প্রভাত রিপোর্ট: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে আসন সমঝোতা চূড়ান্ত করতে গত কয়েক মাসে দফায় দফায় আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করে আটটি দল। দলগুলো হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)। এরপর সেই সমঝোতায় যুক্ত হয় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। সব মিলিয়ে দলের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম শনিবার (১০ জানুয়ারি) হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্ন বলেন, জোটে তারা কতটি আসন পাচ্ছেন, তা দু–এক দিনের মধ্যেই জানানো হবে।
এদিকে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান ওমরাহ পালন শেষে শনিবার (১০ জানুয়ারি) সকালে দেশে ফিরেছেন। সমঝোতার আলোচনা চূড়ান্ত হলে তাঁর নেতৃত্বে জামায়াত অন্য দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবে।
অপরদিকে আলোচনা চলমান অবস্থায়ই জামায়াত ২৭৬টি আসনে এবং ইসলামী আন্দোলন ২৬৮টি আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দেয়। এর পাশাপাশি এনসিপি ৪৭টি, এবি পার্টি ৫৩টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৯৪টি, খেলাফত মজলিস ৬৮টি, এলডিপি ২৪টি, খেলাফত আন্দোলন ১১টি, নেজামে ইসলাম পার্টি ৬টি, জাগপা ৩টি এবং বিডিপি ২টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়।
সমঝোতা হলে একটি আসনে জোটের একজন প্রার্থী রেখে বাকিদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করা হতে পারে। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ভোটের আগে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময় ২০ জানুয়ারি।
জামায়াত ১৯০টি আসন নিজেদের জন্য রেখে ইসলামী আন্দোলনকে ৪০টি, এনসিপিকে ৩০টি আসন দিচ্ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ১৫টি, খেলাফত মজলিসকে ৭টি, এলডিপিকে ৭টি, এবি পার্টিকে ২টি এবং বিডিপিকে ২টি আসন ছাড় দেয়া হতে পারে।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটভুক্ত দলগুলোর নির্বাচনী আসন সমঝোতা চূড়ান্ত পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এখন আলাদা করে দলগুলোর সঙ্গে জামায়াতের বৈঠক হচ্ছে। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই আসন সমঝোতার বিষয়টি চূড়ান্ত রূপ পাবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জামায়াত ১৯০টি আসন নিজেদের জন্য রেখে বাকি আসনগুলো অন্য দলগুলোকে ছেড়ে দিতে চায়। ইসলামী আন্দোলনকে ৪০টি, এনসিপিকে ৩০টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ১৫টি, খেলাফত মজলিসকে ৭টি, এলডিপিকে ৭টি, এবি পার্টিকে ২টি এবং বিডিপিকে ২টি আসন ছাড় দেওয়া হতে পারে।
সূত্র জানায়, ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে গত কয়েক দিনে জামায়াত একাধিক বৈঠক করেছে। বৈঠক থেকে ৪০ আসনে একধরনের সমঝোতা হয়েছে। তবে ইসলামী আন্দোলন আরও কয়েকটি আসন দাবি করছে। যেসব আসনে জামায়াত ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসেরও শক্তিশালী প্রার্থী আছে। শেষ পর্যন্ত জনপ্রিয়তা ও যোগ্যতা যাচাই করে ইসলামী আন্দোলনকে আরও কয়েকটি আসনে ছাড় দিতেও পারে জামায়াত।
এনসিপি যখন আসন সমঝোতার আলোচনায় যুক্ত হয়, তখন তাঁদের ৩০ আসনে ছাড় দেয়া হবে, এমন আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছিলেন দলটির নেতারা। তবে এরপর আসন কিছুটা কমতে পারে, এমন গুঞ্জন ছিল। তবে জামায়াত সূত্র জানিয়েছে, এনসিপিকে ৩০ আসনেই ছাড় দেয়া হবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২৫–৩০টি আসন চায়। সমঝোতা আলোচনার সর্বশেষ বৈঠকে দলটিকে ১৩টি আসন দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। সমঝোতা না হওয়া আসনগুলোর কয়েকটিতে ছাড় চায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। তবে জামায়াত সূত্র জানিয়েছে, দলটিকে শেষ পর্যন্ত ১৫টি আসনে ছাড় দেয়া হতে পারে।
কাঙ্ক্ষিত আসনগুলোয় ছাড় না পেলে শেষ পর্যন্ত সমঝোতা না হওয়া আসনগুলোয় প্রার্থী না সরানোর ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। দলটির জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির ইউসুফ আশরাফও জানিয়েছেন, এই নীতিতে তাঁরা অটল আছেন। তিনি শনিবার (১০ জানুয়ারি ) গণমাধ্যমকে বলেন, আসন সমঝোতার আলোচনা অনেকখানি এগিয়েছে। আগের চেয়ে আসনসংখ্যাও বেড়েছে। মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ সময়ের আগেই আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হতে পারে।
এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন না। তাঁর ছেলে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক ওমর ফারুক চট্টগ্রাম-১৪ আসনের প্রার্থী হবেন। জামায়াত এই আসনসহ মোট ৭টি আসন এলডিপিকে ছাড় দিতে পারে।
খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা আবদুল বাছিত আজাদ ও মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের নির্বাচন করবেন যথাক্রমে হবিগঞ্জ–২ ও হবিগঞ্জ–৪ আসনে। দলটিকে জামায়াত ৭টি আসন ছাড়তে পারে। তবে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আরও দু–একটি আসন বাড়তে পারে।
এবি পার্টিকে দুটি আসনে ছাড় দিয়েছে জামায়াত। এর মধ্যে দলের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুকে ফেনী–২ এবং সাধারণ সম্পাদক মো. আসাদুজ্জামান ভূঁইয়াকে (ফুয়াদ) বরিশাল-৩ আসনে ছাড় দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া পটুয়াখালী–১ আসনে এবি পার্টির জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) আবদুল ওহাব মিনার ঈগল প্রতীকের প্রার্থী। এ আসনে মো. নাজমুল আহসানকে প্রার্থী করেছিল জামায়াত। তিনি মনোনয়নপত্রও জমা দিয়েছেন। তবে আসন সমঝোতা হলে তিনি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিতে পারেন। এবি পার্টির সঙ্গে এই তিন আসনে শেষ পর্যন্ত সমঝোতা হতে পারে জামায়াতের। তবে এবি পার্টি দশের বেশি আসন দাবি করেছে।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, সমঝোতার আলোচনা এখনো জোটগতভাবে চূড়ান্ত হয়নি। সমঝোতার একটা কমন নীতিমালা হওয়া খুব জরুরি ছিল, সে ক্ষেত্রেও সুস্পষ্ট কোনো ঐকমত্যে পৌঁছানো হয়নি। তিনটি আসনে এবি পার্টির সঙ্গে সমঝোতার কথা ছিল প্রাথমিক আলোচনায়। দলের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আপত্তি ও অসন্তোষের কথা জানানো হয়েছে। সার্বিকভাবে যে অস্পষ্টতা বিরাজমান, তা আশাব্যঞ্জক নয়।
এদিকে বিডিপিকে দুটি আসনে ছাড় দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দলটির চেয়ারম্যান এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম ময়মনসিংহ-৯ আসনে এবং মহাসচিব নিজামুল হক নাঈম ভোলা-৩ আসনে নির্বাচন করবেন।
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি এবং জাগপার বিষয়ে এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিসের মতো দলগুলোর সঙ্গে আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার পর এই তিন দলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সে ক্ষেত্রে প্রতিটি দল এক বা দুটি আসন করে ছাড় পেতে পারে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ গণমাধ্যমকে বলেন, সব দলের নেতাদের সুবিধাজনক সময় পাওয়া যাচ্ছে না, তাই একসঙ্গে বৈঠক করা যাচ্ছে না। তবে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সেই বৈঠক হবে। এরপর আসন সমঝোতার বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।