• রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:৩২ অপরাহ্ন
শিরোনাম
আগামী মঙ্গলবার শপথ পাঠ করাবেন সিইসি, থাকছে কঠোর নিরাপত্তা তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানালেন নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ ছিল: রাশিয়া ঢাকা-৮ আসনে ভোট পুনঃগণনার দাবিতে লিখিত অভিযোগ পাটওয়ারীর জনপ্রশাসনে ফ্যাসিবাদী আমলাদের অপসারণের দাবি রাজধানীতে ভোটের হার সর্বনিম্ন ৩৭.৪২%, সর্বোচ্চ ৪৮.৭৫% রমজান ঘনিয়ে আসতেই বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম এবারের জাতীয় নির্বাচনের সমাপ্তি সুন্দর হয়নি : হামিদুর রহমান আযাদ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মত প্রকাশের জন্য কোনো সাংবাদিককে জেলে যেতে হয়নি: তথ্য উপদেষ্টা বিএনপির ইচ্ছাতেই সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় শপথ : আইন উপদেষ্টা

ইউরোপীয় ইউনিয়নে পোশাক রফতানিতে হঠাৎ ধাক্কা

প্রভাত রিপোর্ট / ৩ বার
আপডেট : রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

প্রভাত রিপোর্ট: ২০২৫ সালের পুরো বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পোশাক বাজারে সামান্য প্রবৃদ্ধি থাকলেও বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে স্পষ্ট ধাক্কার চিত্র ফুটে উঠেছে। ইউরোপীয় পরিসংখ্যান দপ্তর ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ উপাত্ত বলছে, ডিসেম্বর ২০২৪-এর তুলনায় ডিসেম্বর ২০২৫-এ ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট পোশাক আমদানি মূল্য কমেছে ২ দশমিক ২৭ শতাংশ। পুরো বছরের হিসাবে বাজার ২ দশমিক ১০ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু ডিসেম্বরের পতন দেখাচ্ছে— বছরের শেষভাগে চাহিদা কমেছে এবং দামের ওপর তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই নিম্নগতি সাময়িক না দীর্ঘস্থায়ী, তা নির্ভর করবে ইউরোপের ভোক্তা ব্যয়ের প্রবণতার ওপর।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ডিসেম্বর মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ডিসেম্বর ২০২৪-এর তুলনায় ডিসেম্বর ২০২৫-এ—
রফতানি মূল্য কমেছে ১২ দশমিক ০৫ শতাংশ; সরবরাহের পরিমাণ কমেছে ০ দশমিক ৬১ শতাংশ; গড় একক দাম কমেছে ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, পরিমাণে বড় পতন না থাকলেও দামের পতনই মোট রফতানি আয়ে বড় ধাক্কা দিয়েছে। অর্থাৎ বাজার ধরে রাখতে সরবরাহ প্রায় একই থাকলেও ক্রেতারা কম দামে পণ্য কিনেছেন।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, বছরের শেষ প্রান্তিকে ইউরোপীয় খুচরা বিক্রেতারা মজুত সমন্বয়ে মনোযোগ দেন। উৎসব-পরবর্তী বিক্রয় কমে যাওয়া এবং ভোক্তাদের ব্যয়সংকোচন এতে প্রভাব ফেলেছে। ফলে নতুন অর্ডারে দামে চাপ বেড়েছে।
ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) অঞ্চলে তৈরি পোশাক আমদানি ২ দশমিক ১০ শতাংশ বেড়ে মোট ৯০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এ প্রবৃদ্ধির পেছনে মূল চালিকা শক্তি ছিল— আমদানির পরিমাণে (মিলিয়ন কেজি) ১৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি। তবে একই সময়ে গড় একক মূল্য (ইউরো/কেজি) ১০ দশমিক ২৭ শতাংশ কমেছে, যা বাজারে মূল্যচাপের ইঙ্গিত দেয়। এই প্রেক্ষাপটে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিও বেড়েছে। ২০২৪ সালে ১৮ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারে, অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৯৭ শতাংশ। রফতানির পরিমাণ ১০ দশমিক ২০ শতাংশ বাড়লেও গড় একক মূল্য ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ কমেছে। তবে বছরের শেষ দিকে কিছুটা ভাটা দেখা গেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রফতানি মূল্য ১২ দশমিক ০৫ শতাংশ, পরিমাণ ০ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং একক মূল্য ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ কমেছে— যা সাম্প্রতিক নিম্নমুখী প্রবণতার ইঙ্গিত বহন করে। অন্য প্রধান রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যেও সার্বিকভাবে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। চীন ইইউতে ২৬ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ১৭ শতাংশ বেশি। দেশটির রফতানি পরিমাণ ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেড়েছে, যদিও একক মূল্য ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় বাজারে চীনের কৌশলগত মনোযোগ বৃদ্ধির প্রতিফলন এতে স্পষ্ট।
ভারত, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়াও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। ভিয়েতনাম ৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ৪ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারের রফতানি করেছে এবং দেশটির একক মূল্য ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে তুরস্কের রফতানি ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমে ৮ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল গণমাধ্যমকে বলেন, “ইইউ বাজারে সার্বিক আমদানি বেড়েছে, কিন্তু মূল্যহ্রাসের কারণে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিমাণ বাড়লেও ইউনিট প্রাইস কমে যাওয়ায় প্রকৃত আয় প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি।” তিনি বলেন, “ডিসেম্বরের নিম্নমুখী প্রবণতা সতর্কবার্তা দিচ্ছে— আমাদের এখন উচ্চমূল্যের পণ্য, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাজার বৈচিত্র্যকরণের দিকে আরও জোর দিতে হবে।”
ডিসেম্বর মাসের তথ্য বলছে, ইউরোপীয় বাজারে তিনটি প্রবণতা স্পষ্ট— প্রথমত, ক্রেতারা বড় অঙ্কের অর্ডারের বদলে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, দামে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। তৃতীয়ত, সরবরাহকারী দেশগুলো বাজার ধরে রাখতে মূল্যছাড় দিতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে গড় একক দাম দ্রুত কমেছে। পুরো বছরে একক দাম কমলেও ডিসেম্বর মাসে তা আরও তীব্র হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে শীর্ষ সরবরাহকারী চায়না। ডিসেম্বর মাসে দেশটির ক্ষেত্রেও দামে চাপ ছিল। বেশি পরিমাণ সরবরাহের কৌশল অব্যাহত থাকলেও গড় একক দাম কমেছে। এতে বোঝা যায়, বাজার ধরে রাখতে চীনও দামে সমন্বয় করেছে। তুরস্কের ক্ষেত্রে পতন আরও প্রকট। দেশটির রফতানি মূল্য দুই অঙ্কে কমেছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও দামের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া, এর কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ভিয়েতনাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীলতা দেখাতে সক্ষম হয়েছে। ভারত ও পাকিস্তান সীমিত প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। তবে সামগ্রিকভাবে ডিসেম্বর মাসে ইউরোপীয় বাজারে দামের চাপ ছিল সর্বজনীন।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্প দীর্ঘদিন ধরে বড় পরিমাণে উৎপাদন ও সরবরাহের সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। ডিসেম্বরের উপাত্ত বলছে— পরিমাণে স্থিতিশীলতা থাকলেও দামে চাপ বাড়লে মোট আয় দ্রুত কমে যেতে পারে। উৎপাদন ব্যয়, বিশেষ করে মজুরি, জ্বালানি ও কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে গড় একক দাম কমে গেলে শিল্পের মুনাফা সংকুচিত হয়। এতে নতুন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, শুধু পরিমাণ বাড়িয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। মূল্য সংযোজন, উন্নত নকশা, বৈচিত্র্যময় পণ্য এবং গুণগত মানোন্নয়নের মাধ্যমে একক দাম বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের উপাত্ত স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে— ইউরোপীয় ইউনিয়নের পোশাক বাজারে প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে এবং দামে তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের রফতানিতে দুই অঙ্কের মূল্যপতন দেখাচ্ছে যে বাজারে অবস্থান শক্ত থাকলেও আয়ের স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে। উপাত্ত প্রকাশ করেছে ইউরোস্ট্যাট। বিভিন্ন দেশের তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতিতে ভিন্নতা থাকতে পারে, ফলে অন্যান্য উৎসের সঙ্গে সরাসরি তুলনা সব সময় সম্ভব নাও হতে পারে। সব মিলিয়ে ডিসেম্বরের হিসাব বলছে— ইউরোপের পোশাক বাজার এখন পরিমাণের চেয়ে দামের লড়াইয়ে বেশি নির্ধারিত হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এখন জরুরি— বাজার ধরে রেখে মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে টেকসই আয় নিশ্চিত করা।


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও