলএনজি আমদানির ব্যয় সমন্বয় করতে গত ২৩ নভেম্বর সার কারখানায় ব্যবহৃত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের মূল্য বাড়িয়ে ২৯.২৫ টাকা নির্ধারণ করে বিইআরসি।
গত ২৩ ডিসেম্বর বিসিআইসি’র চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, সরকারের দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১৮ লাখ টন ইউরিয়া উৎপাদন করতে হলে চারটি কারখানা চালু রাখা রাখতে হবে। এজন্য কমপক্ষে ১৯৭ এমএমসিএফডি গ্যাসের প্রয়োজন হবে। কিন্তু বিইআরসি অনুমোদন দিয়েছে মাত্র ১৪০ এমএমসিএফডি। এই পরিমাণ গ্যাস দিয়ে ঘোড়াশাল পশাল ফার্টিলাইজার কোম্পানিসহ মোট দু’টি সার কারখানা চালু রাখা যাবে, যাতে বছরে উৎপাদন সম্ভব হবে ১১ লাখ টন। আর ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজার কোম্পানি বন্ধ রাখলে এই সরবরাহ দিয়ে অন্য তিনটি কারখানা চালু রাখা যাবে, যাদের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৯.২৪ লাখ টন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া বোরো মওসুমে মোট ইউরিয়ার চাহিদা ১৪.৫-১৫ লাখ টন। এর মধ্যে ডিসেম্বরে ৩.১৮, জানুয়ারিতে ৪.২৩, ফেব্রুয়ারিতে ৪.৪৩ এবং মার্চে ২.৪৭ লাখ টন সার প্রয়োজন হয়।
বিসিআইসির চেয়ারম্যান মো. ফজলুর রহমান চিঠিতে লিখেছেন, ইউরিয়া সারের প্রধান কাঁচামাল গ্যাস সংকটের কারণে গত ২০০৭-০৮ সাল হতে ইউরিয়া উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিবছর নিয়মিতভাবে এপ্রিল হতে নভেম্বর পর্যন্ত গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ থাকায় সার কারখানাগুলোও বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে কারখানাগুলোতে প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা অনুযায়ী সার উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। বছরের অর্ধেক বা তারও বেশি সময় কারখানাগুলো বন্ধ থাকায় টনপ্রতি উৎপাদন ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি করোশনজনিত কারণে কারখানার মূল্যবান মেশিনারিগুলো নষ্ট হয়ে উৎপাদনক্ষমতা কমে যাচ্ছে। তিনি বলেন, পাঁচটি কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ছিল বছরে ৩১ লাখ টন এবং দেশে ইউরিয়ার চাহিদা বছরে ২৬ লাখ টন। গ্যাস সংকটের কারণে বন্ধ থাকায় কারখানাগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা এখন কমে নেমেছে ২০ লাখ টনে। আর বছরের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকায় কারখানাগুলো বছরে উৎপাদিত হচ্ছে ৮ লাখ টন থেকে ১১ লাখ টন। অবশিষ্ট সার আমদানি করে চাহিদা পূরণ করছে সরকার।
বিসিআইসি’র তথ্য অনুযায়ী, নতুন প্রতিষ্ঠিত ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজার কোম্পানিটি জ্বালানি সাশ্রয়ী এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকায় এটি বন্ধ রাখার কোন সুযোগ নেই। ৯.২৪ লাখ টন উৎপাদন সক্ষমতার এ কারখানাটি সচল রাখতে দৈনিক ন্যূনতম ৭২ এমএমসিএফডি গ্যাসের দরকার হবে। অবশিষ্ট গ্যাস শাহজালাল, যমুনা ও চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কারখানায় বরাদ্দ দিলে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব বলে জানিয়েছে বিসিআইসি।
পেট্রোবাংলার দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটি ৩ জানুয়ারি সারাদেশে ২,৬৩২ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করেছে। এরমধ্যে আমদানি করা এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হয়েছে ৯৩০ এমএমসিএফডি। শেভরন ও তাল্লু সরবরাহ করেছে ১,০০৫ এমএমসিএফডি। বাকি ৬৯৬.৬ এমএমসিএফডি গ্যাস বাপেক্স, সিলেট গ্যাস ফিল্ড ও বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি লিমিটেড তাদের বিভিন্ন গ্যাসকূপ থেকে সরবরাহ করেছে। এরমধ্যে বিদ্যুৎ খাতে ৭৫৬ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। অন্যান্য খাতে ১,৪৩৯ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। ফলে সার কারখানাগুলো প্রয়োজনীয় গ্যাস পায়নি।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) নিয়ন্ত্রণে যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড, ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজার কোম্পানি, আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার এন্ড কেমিক্যাল কোম্পানী লি. (এএফসিসিএল), চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড ও শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (এসএফসিএল) পরিচালিত হয়। এই সার কারখানাগুলোর দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ২৬৬ এমএমসিএফডি। এই চাহিদার বিপরীতে কারখানাগুলোকে ৩ জানুয়ারি ১৮০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। ওইদিন কারখানাগুলোর চাহিদার তুলনায় ৮৬ এমএমসিএফডি গ্যাসের ঘাটতি ছিল।
আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার এন্ড কেমিক্যাল কোম্পানিকে অনেকদিন ধরে টানা গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে না। যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড ও চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডকেও মাঝে মাঝে গ্যাস সরবরাহ করা হয় না।
বিসিআইসি ‘ট্রেড গ্যাপ’ সহায়তা বাড়ানোরও আহ্বান জানিয়েছে। দেশে উৎপাদিত ইউরিয়া সারের মূল্য সরকার নির্ধারণ করে থাকে, যা উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে অনেক কম। ফলে কারখানাগুলো লোকসানে পরিচালিত হচ্ছে। উৎপাদন মূল্যের চেয়ে কম মূল্যে সার কিনলেও লোকসানের অর্থ সরকার ‘ট্রেড গ্যাপ’ বাণিজ্য হিসেবে পরিশোধ করেনি। কিন্তু আমদানি করা সারের ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের পার্থক্য ‘ট্রেড গ্যাপ’ হিসেবে পরিশোধ করছে সরকার।
গ্যাস সংকটের কারণে স্থানীয় কারখানাগুলো বছরের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকায় ও লোকসানে সার বিক্রির কারণে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। এতে প্রয়োজনমতো কারখানাগুলো ওভারহোলিং, গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রতিস্থাপন সম্ভব হচ্ছে না।
এ অবস্থার মধ্যেই ২০২২ সালে সার কারখানায় ব্যবহৃত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৪.৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬ টাকা নির্ধারণ করার কারণে গ্যাস বিল বাবদ ২,০০০ কোটি টাকা বকেয়া হয়েছে। এই লোকসান কমাতে কৃষি মন্ত্রণালয় প্রতি টন ইউরিয়া ৩৮ হাজার টাকায় কিনতে সম্মত হয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয় টনপ্রতি ১৩ হাজার টাকা ট্রেড গ্যাপ হিসেবে পরিশোধে সম্মত হয়। এই প্রেক্ষাপটে, সার কারখানায় সরবরাহ করা গ্যাসের দাম ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৯.২৫ টাকা নির্ধারণ করার প্রেক্ষিতে ট্রেড গ্যাপের পরিমাণও বাড়াতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছে বিসিআইসি।