আজ
|| ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৯ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ || ৪ঠা রমজান, ১৪৪৭ হিজরি
মার্কিন তুলায় শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে বাংলাদেশ, কমবে ভারত নির্ভরতা
প্রকাশের তারিখঃ ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
প্রভাত রিপোর্ট: বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নতুন এক সুযোগের দরজা খুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক দেশটিতে রফতানির ক্ষেত্রে শূন্য শুল্ক সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। একইসঙ্গে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্ক (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে।
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির আওতায় এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি কৌশলে একটি মৌলিক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতদিন ভারতসহ তৃতীয় দেশ থেকে তুলা আমদানি করে তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে রফতানি করতো বাংলাদেশ। নতুন ব্যবস্থায় তুলা আসবে যুক্তরাষ্ট্র থেকেই, আর সেই তুলা দিয়ে তৈরি পোশাক রফতানি হবে সরাসরি মার্কিন বাজারে—শুল্ক ছাড়াই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু শুল্ক সুবিধার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বস্ত্র ও পোশাক খাতের মধ্যে একটি কৌশলগত সরবরাহ চেইন গড়ে তুলবে। যুক্তরাষ্ট্রের তুলা উৎপাদকরা নতুন বাজার পাবেন। আর বাংলাদেশ পাবে কম শুল্ক ও প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বলেছেন, নির্দিষ্ট কিছু বস্ত্র ও পোশাকপণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে উল্লেখযোগ্য গতি সঞ্চার করবে। তিনি বাংলাদেশের পক্ষে এই চুক্তির প্রধান আলোচক ছিলেন।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের তুলা আমদানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪৬ মিলিয়ন ডলারে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২৭৮ মিলিয়ন ডলার। মোট তুলা আমদানির প্রায় ১০ শতাংশ এখনই যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর। নতুন চুক্তিতে এই হার আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতদিন বাংলাদেশের পোশাক শিল্প অনেকাংশে ভারতীয় তুলার ওপর নির্ভরশীল ছিল। ভারত থেকে তুলা এনে সুতা ও কাপড় তৈরি করে তা পশ্চিমা বাজারে রফতানি করা হতো। নতুন ব্যবস্থায় এই নির্ভরতা কমবে, একইসঙ্গে সরবরাহ ঝুঁকি ও মধ্যবর্তী লজিস্টিক খরচ কমবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরাসরি তুলা আমদানির ফলে কাঁচামালের মান নিয়ে ক্রেতাদের আস্থা বাড়বে, যা উচ্চমূল্যের অর্ডার পাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে বস্ত্র ও পোশাক খাত থেকে। এর মধ্যে নিট পোশাকের অবদান প্রায় ৫৫ শতাংশ। নিট পোশাক উৎপাদনে ব্যবহৃত প্রধান কাঁচামালগুলোর একটি হলো ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট সুতা, যা মূলত প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে আমদানি করা হয়।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) জানায়, দেশে এক কেজি সুতা উৎপাদনে খরচ পড়ে গড়ে তিন মার্কিন ডলার। বিপরীতে, একই মানের সুতা ভারতে উৎপাদন করা হয় কেজি প্রতি প্রায় দুই দশমিক ৮৫ থেকে দুই দশমিক ৯০ ডলারে।
সংশোধিত শুল্ক হারের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রধান রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। ভিয়েতনামের ওপর পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে ১৯ শতাংশ এবং ভারতের ক্ষেত্রে ১৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
ডব্লিউটিও সেলের সাবেক মহাপরিচালক মো. হাফিজুর রহমানের মতে, স্বল্প শ্রম ব্যয় ও কম উৎপাদন খরচের কারণে ১৯ শতাংশ শুল্ক সত্ত্বেও বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ নেই। বরং মার্কিন তুলাভিত্তিক শুল্কমুক্ত সুবিধা এই ব্যবধান অনেকটাই পুষিয়ে দেবে।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এখনও বাংলাদেশের বৃহত্তম রফতানি বাজার। গত অর্থবছরে দেশটিতে বাংলাদেশের রফতানি ছিল আট দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলার, যার বড় অংশই তৈরি পোশাক।
ইপিবি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট আরএমজি রফতানি দাঁড়িয়েছে সাত হাজার ৫৪৪ দশমিক ৩৪ মিলিয়ন ডলার। এই অঙ্কটি একই সময়ে বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রফতানির ১৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য এক বছরে বাংলাদেশের মোট আরএমজি রফতানি ছিল ৩৮ হাজার ৭৭৫ দশমিক ১৫ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে প্রায় এক পঞ্চমাংশই গেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে, যা দেশটির বাজারে বাংলাদেশের নির্ভরতা ও গুরুত্ব স্পষ্ট করে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য পরিসংখ্যান সংস্থা ওটেক্সা প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে মোট পোশাক আমদানি হয়েছে ৭৮ হাজার ২০৭ দশমিক ১২ মিলিয়ন ডলারের। এই আমদানিতে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে ভিয়েতনাম। দেশটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক আমদানি হয়েছে ১৬ হাজার ৫৪৩ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চীন থেকে আমদানি হয়েছে ১১ হাজার ৩৪৫ দশমিক ০৭ মিলিয়ন ডলার, যা মোট আমদানির ১৪ দশমিক ৫১ শতাংশ।
বাংলাদেশ এই তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। আলোচ্য সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানির পরিমাণ ছিল আট হাজার ১৮৩ দশমিক ০৯ মিলিয়ন ডলার, যা দেশটির মোট পোশাক আমদানির ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ। তালিকায় এরপর রয়েছে ভারত (৪৯৫৪.৯২ মিলিয়ন ডলার), কম্বোডিয়া (৪৭১২.৬১ মিলিয়ন ডলার), ইন্দোনেশিয়া (৪৬৩৪.৩৬ মিলিয়ন ডলার), মেক্সিকো (২৫৯৭.৪৭ মিলিয়ন ডলার), পাকিস্তান (২৩৯৮.৫০ মিলিয়ন ডলার) এবং হন্ডুরাস (২০৩৮.১৭ মিলিয়ন ডলার)।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির এই অবস্থান একদিকে যেমন বাজার বৈচিত্র্যের সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে, অন্যদিকে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণও দেয়। তবে শুল্কনীতি, শ্রম মান ও ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব ভবিষ্যতে এই বাজার ধরে রাখার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
চুক্তির আওতায় সার্বিকভাবে শুল্কহার এক শতাংশ কমা এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রফতানিতে পাল্টা শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়াকে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন দেশটিতে পোশাক রফতানির সঙ্গে যুক্ত শীর্ষ রফতানিকারকেরা। তাদের মতে, এ সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা আরও জোরদার করবে।
এ বিষয়ে বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল গণমাধ্যমকে বলেন, “চুক্তির মাধ্যমে পাওয়া সুবিধা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তুলা আমদানি করে আসছে। নতুন ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রফতানিতে আর কোনও পাল্টা শুল্ক আরোপ হবে না, যা উদ্যোক্তাদের জন্য বড় স্বস্তির বিষয়।”
মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি আরও বাড়বে এবং এর ইতিবাচক প্রভাব সরাসরি রফতানিতে পড়বে। ফলে আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বিশ্লেষকদের ধারণা, শুল্কমুক্ত সুবিধা পুরোপুরি কার্যকর হলে আগামী কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিতে নতুন গতি আসতে পারে। বিশেষ করে ওভেন ও নিটওয়্যার খাতে অর্ডার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা এনে সেই তুলায় তৈরি পোশাক আবার যুক্তরাষ্ট্রেই শুল্কমুক্ত রফতানির সুযোগ—বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য এটি শুধু একটি বাণিজ্যিক সুবিধা নয় বরং রফতানি কৌশলের একটি বড় মোড় হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
Copyright © 2026 প্রভাত. All rights reserved.