প্রভাত স্পোর্টস: ম্যাচ শেষ হওয়ার পর মাঠজুড়ে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটাররা। যে যেখানে যাঁকে পাচ্ছেন জড়িয়ে ধরছেন, লাফাচ্ছেন, করছেন উদ্যাপন। ক্যামেরা ঘুরল গ্যালারির দিকে। আইসিসির চেয়ারম্যান জয় শাহকে জড়িয়ে ধরেছেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। তাঁদের দুজনের পেছনে আরও একজনের মুখের হাসিও বোঝা গেল স্পষ্ট—রোহিত শর্মা। তাঁকে দেখে কেউ কি ফিরে গেলেন তিন বছর আগের স্মৃতিতে!
২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ ফাইনালে আহমেদাবাদে ভারতের এক লাখের বেশি দর্শক চুপ হয়ে গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে, রোহিত অধিনায়ক ছিলেন তখন। তাঁর চোখ বেয়ে অশ্রু গড়ানোর সেই দৃশ্যটা এখনো অনেকেরই মনে থাকার কথা।
সেই আফসোস রোহিত কাল হয়তো কিছুটা ভুলতে পেরেছেন আহমেদাবাদের দর্শকদের টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ‘চ্যাম্পিয়ন’ হওয়ার সাক্ষী হতে দেখে। শুধু কি আর ফাইনাল জয়, নিউজিল্যান্ডকে ৯৬ রানে হারিয়ে ভারত ‘প্রথমের’ ইতিহাস গড়েছে পরপর দুবার টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন আর তিন বিশ্বকাপ জেতা দল হিসেবেও। সঙ্গে গড়েছে আরও একটি ইতিহাস। টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে এই প্রথম ট্রফি জিতল স্বাগতিক দেশ।
এমন কিছু যে হতে পারে, ম্যাচের মাঝপথেই চাইলে তা লিখে দেওয়া যেত। বিশ্বকাপের ফাইনালে যেখানে কখনো দুই শ রানই হয়নি, সেখানে কাল কিনা ভারত পুরো ২০ ওভার খেলে ৫ উইকেট হারিয়ে করে ফেলে ২৫৫ রান। এত রান তাড়া করে নিউজিল্যান্ডকে জিততে হলে অনেক রেকর্ড নতুন করে লিখতে তো হতোই, তা হতো অলৌকিক এক ঘটনাও।
‘ক্রিকেট গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা’—এই আশাটুকু নিয়ে যাঁরা পরের ইনিংস দেখতে বসেছিলেন, তাঁরাও হয়তো বুঝতে পেরেছেন ‘অনিশ্চয়তারও’ আসলে সীমানা টানা আছে। বাস্তবতার কঠিন সেই পরীক্ষায় ১ ওভার বাকি থাকতেই ১৫৯ রানে অলআউট হয়ে গেছে নিউজিল্যান্ড। যশপ্রীত বুমরা ৪ উইকেট নিয়ে কাজটা সহজ করে দিয়েছেন। ২৬ বলে টিম সেইফার্টের ৫২ রান নিউজিল্যান্ডের সর্বোচ্চ।
এর আগে ভারতের ব্যাটসম্যানরা রীতিমতো তাণ্ডবই চালিয়েছেন নিউজিল্যান্ডের বোলারদের ওপর। টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপের দ্রুততম দলীয় পঞ্চাশ ও এক শ—দুটি রেকর্ডই নতুন করে লেখা হয়েছে। প্রায় পুরো বিশ্বকাপে ফর্ম খুঁজে বেড়ানো অভিষেক ফাইনালে ফিফটি পেয়েছেন মাত্র ১৮ বলে। তাঁর সঙ্গে সঞ্জু স্যামসনের উদ্বোধনী জুটি যখন ভাঙে, ততক্ষণে ৭ ওভারে ভারত করে ফেলেছে ৯৮ রান। অভিষেকের ড্রেসিংরুমে ফেরাও রানের লাগাম টানতে পারেনি এতটুকু। এবারের বিশ্বকাপে পরপর তিন ম্যাচে স্যামসন ফিফটি পেলেন। টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল ও ফাইনালে ফিফটি করেন বিরাট কোহলি ও শহীদ আফ্রিদির পর তৃতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে।
ঈশান আর স্যামসনের ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে একসময় মনে হচ্ছিল, ভারতের রান হয়তো তিন শতে গিয়ে ঠেকবে। ১৫ ওভার পার হওয়ার আগেই ভারতের রান ২০০ পেরিয়েও গিয়েছিল। হুট করেই ঝড়ের গতিতে বয়ে যাওয়া রানের গতিটা থমকে দেন জিমি নিশাম। এক ওভারেই তিনি নেন ৩ উইকেট!
নিশাম শুরুটা করেন স্যামসনকে সেঞ্চুরি না পাওয়ার আক্ষেপে পুড়িয়ে। তাঁর বলে ক্যাচ তুলেই ৪৬ বলে ৮৯ রানে আউট হন স্যামসন। ওই ওভারেই কিষান ও সূর্যকুমার যাদবকে ফেরান নিশাম, ওভারে দেন মাত্র ১ রান। রীতমতো ঝড়ের গতিতে বয়ে চলা ভারতীয় ইনিংস হঠাৎই থমকে যায়। পরের তিন ওভার থেকে আসে মাত্র ২৭ রান।
রানটা আড়াই শর আগেই আটকে যায় কি না, সেই সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল তখন। কিন্তু শেষ ওভারে পুরোনো গতি ফিরিয়ে এনে তা হতে দেননি শিবম দুবে। দুই ছক্কা আর তিন চারে শেষ ওভার থেকেই আসে ২৪ রান। তা বোধ হয় না করলেও চলত।
ভারতের রানটা তো ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছিল অনেক আগেই। ফাইনাল হারের বেদনা নিউজিল্যান্ডের জন্য নতুন নয়, টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপেই আগে আরও একবার এই অভিজ্ঞতা হয়েছে তাদের। কিন্তু ঘড়িতে অ্যালার্ম ঠিক করে রেখে রাত তিনটায় উঠে ম্যাচটা দেখতে রীতিমতো অনুরোধই জানিয়েছিলেন নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনার। তাঁর কথা শুনে ‘অ্যালার্ম’ বাজিয়ে যাঁদের ঘুম ভেঙেছে—তাঁদের হতাশাটা তো বুঝতেই পারছেন।