প্রভাত অর্থনীতি: গত সেপ্টেম্বরে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। তাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে হয়েছে ৩৫ দশমিক ৭৩, যা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ছিল ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। খেলাপি ঋণ আদায়ে তৎপরতা জোরদার করতে হবে। বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালু করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। কারণ, নতুন কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানো সময়সাপেক্ষ বিষয়।
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে দেশের আর্থিক খাতে চরম বিপর্যয় ঘটে। দেশের একাধিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখল করে লুটপাট চালান আওয়ামী লীগ–সমর্থিত ব্যবসায়ীরা। তাঁরা এসব অর্থের বড় অংশ বিদেশে পাচার করেন। ফলে দেশের একাধিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেমন অচল হয়ে পড়েছে, তেমনি অনেক আমানতকারী তাঁদের টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। সে জন্য এ রকম পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
এস আলম, বেক্সিমকো গ্রুপসহ যারা খাতটিকে দুর্বল করে দিয়েছে, তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত কী হবে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। এর ওপরই নির্ভর করবে খাতটির যে সংস্কার শুরু হয়েছে, তা টেকসই হবে কি না। এ ছাড়া আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে একাধিক আইন পাস করতে হবে বলে মনে করছেন খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এখন অর্থনীতির সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হলো ব্যাংকিং খাত। নাজুক পরিস্থিতিতে পড়া দেশের পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হচ্ছে। এসব ব্যাংকের আমানতকারীরা নানা দাবিতে আন্দোলন করছেন। চাকরি হারানো কর্মকর্তারাও আন্দোলনে রয়েছেন। ব্যাংক পাঁচটিতে রয়েছেন ৭৫ লাখ হিসাবধারী ও ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকার আমানত। ব্যাংকগুলো হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি, সোশ্যাল ইসলামী, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংক। এসব ব্যাংককে অধিগ্রহণ গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’–এর কার্যক্রম শুরুর প্রক্রিয়া চলছে। এ ছাড়া ছয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হচ্ছে। এই দুই উদ্যোগ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করাটা হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
নতুন সরকারের সামনে সব সময়ই কিছু অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ থাকে। এবার তো অবস্থা আগের চেয়ে অনেক সঙ্গিন। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারকে আর্থিক খাতে চলমান সংস্কার অব্যাহত রাখার পাশাপাশি খেলাপি ঋণ কমানোর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতের দেয়া মোট ঋণের ৩৬ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে। একই অবস্থা আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের। তাই নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতকে নিয়মের মধ্যে এনে শক্তিশালী আইনি ভিত্তি দিতে হবে, যাতে নতুন করে আর কোনো অনিয়ম না হয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন, ব্যাংক কোম্পানি ও অর্থ ঋণ আদালত আইন পাস করে যাওয়া। কিন্তু তারা সেটা করতে পারল না। নতুন সরকারের উচিত হবে, শুরুতেই আইনি ভিত্তির মাধ্যমে খাতটিকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়া, যাতে আর কোনো আর্থিক অপরাধ না ঘটে। যে সংস্কার শুরু হয়েছে, তা চলমান রাখতে হবে। এ ছাড়া যাঁরা আর্থিক অপরাধ করেছেন, তাঁদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। সব মিলিয়ে আর্থিক খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন সরকারের কাজ শুরু করতে হবে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
ব্যাংকাররা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কম করে দেখানোর যে প্রবণতা ছিল, তা এখন হচ্ছে না। এ ছাড়া অনেকে পালিয়ে যাওয়ায় তাঁদের ঋণ খারাপ হয়ে গেছে। ফলে কোন উপায়ে এসব ঋণ আদায় হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংকগুলোকে নিয়মের মধ্যে পরিচালনা করতে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাংক পরিচালকদের লাগাম টানা ও জবাবদিহির আওতার আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ ছাড়া ব্যাংক খাতের তদারকিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়। খেলাপিদের বিচারের আওতায় আনতে ও অর্থ উদ্ধারে নেয়া হয় অর্থ ঋণ আদালত আইন সংস্কারের উদ্যোগ। তবে শেষ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি। এসব আইন পাস করে সুষ্ঠু বাস্তবায়নে সহায়তা করাই হবে নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এ ছাড়া ব্যবসা–বাণিজ্য চাঙা করতে সুদহার কমানো, ঋণ প্রাপ্তি সহজ করাসহ নানামুখী উদ্যোগ নিতে হবে বলে মনে করছেন খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক বাণিজ্যের সূচকগুলোর উন্নতি হয়েছে। এ জন্য বিএনপি সরকারকে অবশ্য ডলার নিয়ে চাপে পড়তে হবে না।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান নতুন সরকারের উদ্দেশে একগুচ্ছ পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, নতুন সরকারের প্রধান কাজ হবে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি সাধন। মূল্যস্ফীতি এখনো বেশি, কর্মসংস্থানও হচ্ছে না। এ জন্য ব্যবসার পরিবেশের উন্নতি করতে হবে। কর আদায় বাড়িয়ে ঋণ কমাতে হবে। তাহলে বেসরকারি খাত ঋণ পাবে।
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান আরও বলেন, ব্যাংক একীভূতকরণ ও পাচার করা অর্থ দেশে ফেরানোর উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে। খেলাপি ঋণ কমাতে আইনি ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে। ব্যাংক কোম্পানি আইন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিয়ে তা বাস্তবায়ন করে আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিতে হবে। এটা নির্ভর করবে কারা আর্থিক খাতের দায়িত্ব পাচ্ছেন, তাঁদের ওপর।