প্রভাত বিনোদন: হলিউড ও আন্তর্জাতিক সংগীতজগতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে একটি নাম—জেফরি এপস্টিন। মৃত এই কুখ্যাত অর্থলগ্নিকারীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নতুন করে সামনে আসতেই এবার বড় সংকটে পড়েছে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ট্যালেন্ট ও মিউজিক এজেন্সি ওয়াসারম্যান মিউজিক এজেন্সি। এজেন্সিটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নিবার্হী কেসি ওয়াসারম্যানের সঙ্গে এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী গিলেন ম্যাক্সওয়েলের যোগাযোগের তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই একের পর এক শিল্পী প্রতিষ্ঠানটি ছাড়ার ঘোষণা দিচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী বিনোদনবিষয়ক সাময়িকী ভ্যারাইটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সপ্তাহেই ওয়াসারম্যান এজেন্সির ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে। শিল্পী, এজেন্ট ও নির্বাহীদের চাপের মুখে কেসি ওয়াসারম্যানের পদত্যাগ, কোম্পানি বিক্রি কিংবা বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ভ্যারাইটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়াসারম্যান এজেন্সির সঙ্গে যুক্ত একাধিক শীর্ষ শিল্পী ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। সূত্রের দাবি, শিল্পীদের প্রতিনিধিরা কেসি ওয়াসারম্যানকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন—তাঁকে হয় সরে দাঁড়াতে হবে, নয়তো কোম্পানির মালিকানা ছাড়তে হবে।
এ পরিস্থিতিতে কেসি ওয়াসারম্যান এজেন্সির শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন, যেখানে ভবিষ্যৎ করণীয় ঠিক হবে। শুধু সংগীত ব্যবসায় নয়, তিনি বর্তমানে ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক গেমসের আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। সেখানেও তাঁর পদত্যাগের দাবিতে চাপ বাড়ছে। একটি সূত্র ভ্যারাইটিকে বলেছে, এটা যেন আগুনে পুড়ে যাওয়া একটা বাড়ি। পরিস্থিতি দ্রুত হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে।
ওয়াসারম্যান এজেন্সি ছাড়ার তালিকায় প্রথম দিকেই ছিলেন বেস্ট কোস্ট ব্যান্ডের গায়িকা বেথানি কসেন্তিনো। এরপর যুক্ত হয়েছেন জনপ্রিয় পপশিল্পী চ্যাপেল রোন এবং ইন্ডি মিউজিকের পরিচিত নাম ওয়েনসডে, ওয়াটার ফ্রম ইয়োর আইজ, বিচ বানিসহ আরও অনেকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে অনেক শিল্পী স্পষ্ট করেছেন, এপস্টিন ও ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার খবর তাঁদের গভীরভাবে বিচলিত করেছে। এর ফলেই তাঁরা ওয়াসারম্যানের সঙ্গে আর যুক্ত থাকতে চান না।
ওয়াসারম্যান মিউজিক এজেন্সি বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংগীত এজেন্সিগুলোর একটি। তাদের শিল্পী তালিকায় ছিলেন বা আছেন এড শিরান, কোল্ডপ্লে, চাইল্ডিশ গ্যাম্বিনো, কেনড্রিক লামার, লর্ডে, ফিশ, রায়ে, সিজা, জনি মিচেল, টেইলার, দ্য ক্রিয়েটরসহ অনেকেই। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এজেন্সিটির ওয়েবসাইট থেকে এই শিল্পীদের তালিকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, শিল্পীদের অনুরোধেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এই সংকট শুধু শিল্পীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বড় জটিলতা তৈরি হয়েছে এজেন্টদের ক্ষেত্রেও। কারণ, সাধারণত এজেন্টরা তিন থেকে পাঁচ বছরের চুক্তিতে বাধা থাকেন। অন্যদিকে শিল্পীরা তুলনামূলকভাবে সহজেই এজেন্সি বদলাতে পারেন।
হলিউডে বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায়, শিল্পীরা তাঁদের এজেন্সির চেয়ে ব্যক্তিগত এজেন্টের প্রতি বেশি অনুগত থাকেন। ফলে এক এজেন্ট যদি অন্য প্রতিষ্ঠানে যান, অনেক শিল্পীও তাঁর সঙ্গে চলে যান। ওয়াসারম্যান সংকটের ক্ষেত্রেও এই বাস্তবতা বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্রের দাবি, সংকট এখন সর্বোচ্চ উত্তেজনার পর্যায়ে। ওয়াসারম্যান এজেন্সির অভিজ্ঞ নির্বাহীরা, যেমন মার্টি ডায়মন্ড, ডাফি ম্যাকসুইগিনসহ আরও অনেকে একত্র হয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে কোনোভাবে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।
খবরে বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে কোম্পানিটি কেনার প্রস্তাবও এসেছে। এমনকি নির্বাহীরা নিজেরাই এজেন্সির কোনো অংশ কিনে নেওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে। তবে এসব প্রস্তাব কতটা বাস্তবসম্মত, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেসি ওয়াসারম্যান সরাসরি জেফরি এপস্টিনের কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত নন। তবে নথিপত্রে দেখা গেছে, ২০০২ সালে একটি মানবিক সফরে ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে এপস্টিনের ব্যক্তিগত বিমানে একবার ভ্রমণ করেছিলেন কেসি ওয়াসারম্যান।
এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী গিলেন ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে তিনি আপত্তিকর ও ব্যক্তিগত ই–মেইল বিনিময় করেছিলেন, যা প্রকাশ্যে এসেছে। এই ঘটনাগুলো ঘটেছিল এপস্টিনের অপরাধ প্রকাশ পাওয়ার বহু বছর আগে।
এই সংযোগের জন্য কেসি ওয়াসারম্যান প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন এবং বলেছেন, ‘আমি তাদের সঙ্গে যেকোনো ধরনের সম্পর্কের জন্য ভীষণভাবে দুঃখিত।’
কেসি ওয়াসারম্যান আরও জানিয়েছেন, তিনি বিভিন্ন দাতব্য সংস্থার সঙ্গে যুক্ত এবং সামাজিক কাজে সক্রিয়।
এই সংকট কেসি ওয়াসারম্যানের জন্য নতুন নয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে, প্যারিস অলিম্পিক চলাকালীন, তার বিরুদ্ধে আরও একটি বড় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে অভিযোগ করা হয়, তিনি বহু বছর ধরে জুনিয়র কর্মীদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন।
সেই সময় এই অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হলেও ধীরে ধীরে তা কিছুটা স্তিমিত হয়ে যায়। তবে এবার এপস্টিন সংযোগের খবর সামনে আসায় আগের অভিযোগগুলোও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বেস্ট কোস্ট ব্যান্ডের গায়িকা বেথানি কসেন্তিনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘শোষণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত কারও সঙ্গে আমার নাম বা ক্যারিয়ার যুক্ত থাকুক, এতে আমি সম্মতি দিইনি। চুপ করে থাকা আমার বিবেকের সঙ্গে যায় না।’ এই বক্তব্য অনেক শিল্পীর মনোভাবই প্রতিফলিত করছে।
ওয়াসারম্যান শুধু সংগীতজগতেই নন, ক্রীড়া ও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট ব্যবস্থাপনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক গেমসের আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চলমান এই কেলেঙ্কারির কারণে সেখানে থেকেও তার সরে দাঁড়ানোর দাবি উঠছে।
ভবিষ্যৎ কোন পথে?
সব মিলিয়ে ওয়াসারম্যান মিউজিক এজেন্সি এখন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে। শিল্পীদের বিদায়, এজেন্টদের অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগকারীদের প্রস্তাব এবং এপস্টিন-সংযোগের নেতিবাচক ভাবমূর্তি—সবকিছু মিলিয়ে কোম্পানির ভবিষ্যৎ এই সপ্তাহেই বড় মোড় নিতে পারে। ভ্যারাইটি অবলম্বনে