আজ
|| ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ২৮শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি
রাজধানীতে নতুন করে শুরু কিউলেক্স মশার দাপট
প্রকাশের তারিখঃ ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
প্রভাত রিপোর্ট : ডেঙ্গুর আতঙ্ক আপাতত কমলেও রাজধানীতে নতুন করে দাপট দেখাতে শুরু করেছে কিউলেক্স মশা। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে এই মশার প্রকোপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। অপরিকল্পিত ড্রেনেজ, নগরের নালা, ডোবা, জলাবদ্ধ এলাকা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এই মশা বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ, যা জনস্বাস্থ্য ও নগর ব্যবস্থাপনার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি আপাতত শান্ত থাকলেও এডিস মশা ফিরে আসার ঝুঁকি উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য উপেক্ষা করলে এর মূল্য দিতে হবে জনস্বাস্থ্য দিয়ে। বাড়ির ছাদে জমে থাকা পানি, অব্যবহৃত পাত্র, খোলা পানির ট্যাংক সময়ের ব্যবধানে বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. কবিরুল বাশারের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, ঢাকার মশা সমস্যা আর মৌসুমি নয়; এটি কাঠামোগত ও বৈজ্ঞানিক সংকটে রূপ নিয়েছে। মশা সার্ভেইল্যান্স তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে সংগৃহীত প্রাপ্তবয়স্ক মশার প্রায় ৮৫ শতাংশই ছিল কিউলেক্স প্রজাতির। কিউলেক্স সাধারণত রোগ ছড়ায় না এমন ভুল ধারণার কারণে দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকলেও এটি ফাইলেরিয়া রোগের বাহক এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করে।
ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘একটি অস্বস্তিকর সত্য স্বীকার করতেই হয়, নাগরিক অংশগ্রহণ ছাড়া ঢাকাকে মশামুক্ত করা অসম্ভব। প্রশাসন তার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না, আবার নাগরিক উদাসীনতাও সমানভাবে দায়ী।’ তিনি বলেন, ‘রাতে ঘুমানো থেকে শুরু করে হাসপাতালে রোগীর কষ্ট—সবখানেই কিউলেক্সের আধিপত্য।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু ডেঙ্গু মৌসুম এলেই মশা নিয়ে ভাবব? বছরের বাকি সময় কি কিউলেক্সের বাড়বাড়ন্ত আমাদের চোখে পড়বে না?’
তিনি আরো বলেন, “আমাদের ড্রেনেজব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে। বেইসমেন্ট ও পার্কিং এলাকায় পানি জমতে না দেওয়ার বাধ্যতামূলক বিধান কার্যকর করতে হবে। লেক, খাল ও জলাশয় নিয়মিত পরিষ্কার ও পরিবেশবান্ধব লার্ভা নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। বস্তি ও জলাবদ্ধ এলাকাকে ‘হাই-রিস্ক জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ কর্মসূচি নিতে হবে।”
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরীর তথ্য অনুযায়ী, ডিএনসিসি এলাকায় প্রতি সপ্তাহে মশা পরিস্থিতি নিয়ে নজরদারি প্রতিবেদন পাওয়া যাচ্ছে।
মিরপুর, মোহাম্মদপুর, উত্তরা ও নতুন ওয়ার্ডগুলোতে কিউলেক্স বাড়ার প্রবণতা দেখা গেছে। ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে বিশেষ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে, যেখানে ওয়ার্ডভিত্তিক ওষুধ প্রয়োগ, লার্ভা নিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সমন্বিত কার্যক্রম থাকবে।
ডিএনসিসি সূত্র জানায়, উত্তর সিটি এলাকায় প্রায় ১১ হাজার বিঘা জলাশয় রয়েছে। মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও উত্তরাসহ পাঁচটি এলাকায় মশার প্রকোপ বেশি। ডিএনসিসি এলাকার ১৩টি ওয়ার্ডে খারাপ অবস্থায় থাকা ডোবা ও জলাশয় চিহ্নিত করে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া রানাভোলা খাল, হাতিরঝিল, বনানী ও গুলশান লেক, দক্ষিণখান-উত্তরখান এলাকা, বোটানিক্যাল গার্ডেনসংলগ্ন জলাশয় ও কল্যাণপুর খালসহ অন্তত ৯টি খাল চিহ্নিত হয়েছে, যেগুলোর দুই পারে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ট্রিটমেন্ট চালানো হবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন জানিয়েছেন, ‘শুধু সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; নাগরিকদেরও নিজ নিজ বাসস্থান ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। নাগরিক অংশগ্রহণ ছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।’
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দারা বলছেন, সন্ধ্যার পর মশার উপদ্রব এত বেড়ে যায় যে ঘরে বসে থাকা দায় হয়ে পড়ে। নিয়মিত কয়েল, স্প্রে বা মশারি ব্যবহার করেও স্বস্তি মিলছে না। জলাবদ্ধ ড্রেন ও খোলা নালার পাশে বসবাসকারীদের অবস্থা আরো খারাপ। দক্ষিণখান এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, অনেক এলাকায় নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থা নেই। বাসাবাড়ির ময়লা খোলা জায়গায় ফেলা হয়, বৃষ্টির পানি জমে ডোবা তৈরি হয়। এসব জায়গা মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। রাতে শিশু ও বয়স্কদের ঘুমাতে সমস্যা হচ্ছে; মশাবাহিত রোগের আশঙ্কাও বাড়ছে।
Copyright © 2026 প্রভাত. All rights reserved.