হাসানাত আকাশ, শিবচর : মা ও শিশুর নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথা বলে যে ভবনগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল, সেগুলো আজ শিবচরে দাঁড়িয়ে আছে নীরব প্রশ্নচিহ্ন হয়ে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে নেই চিকিৎসক, নেই নার্স, নেই ওষুধ—ফলে সরকারি এই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত তালাবদ্ধ ভবনে পরিণত হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভাণ্ডারীকান্দি ইউনিয়নের বীর মুক্তিযোদ্ধা লিয়াকত হোসেন মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত অধিকাংশ সময়ই বন্ধ থাকে। মূল ফটকে ঝুলে থাকে তালা। অথচ দূর-দূরান্তের চরাঞ্চল থেকে প্রতিদিন গর্ভবতী নারী ও শিশুদের নিয়ে অভিভাবকরা এখানে আসেন চিকিৎসার আশায়। কেন্দ্রের ভেতরে ঢোকার আগেই ভেঙে যায় সেই আশা।
একই চিত্র বহেরাতলা দক্ষিণ ইউনিয়নের হাজী আবুল কাশেম উকিল মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রেও। স্থানীয়দের অভিযোগ, নামমাত্র কয়েকদিন কেন্দ্র খোলা থাকলেও নিয়মিত চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায় না। ২৪ ঘণ্টা সেবার কথা থাকলেও বাস্তবে সপ্তাহের অধিকাংশ দিনই কেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকে। ফলে জরুরি অবস্থায় রোগীদের বাধ্য হয়ে ছুটতে হয় উপজেলা সদর বা জেলা শহরের হাসপাতালে—যা চরাঞ্চলের মানুষের জন্য সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল এবং অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে শিবচরের বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রায় ১৫ কোটিরও বেশি টাকা ব্যয়ে তিনটি ১০ শয্যার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে শিরুয়াইল ইউনিয়নে আরও একটি হাসপাতাল নির্মাণাধীন। অবকাঠামো নির্মাণে কোনো ঘাটতি না থাকলেও প্রশ্ন উঠেছে জনবল নিয়োগ ও সেবা কার্যক্রম চালুর বিষয়ে কেন এমন চরম উদাসীনতা?
উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্র জানায়, প্রতিটি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে চিকিৎসকসহ ১০টি অনুমোদিত পদ থাকার কথা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে অধিকাংশ পদ শূন্য পড়ে আছে। ফলে নিয়মিত সেবা চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। সাময়িকভাবে সপ্তাহে এক বা দুই দিন উপসহকারী কমিউনিটি চিকিৎসা কর্মকর্তাদের দিয়ে সীমিত সেবা দেওয়া হচ্ছে, যা এলাকার চাহিদার তুলনায় প্রায় অকার্যকর।
চরাঞ্চলের বাসিন্দা রোমানা বেগম বলেন, অনেক আশা নিয়ে এখানে আসি। কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই দেখি তালা। ডাক্তার না পেয়ে ফিরে যাই—এই কষ্ট কাউকে বোঝানো যাবে না।
আরেক রোগী ফাহিমা আক্তার বলেন, জরুরি অবস্থায় চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যেতে হয়। মা ও শিশুদের জন্য হাসপাতাল থাকলেও যদি সেবা না মেলে, তাহলে এর দরকার কী?
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক আবদুল কাদের বলেন, “সরকার কোটি টাকা ব্যয় করে ভবন বানিয়েছে, কিন্তু সেখানে ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই। এটা কি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা নয়? দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সাধারণ মানুষই এর খেসারত দেবে।
এ বিষয়ে মাদারীপুর জেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, “চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে নিয়মিত সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। নতুন নিয়োগ হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল অবকাঠামো নির্মাণকে উন্নয়ন বলা যায় না। জনবল নিয়োগ, ওষুধ সরবরাহ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা ছাড়া এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্র মানুষের কোনো উপকারে আসে না। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে শিবচরের মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রগুলো কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা হিসেবেই থেকে যাবে—আর বাড়তে থাকবে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি।