আজ
|| ১৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৬ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ || ১লা রমজান, ১৪৪৭ হিজরি
সিংড়ায় নিখোঁজ পল্লী চিকিৎসক ৪ দিন পর হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার: এলাকায় আতঙ্ক!
প্রকাশের তারিখঃ ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
খন্দকার মাহাবুবুর রহমান, নাটোর: নাটোরের সিংড়া উপজেলায় রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হওয়ার চারদিন পর পল্লী চিকিৎসক বিনোদ কুমারকে (৪০) জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার ভোরে উপজেলার ধুলিয়াডাঙ্গা বিলের একটি পুকুরপাড় থেকে তাকে হাত-পা বাঁধা ও অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয়রা। বর্তমানে তিনি নাটোর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
পারিবারিক ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সিংড়া উপজেলার হাতিয়ানদহ ইউনিয়নের শালিখা মন্ডলপাড়া গ্রামের বিনোদ কুমার পার্শ্ববর্তী গুরুদাসপুর উপজেলার চন্দ্রপুর ওয়াবদা বাজারে নিজস্ব ফার্মেসীতে চিকিৎসা সেবা প্রদান করতেন। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি (রবিবার) রাত ৮টার দিকে দোকান বন্ধ করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন তিনি।
রাত আনুমানিক ৯টা ১৫ মিনিটের দিকে বিনোদ কুমার তার ব্যক্তিগত মোবাইল থেকে স্ত্রীকে ফোন করে অত্যন্ত আতঙ্কিত কণ্ঠে বলেন, "ছেলে-মেয়েদের দেখে রাখিও, আমার ইচ্ছা থাকলেও আমি বাড়িতে যাইতে পারিতেছি না।" এই রহস্যময় বার্তার পরপরই তার ফোনটি বন্ধ হয়ে যায়। ওই রাতেই পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করলে সিংড়া থানাধীন শালিখা শ্মশানের পশ্চিম পাশের একটি বাঁশঝাড় থেকে তার ব্যবহৃত ওষুধের ব্যাগটি পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
নিখোঁজের চারদিন পর আজ বৃহস্পতিবার ভোরে স্থানীয় কয়েকজন কৃষক ধুলিয়াডাঙ্গা বিলের পাশে একটি পুকুরপাড়ে তাকে হাত-পা বাঁধা ও অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। দ্রুত তাকে উদ্ধার করে নাটোর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
নাটোর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিনোদ কুমারের সাথে কথা বলতে গেলে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। চারদিন নিখোঁজ থাকার পর ফিরে এসে তিনি কেবল এটুকুই বলতে পেরেছেন, "আমি ভালো আছি।" তবে তাকে কে বা কারা তুলে নিয়ে গিয়েছিল, কোথায় আটকে রাখা হয়েছিল কিংবা এই চারদিন তিনি কী খেয়ে বেঁচে ছিলেন— এসব বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বারবার এড়িয়ে যান। বিমর্ষ ও আতঙ্কিত কণ্ঠে তিনি কেবল বলেন, "আমার কিছু মনে নেই।" তার এই 'স্মৃতিভ্রষ্ট' হওয়ার মতো আচরণ এবং রহস্যময় নীরবতা স্থানীয়দের মনে নতুন করে সন্দেহের দানা বাঁধছে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রচণ্ড মানসিক ট্রমা অথবা অপহরণকারীদের ভয়ভীতির কারণে তিনি মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় অভুক্ত থাকা এবং প্রচণ্ড মানসিক ট্রমার কারণে বিনোদ কুমার শারীরিকভাবে বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছেন। তবে বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল এবং তিনি সম্পূর্ণ আশঙ্কামুক্ত। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ শেষে তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাটোর জজ কোর্টের অ্যাডভোকেট প্রসাদ কুমার তালুকদার (বাচ্চা)। তিনি বলেন, "এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আমি তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও বাড়িঘর ভাঙচুরের মতন ঘটনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। শালিখা গ্রামের এই পল্লী চিকিৎসকের অপহরণের পেছনে কারা জড়িত এবং কী উদ্দেশ্যে তাকে তুলে নেওয়া হয়েছিল, তা খুঁজে বের করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিতে আমি প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানাই।"
সিংড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আ স ম আব্দুন নূর ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, "গত ১৬ ফেব্রুয়ারি পরিবারের পক্ষ থেকে জিডি করার পর থেকেই আমরা তাকে উদ্ধারে তৎপর ছিলাম। আজ তাকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধারের পর আমাদের একজন কনস্টেবল হাসপাতালে গিয়ে তার সাথে কথা বলেছেন। তবে অপহরণকারীদের পরিচয় সম্পর্কে বিনোদ কুমার এখনো স্পষ্ট কিছু জানাতে পারেননি; তিনি জানিয়েছেন তার কিছু মনে নেই। আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছি। তিনি পুরোপুরি সুস্থ হলে এবং পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক এজাহার দায়ের করলে আমরা নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারব এবং পরবর্তী কঠোর আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করব।"
নিখোঁজ বিনোদ কুমার জীবিত উদ্ধার হওয়ায় তার পরিবারে স্বস্তি ফিরলেও স্থানীয় শালিখা মন্ডলপাড়ার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে গভীর আতঙ্ক বিরাজ করছে। ঘটনার নেপথ্যে থাকা অপরাধীদের দ্রুত চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।
Copyright © 2026 প্রভাত. All rights reserved.