সুমাইয়া আক্তার, জাবি : এক সময় শীত এলেই পরিযায়ী পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ক্যাম্পাস। এখন আর পাখিরা ডানা ঝাপটায় না, কলকাকলিও নেই। পানিতে ঢেউ আর হাজারো লেসার হুইসলিং ডাকের উপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জলাশয়গুলো পরিণত হতো এক অনন্য পাখির অভয়ারণ্যে। তবে সেই চেনা দৃশ্য এখন দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে, আর বাড়ছে নীরবতা।
পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের তরুণ গবেষক আরিত্র সত্তার দীর্ঘদিন ধরে জাবির পরিযায়ী পাখির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি জানান, কোভিড-১৯ লকডাউন শেষে পূর্ণমাত্রায় মানবিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকেই পাখির সংখ্যা ও প্রজাতিগত বৈচিত্র্য হ্রাস পেতে থাকে। “২০২২ সালের পর এই পতন আর উপেক্ষা করার সুযোগ ছিল না। পাখিদের জন্য ক্যাম্পাসের লেকগুলো আর নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে থাকেনি,” বলেন তিনি।
একসময় শীতের অতিথিদের স্বাগত জানানো মনপুরা, ২০ মাইল, ট্রান্সপোর্ট, আলবেরুনি, নিউ রেজিস্ট্রার ও বোটানিক্যাল গার্ডেন লেকগুলো ধীরে ধীরে তাদের স্বাভাবিক চরিত্র হারাতে শুরু করে। বাড়তে থাকে নির্মাণকাজের শব্দ, রাতভর তীব্র আলো, পানিদূষণ ও জলজ উদ্ভিদের ক্ষয়। ফলে খাদ্য সংকট দেখা দেয় এবং পাখিদের আবাসস্থল দুর্বল হয়ে পড়ে।
২০২৪ সালে অপরিকল্পিত লেক পরিষ্কার কার্যক্রম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। জলজ উদ্ভিদ অপসারণ ও তলদেশে হস্তক্ষেপের ফলে লেকের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ভেঙে পড়ে। ঔরিত্র সত্তার তথ্যমতে, এ সময় পাখির সংখ্যা কমে ২০০-এর নিচে নেমে আসে এবং তারা শীতের মাঝামাঝি না পৌঁছেই ডিসেম্বরের শুরুতে এলাকা ত্যাগ করে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সময়মতো কার্যকর পুনরুদ্ধার উদ্যোগ নিতে না পারায় অধিকাংশ লেকের পরিবেশ আর স্থিতিশীল হয়নি। তবে চলতি মৌসুমে জাকসুর উদ্যোগে আংশিকভাবে পরিষ্কার হওয়ায় মনপুরা লেকে ২০০ থেকে ৭০০ পাখির উপস্থিতি দেখা গেছে। শিক্ষার্থী সিজেন সরকার সেখানে আফ্রিকান নোব-বিল্ড ডাক ও ফুলভাস হুইসলিং ডাকের মতো বিরল প্রজাতির উপস্থিতিও নথিভুক্ত করেছেন, যা আশার ইঙ্গিত দেয়।
এ শীতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট প্রায় ১,৫০০ পরিযায়ী পাখির আগমন ঘটলেও প্রায় সবাই আশ্রয় নিয়েছে ডব্লিউআরসি লেকে—ক্যাম্পাসের একমাত্র জলাশয় যা এখনো মানবিক হস্তক্ষেপ থেকে তুলনামূলকভাবে মুক্ত। অন্যদিকে অবকাঠামো সম্প্রসারণ, নতুন ভবন নির্মাণ ও মানুষের চলাচল প্রাকৃতিক খোলা জায়গাগুলোকে সংকুচিত করে ফেলছে।
দিন-রাত নির্মাণকাজ, যানবাহন ও ক্যাম্পাস কার্যক্রমজনিত শব্দদূষণ পাখিদের খাদ্য সংগ্রহ ও বিশ্রামে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। উপরন্তু লেকগুলোতে মাছচাষের ইজারা পরিস্থিতিকে আরও চাপের মুখে ফেলতে পারে। ফলে কেবল মানব উপস্থিতি সহনশীল কিছু প্রজাতিই টিকে থাকছে, আর জাবির পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠা বিরল পরিযায়ী পাখিরা একে একে হারিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পাখিরা এখনো ফিরে আসতে চায়—প্রবৃত্তি তাদের প্রতি শীতেই এই জলাশয়ের দিকে টানে। কিন্তু শুধু প্রবৃত্তি যথেষ্ট নয়। লেকগুলোকে আবার শান্ত, পরিচ্ছন্ন ও জীববৈচিত্র্যে ভরপুর করে তুলতে হবে।
এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেয়া গেলে এক সময়ের স্বর্গ হারানো ইতিহাসে পরিণত হবে না। বরং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আবারও পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাসস্থলের এক সফল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।