আজ
|| ৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২১শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ || ১৫ই শাবান, ১৪৪৭ হিজরি
৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করছে বাংলাদেশ
প্রকাশের তারিখঃ ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
প্রভাত রিপোর্ট: বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি। ওয়াশিংটনের আরোপিত ‘পাল্টা শুল্ক’ হ্রাস এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এদিন চূড়ান্ত চুক্তিতে বসছে দুই দেশ। এর আওতায় মার্কিন তুলায় তৈরি পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি বোয়িং বিমান কেনা ও জ্বালানি খাতে আমদানির মতো বড় বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকছে। বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, এ ব্যাপারে চুক্তির খসড়া এবং এই তারিখেই স্বাক্ষর করার জন্য অনুমোদন চেয়ে আমরা সামারি পাঠিয়েছি। এটি অনুমোদিত হয়ে এলে আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারবো। রবিবার (১ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের পণ্যের ওপর প্রথমে ৩৭ শতাংশ এবং পরে ৩৫ শতাংশ ‘পাল্টা শুল্ক’ ঘোষণা করে আলোচনার সুযোগ রেখেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটনে তৃতীয় দফার আলোচনা শেষে গত ৩১ জুলাই পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। তবে এ জন্য দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতিসহ বাংলাদেশকে বেশ কিছু ছাড় দিতে হয়।
শুল্ক কত শতাংশ হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য সচিব বলেন, বাংলাদেশের রেসিপ্রোকাল শুল্কহার ২০ শতাংশ আছে। অন্যান্য দেশেও একই আছে, আবার অনেক দেশে বেশি আছে। তবে আমরা আশা করছি হয়তো কিছু কমতেও পারে; সে ধরনের একটি ধারণা আছে। তবে নিশ্চিত করে বলতে পারব না, এখনো তা নিশ্চিত হয়নি। আমরা খসড়া করেছি, তবে শুল্ক কত হবে সেটি নির্ধারণ করতে ৯ তারিখ পর্যন্ত সময় নেয়া হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সুবিধা পেতে বাংলাদেশকেও বেশ কিছু ছাড় দিতে হচ্ছে। গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর পাল্টা শুল্কের হার কমিয়ে ২০ শতাংশ কার্যকর করলেও দেশটির সঙ্গে কোনো চুক্তি হয়নি। পরে এই শুল্কহার আরও কমানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলায় উৎপাদিত পোশাক রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা আদায়ে আলোচনা অব্যাহত রাখে ঢাকা, যা চূড়ান্ত হয়ে চুক্তিতে পরিণত হতে যাচ্ছে।
সম্প্রতি ভারত ইইউ-এর সঙ্গে একটি এফটিএ (মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি) স্বাক্ষর করেছে এটি নিয়ে সরকার কি উদ্বিগ্ন? এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, এখানে উদ্বেগের কিছু নেই। আমরা তৈরি পোশাক খাতে গত ৪৫ বছর ধরে সক্ষমতা অর্জন করেছি এবং আমরা বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ। আমাদের এই খাতে দ্বিতীয় বৃহত্তম অবকাঠামো আছে। এই সক্ষমতা অন্য কেউ রাতারাতি অর্জন করে ফেলবে বলে আমাদের মনে হয় না। তিনি বলেন, আপনারা জানেন ভারত বেসিক টেক্সটাইলে বেশ শক্তিশালী এবং বিশ্ববাজারে তাদের ভালো অবস্থান আছে। আমরা কাঁচামালও তাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করি। কাজেই এই দুই দেশ এখনো পরিপূরক (কমপ্লিমেন্টারি) অবস্থায় আছে। তাদের উপকরণ উৎপাদন এবং নিজস্ব তুলাও আছে। ফলে ভারত আমাদের প্রতিযোগী নয় বরং পরিপূরক।
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর অনেক সুযোগ-সুবিধা হারানোর পাশাপাশি নতুন শুল্ক যুক্ত হবে—সেক্ষেত্রে এফটিএ নিয়ে সরকার নতুন কিছু ভাবছে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, হ্যাঁ, আমরা অনেকগুলো দেশের সাথে এফটিএ করছি। আমরা জাপানের সাথে এফটিএ-র নেগোসিয়েশন শেষ করেছি। আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি জাপানের সাথে এফটিএ স্বাক্ষরিত হবে। তিনি জানান, গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে দ্বিতীয় দফা আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে এবং আশা করছি এই বছরের মধ্যেই তাদের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে আমরা এফটিএ-র প্রস্তাব পাঠিয়েছি এবং অন্যান্য যেসব বাজারে আমরা শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাই, সবগুলোর কাছেই প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সেখানে আলোচনা শিগগিরই শুরু হবে। রমজানের প্রস্তুতির ব্যাপারে তিনি বলেন, রমজানের বাজার পরিস্থিতি, নিত্যপণ্যের মূল্য এবং রমজানভিত্তিক নির্দিষ্ট পণ্যগুলোর সরবরাহ নিয়ে আলোচনা করেছি। এ বছরের অবস্থা ভালো।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং কেনা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য সচিব বলেন, বিমান ক্রয়ের বিষয়টি আলোচনায় আছে। বিমানের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আমেরিকার সাথে এই চুক্তির আগেও পরিকল্পনা ছিল। শুধু বোয়িং নয়, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথেও আলোচনা ছিল। সেটি এখন একটি কাঠামোগত রূপ পেয়েছে। আমেরিকান রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ প্রসঙ্গে যতদূর জানি, তাদের সাথে নেগোসিয়েশন চলছে। বোয়িং কতগুলো এবং কোন বছর সরবরাহ করতে পারবে, দাম কী হবে এবং বিমানের ভেতরের কনফিগারেশন কেমন হবে— এসব নিয়ে আলোচনা চলছে।
এখানে যুদ্ধবিমানও আছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, যুদ্ধবিমান এই চুক্তির আওতায় কখনোই আসবে না। মিলিটারি ইস্যু কখনো ট্রেড ইস্যুতে থাকে না।
গত ছয় মাসে রপ্তানি ৩.৭ শতাংশ নেতিবাচক— যা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। এ নিয়ে পরিকল্পনা জানতে চাইলে সচিব বলেন, আমরা পর্যালোচনা করেছি। বিশ্ববাণিজ্যে ৩.৭ শতাংশ ঘাটতি হয়েছে। আমরা তো পৃথিবীর বাইরে নই, সেই হিসেবে আমাদের ওপর প্রভাব পড়েছে। তবে আমাদের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশ নয়, বরং ১.৬ শতাংশের মতো। অর্থাৎ গ্লোবাল অ্যাভারেজের চেয়ে আমরা ভালো অবস্থায় আছি।
যুক্তরাষ্ট্রের তুলা দিয়ে উৎপাদিত পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা চুক্তিতে থাকবে কি না— জানতে চাইলে তিনি বলেন, দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে এক দেশের উপকরণ ব্যবহার করলে কিউমুলেশন বেনিফিট পাওয়ার আশা থাকে। এটি একটি প্রগতিশীল প্রক্রিয়া এবং এ ধরনের সুবিধার জন্যই দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করা হয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলায় উৎপাদিত পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা চেয়ে আসছে বাংলাদেশ। বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তুলায় তৈরি পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া গেলে তা উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক হবে। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা রপ্তানি বাড়বে এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিও বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৪৬ মিলিয়ন ডলারের তুলা আমদানি করেছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২৭৮ মিলিয়ন ডলার। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি বাজার এখনো যুক্তরাষ্ট্র। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৬০০ কোটি ডলার থেকে কমাতে আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৫০ কোটি ডলারের আমদানি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। আগামী কয়েক বছরে বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কিনবে সরকার, যাতে খরচ হতে পারে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া কিছুটা বাড়তি দামে প্রতিবছর সাত লাখ টন করে গম আমদানি করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক পণ্য, বেসামরিক উড়োজাহাজ যন্ত্রাংশ, জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল ও তুলার আমদানি বাড়ানো এবং এলএনজি আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা হবে।
Copyright © 2026 প্রভাত. All rights reserved.