আজ
|| ২৫শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১২ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ৭ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
চলতি বছর আকাশপথের পরিসর বাড়াতে চায় এয়ারলাইন্সগুলো
প্রকাশের তারিখঃ ১১ জানুয়ারি, ২০২৬
প্রভাত অর্থনীতি: আন্তর্জাতিক যাত্রীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ২০২৪ সালে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রায় ১২.৫ মিলিয়ন আন্তর্জাতিক যাত্রী যাতায়াত করেছেন। সংখ্যাটি আগের বছরের চেয়ে ৭ শতাংশ বেশি। আকাশপথে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বাজারের ৭০ শতাংশেরও বেশি বর্তমানে ৩৭টি বিদেশি এয়ারলাইন্সের দখলে। বাংলাদেশের এয়ারলাইন্সগুলো মূলত দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের বাজার ধরতে চায়। কারণ, এই অঞ্চলগুলোতে প্রবাসী কর্মী ও পর্যটকদের ব্যাপক যাতায়াত রয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত্ব বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সও আগামী ২৯ জানুয়ারি থেকে ঢাকা-করাচি ফ্লাইট পুনরায় চালুসহ নতুন নতুন গন্তব্যে ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা নিয়ে আগাচ্ছে।
বর্তমানে কেবল ইউএস-বাংলা এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করছে। অন্যদিকে নভোএয়ার এবং এয়ার অ্যাস্ট্রা অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ৫০ লাখ বাংলাদেশি কাজের জন্য বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। দেশের ভেতরে সড়ক ও রেল যোগাযোগ ভালো হওয়ায় অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রী কিছুটা কমলেও সার্বিকভাবে যাত্রীসংখ্যা বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয় এয়ারলাইন্সগুলো ২০২৩ সালের মাঝামাঝি থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে রুট বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে সরবরাহ সংকটের কারণে এ পরিকল্পনা এখনো আলোর মুখ দেখছে না।
এদিকে এয়ারলাইন্সগুলো বলছে, কোভিড–পরবর্তী সময়ে যাত্রী সংখ্যা বাড়া এবং উড়োজাহাজ তৈরিতে জটিলতা ও সরবরাহে দেরি হওয়ায় নতুন রুট চালুর জন্য প্রয়োজনীয় উড়োজাহাজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের চারটি স্থানীয় এয়ারলাইন্স চলতি বছর আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে বিশ্বজুড়ে উড়োজাহাজ সংকট এবং লিজ নেওয়ার ক্ষেত্রে কঠিন শর্তের কারণে এয়ারলাইন্সগুলোর এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন পিছিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের আকাশপথের বড় অংশই বর্তমানে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর দখলে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তিনটি বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউএস-বাংলা, নভোএয়ার ও এয়ার অ্যাস্ট্রা মিলে অন্তত ১৫টি নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালুর পরিকল্পনা করছে।
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি উৎপাদন বন্ধ থাকা এবং সরবরাহে দেরি হওয়ায় বিশ্বজুড়ে উড়োজাহাজের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আর এটি কোম্পানিগুলোর জন্য লিজ নিয়ে উড়োজাহাজ পাওয়া কঠিন করে তুলেছে।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মুখপাত্র কামরুল ইসলাম বলেন, 'আমরা নিয়মিতভাবে বহরে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করছি। সম্প্রতি নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করার পর আমাদের বহরে এখন উড়োজাহাজের সংখ্যা ২৫টি। এগুলোর বেশিরভাগই লিজ নেওয়া। তবে কোভিড–পরবর্তী সময়ে যাত্রী চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে উড়োজাহাজের সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বোয়িং বিমানের ক্ষেত্রে নির্মাতা ও লিজদাতারা এই চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না।' তবে তিনি আশা করছেন, উড়োজাহাজের উৎপাদন স্বাভাবিক হলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে ভালো হবে। ইউএস-বাংলা গত কয়েক বছর ধরে ইউরোপের বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কামরুল ইসলাম বলেন, 'লন্ডন ও রোম রুটে ফ্লাইট চালু করতে আমরা দৃঢ়ভাবে কাজ করছি। শুধু আবেদন জমা দিলেই হয় না; এয়ারলাইন্সগুলোকে কঠিন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। আমাদের লক্ষ্য হলো চলতি বছরের মধ্যেই ইউরোপে ফ্লাইট শুরু করা।' এ ছাড়া এ বছর মদিনা রুটে ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের। এজন্য তাদের আরও অন্তত তিন থেকে চারটি নতুন উড়োজাহাজ দরকার। তবে সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে এয়ারলাইন্সগুলো চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
কামরুল ইসলাম বলেন, 'যদি ভারত হঠাৎ করেই ভিসার নিয়ম সহজ করে, তাতেও আমরা চেন্নাই বা কলকাতার মতো উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন রুটে সঙ্গে সঙ্গে ফ্লাইট বাড়াতে পারব না।' তিনি বলেন, 'আগে আমরা চেন্নাইয়ে প্রতিদিন ফ্লাইট পরিচালনা করতাম। এখন সেটি কমে সপ্তাহে তিনটি ফ্লাইটে নেমেছে। কলকাতায় যেখানে সপ্তাহে ১৪টি ফ্লাইট চলত, সেখানে এখন মাত্র তিন বা চারটি ফ্লাইট চলছে।'
নভোএয়ারের নজরে নতুন ৬ আন্তর্জাতিক রুট: তিন বছর প্রচেষ্টার পর নভোএয়ার আশা করছে চলতি বছর তারা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে পারবে।
এয়ারলাইন্সটি ২০২৩ সাল থেকে উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে লিজ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত উড়োজাহাজের বিশ্বব্যাপী ঘাটতির কারণে তাদের এ চেষ্টা সফল হচ্ছে না। তাদের আসল পরিকল্পনা ছিল এয়ারবাস এ৩২১ বিমান কেনা। পরে তা পরিবর্তন করে এ৩২০ বিমানের সংযোজন করা হলেও এখনও কোনো বিমান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ক্রু, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ইনস্যুরেন্সসহ এসিএমআই মডেলে বিমান লিজ নেওয়ার প্রচেষ্টাও সীমিত সরবরাহের কারণে সীমাবদ্ধ রয়েছে।
এয়ারলাইন্সটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোফিজুর রহমান বলেন, 'লিজদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনার জন্য এ মাসের শেষে একটি প্রতিনিধিদল ডাবলিন সফরে যাবে। যদি আমরা সেখানে বিমান নিশ্চিত করতে পারি, আমরা আশা করি বছরের মাঝামাছি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক চালু করতে পারব।' নভোএয়ারের প্রাথমিক লক্ষ্যগুলো হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর এবং সিঙ্গাপুর এবং মধ্যপ্রাচ্যে দুবাই, শরজাহ ও মাসকট।
এয়ার অ্যাস্ট্রার লক্ষ্য দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া: এয়ার অ্যাস্ট্রাও নতুন উড়োজাহাজ পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক রুটে নামার পরিকল্পনা করছে।
এয়ারলাইন্সটির জনসংযোগ দপ্তরের ডেপুটি ম্যানেজার সাকিব হাসান শুভ বলেন, 'আমরা আশা করছি ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের মধ্যে লিজের মাধ্যমে নতুন বিমান পাবো। তার পরে আমরা আন্তর্জাতিক রুট চালু করার পরিকল্পনা করছি, যেখানে আমাদের প্রধান লক্ষ্য নেপাল, কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক এবং সিঙ্গাপুর।' তিনি আরও জানান, এয়ারলাইন্সটিৃ ইতোমধ্যে এভিয়েশন অথরিটির কাছ থেকে ১২টি আন্তর্জাতিক রুটের ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ পেয়েছে।
বিমানের পরিকল্পনা নির্ভর করছে নতুন উড়োজাহাজের ওপর: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বর্তমানে ২২টি আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। এটি এখন পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ এবং আমেরিকায় প্রবেশের পরিকল্পনা করছে। কিন্তু এর সবকিছুই নির্ভর করছে নতুন উড়োজাহাজ পাওয়ার ওপর।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মুখপাত্র বুশরা ইসলাম জানান, লিজ নিয়ে উড়োজাহাজ পাওয়া গেলেই কেবল তারা নতুন গন্তব্যে যেতে পারবেন।
কর্তৃপক্ষ বোয়িং থেকে ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিলেও সেগুলো হাতে পেতে চার-পাঁচ বছর সময় লাগবে। তাই আপাতত তারা লিজ নেওয়ার জন্য বিভিন্ন কোম্পানির সাথে আলোচনা করছে। কিছুদিন আগে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শফিকুর রহমান বলেছিলেন, ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার জন্য এয়ারলাইনটি সরাসরি লিজিং কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
Copyright © 2026 প্রভাত. All rights reserved.