• রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০২:৪৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
বিসিবির কেন্দ্রীয় চুক্তি প্রকাশ, তাসকিনের অবনতি সিংড়ায় নিখোঁজ পল্লী চিকিৎসক ৪ দিন পর হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার: এলাকায় আতঙ্ক! রাজনৈতিক বিবেচনায় ফ্যামিলি কার্ড দেয়া হবে না : সমাজকল্যাণ মন্ত্রী পরীক্ষা-মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বড় সংস্কার আসছে, ঈদের পর রোডম্যাপ ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষায় আসছে ডিজিটাল রূপান্তর ‘মেরুদণ্ড সোজা রেখে’ সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায় সরকার: শামা ওবায়েদ পুলিশসহ অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনীকে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমজানের প্রথম দিন: কম দামের খোঁজে রাজধানীবাসী বাজারে বাড়লো কম দামি খেজুর ও মুরগি, শসা- লেবুর দাম চিকিৎসকদের সেবা তদারকি করার ঘোষণা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

বিনিয়োগ কমায়, বন্ধ হয়ে গেছে অনেক ছোট-মাঝারি ও বড় কারখানা

প্রভাত রিপোর্ট / ২৩ বার
আপডেট : শনিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬

প্রভাত অর্থনীতি: দেশে নিট এফডিআই বাড়লেও নতুন বিনিয়োগ আসা কমেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে করোনাকাল থেকেও নতুন বিনিয়োগ কমেছে। বাংলাদেশে এফডিআইয়ে খরা থাকলেও প্রতিযোগী দেশগুলো ঠিকই পাচ্ছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে খাদের কিনারায় পৌঁছে যাওয়া আর্থিক খাতে অনেকটা স্থিতিশীলতা ফিরিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতনও ঠেকানো গেছে। তবে বিনিয়োগ পরিস্থিতি সন্তোষজনক করা যায়নি। উল্টো নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধনের হারও নিম্নমুখী। আবার অনেক ছোট-মাঝারি ও বড় কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে লাখ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছেন।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই পেয়েছে। সে বছর ভারত ২৭ বিলিয়ন, ইন্দোনেশিয়া ২১ ও ভিয়েতনাম ২০ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই এনেছে। দেশগুলোর মধ্যে ভিয়েতনামের এফডিআই তিন বছর ধরে বেড়েছে। এদিকে ২০২২ সালে বাংলাদেশ এফডিআই পেয়েছিল ১ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। আর পাকিস্তান ১ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার। পরের বছরই পাকিস্তান বাংলাদেশকে টপকে যায়। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ দেড় বিলিয়ন ডলারের এফডিআই পেয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তান এফডিআই পেয়েছে বাংলাদেশের চেয়ে ১ বিলিয়ন ডলার বেশি।
দেশে ২০২৩-২৪ অর্থবছর জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের হার ছিল ২৩ দশমিক ৫১ শতাংশ। বিগত ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সেটি কমে ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমেছে। সে বছরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছিল ২৮১ কোটি ডলারের, যা কিনা আগের বছরের তুলনায় ১৯ শতাংশ কম। বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহও ছয় মাস ধরে ৭ শতাংশের নিচে। অথচ ক্ষমতাচ্যুত সরকারের শেষ মাসেও এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ শতাংশের বেশি।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, বিনিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো একটি জায়গায় সমস্যা হলেই নতুন বিনিয়োগ আসা থমকে যায়। অনেক উদ্যোক্তা হয়তো নিষ্কণ্টক জমি পেয়েছেন। তবে মানসম্মত বিদ্যুৎ এবং চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছেন না। ব্যাংকের উচ্চ সুদ, ব্যবসার খরচ ইত্যাদি ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি। ফলে বিনিয়োগের অবস্থার উন্নতি দেখা যাচ্ছে না।
মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার কিছু কাজ করেছে। তবে গ্যাস–সংকটের সমাধানে বড় পরিকল্পনা করা দরকার ছিল। ব্যবসায়ীদের সেবা নিতে যেসব প্রতিষ্ঠানে সরাসরি যেতে হয়, সেখানে ডিজিটালাইজেশন করলে দুর্ভোগ কমত। চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য ওঠানো-নামানোর সময় কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার দরকার ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৪২ কোটি ডলারের নিট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। বিদায়ী অর্থবছরে তা ১৯ শতাংশ বেড়ে ১৬৯ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। মূলত বিদেশি কোম্পানির বিদ্যমান ব্যবসা থেকে অর্জিত মুনাফা আবার বিনিয়োগ এবং সহযোগী কোম্পানি থেকে ঋণ নেয়া বৃদ্ধির কারণে নিট এফডিআই বেড়েছে। অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগ বা ইকুইটি ক্যাপিটাল কমেছে। বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫৫ কোটি ডলারের নতুন বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। নতুন এ বিনিয়োগ তার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ কম। করোনাকালে ২০২০-২১ অর্থবছরে নতুন বিনিয়োগ এসেছিল ৭২ কোটি ডলার। পরের বছর তা বেড়ে হয় ১১৪ কোটি ডলার। ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নতুন বিনিয়োগ আসে যথাক্রমে ৭১ ও ৬৭ কোটি ডলার।
বাংলাদেশ না পারলেও প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ এফডিআই পাচ্ছে ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া। এমনকি পাকিস্তানও বাংলাদেশের চেয়ে বেশি পাচ্ছে। যদিও দুই বছর আগেও এফডিআই আনায় দেশটি বাংলাদেশের পেছনে ছিল।
ব্যবসার পরিবেশ উন্নতির প্রতিশ্রুতি দিলেও কাজের কাজ খুব একটা হয়নি। গত অক্টোবরে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ব্যবসা পরিবেশ সূচক বা ক্লাইমেট ইনডেক্সে (বিবিএক্স) প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশে বলার মতো কোনো উন্নতি হয়নি। উল্টো এক বছরে আইন–কানুনের তথ্য প্রাপ্তি, অবকাঠামোসুবিধা, শ্রম নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য সহজীকরণ, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণ ও মান—এই ছয় সূচকে পরিস্থিতি আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে।
বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা আগের মতোই রয়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট বেড়েছে। ঋণের সুদহার ১৪-১৫ শতাংশে পৌঁছে গেছে। চট্টগ্রাম বন্দরের মাশুল বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা অগ্রিম আয়কর ও উৎসে করের চাপ পিষ্ট হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। দেশে ব্যবসার পরিবেশের তেমন কোনো উন্নতি না হলেও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ দিন দিন বাড়ছে। ফলে নতুন বিনিয়োগের চেয়ে বিদ্যমান ব্যবসা টেকাতে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা।
জানতে চাইলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সরকার বেশ কিছু অর্থনৈতিক অঞ্চল করছে। সেখানে অনেক বিনিয়োগকারী জায়গা নিয়েছেন। তবে সেগুলো এখন পর্যন্ত প্রস্তুত নয়। রাজস্বনীতি বিনিয়োগবান্ধব নয়। গ্যাস-বিদ্যুতের দামও বেশি। তা ছাড়া বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কেউ বিনিয়োগ করবেন না। তবে আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো হাত গুটিয়ে বসে নেই।’
বিদায়ী অর্থবছরে ১৪ হাজার টাকার বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন হয়েছে। তার আগের বছর ৩২ হাজার কোটি টাকার নিবন্ধন হয়েছিল। তার মানে বিদায়ী অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে প্রায় ৫৬ শতাংশ। অন্যদিকে গত অর্থবছরে ৫২ হাজার কোটি টাকার দেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন হয়েছে। তার আগের বছর নিবন্ধন হয়েছিল ১ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকা দেশি বিনিয়োগ।
দেশে বিনিয়োগ সম্মেলনে করার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ সরকারি সফর করেন আশিক চৌধুরী। তবে এর কার্যকর ফল দেখা যায়নি, উল্টো কয়েকটি দেশ থেকে এফডিআই আসা কমেছে। গত মার্চে বিনিয়োগ আকর্ষণে যুক্তরাজ্য সফর করেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান। সে সময় দেশটির সরকারের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ব্রিটিশ কোম্পানি ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে দেশটি থেকে গত অর্থবছরে এফডিআই আসে ৩০ কোটি ডলার। তার আগের বছর দেশটি থেকে ৫১ কোটি ডলারের এফডিআই এসেছিল। তার মানে দেশটি থেকে এফডিআই কমেছে ৪১ শতাংশ।
গত বছরের জানুয়ারিতে নির্বাহী চেয়ারম্যান যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। বিদায়ী অর্থবছর দেশটি থেকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে বিনিয়োগ এসেছে, তার চেয়ে বেশি প্রত্যাবসিত হয়েছে। তার মানে নিট বিনিয়োগ কমেছে ১৩১ শতাংশ। গত বছরের মার্চে বেইজিং সফর করেন প্রধান উপদেষ্টা। তিন মাস পর আশিক চৌধুরী দেশটি সফর করেন। যদিও গত অর্থবছর দেশটি থেকে এফডিআই আসা কমেছে প্রায় ৩ শতাংশ। আশিক চৌধুরী কাজের ফাঁকে স্কাই ডাইভিং করেন। ২০২৪ বছরের ২৫ মে যুক্তরাষ্ট্রের মেমফিসে ৪১ হাজার ৭৯৫ ফুট উঁচু দিয়ে উড়ে যাওয়া উড়োজাহাজ থেকে লাফ দিয়ে বিশ্ব রেকর্ড করেন তিনি। বিজয়ের ৫৪ বছর পূর্তি উপলক্ষে সরকারের বিশেষ কর্মসূচির অংশ হিসেবে গত ১৬ ডিসেম্বর ৫৪ জন প্যারাট্রুপার জাতীয় পতাকা হাতে স্কাই ডাইভিং করেন। তাঁদের মধ্যে আশিক চৌধুরীও ছিলেন। এ উদ্যোগ গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে জায়গা করে নিয়েছে।
জানতে চাইলে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী গত ১৯ জানুয়ারি সোমবার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সাধারণত গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী দেশে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক থাকে বা শূন্যে চলে যায়। কিন্তু আমাদের দেশে তা উল্টো বেড়েছে। এটি একটি আশ্চর্যজনক ব্যাপার (মিরাকল)। একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী হিসেবে ২০২৪ সালে দেশে যা হয়েছে, তা দেখার পর ২০২৫ সালে এসে কেউ কেন বিনিয়োগ করবেন? কারণ, দেশ কোন দিকে যাচ্ছে, তা অনিশ্চিত ছিল। তারপরও বিনিয়োগ বেড়েছে। তার মানে দেশের সম্ভাবনা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের কোনো সন্দেহ নেই। এখন আমরা তাঁদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারব কি না, সেটা প্রধান বিষয়।’
বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতির জন্য গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকার বড় কোনো সংস্কার করতে পারেনি। তা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক পর্যায়ে উন্নতি না হওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ সুদহারসহ বিভিন্ন কারণে চলমান ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি নেই। সে জন্য দেশে নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না।
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল। শুরুতে ভিন্নমাত্রার পদক্ষেপ নিয়েছিল। আমলাদের বাইরে থেকে একজনকে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান করা হয়েছিল। আমরা আশা করেছিলাম, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নতি করতে সাহসী সংস্কার করবেন। তবে গত দেড় বছরে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। ছিটেফোঁটা যা সংস্কার হয়েছে, তা খুবই নগণ্য।’


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও