• রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৪১ অপরাহ্ন
শিরোনাম
এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা বাতিল করে বিল পাস নাট্যকর্মী মিমোর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার, শিক্ষক আটক আমার স্বামীর সঙ্গে কী ঘটেছিল, একটিবার জানতে চাই : স্ত্রী উর্মি হীরা যুক্তরাষ্ট্রে মাদারীপুরের মেয়ে বৃষ্টি হত্যাকাণ্ড : গ্রামের বাড়িতে মানুষের ভীড় প্লাস্টিক পণ্যের ভিড়ে অস্তিত্ব সংকটে রাণীনগরের ঐতিহ্যবাহী ‘পাতির সপ’ ভুয়া পেজ চালানোর অভিযোগ, সাদিক কায়েমসহ সহযোগীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি পুলিশসহ জরুরি সেবায় জ্বালানি রেশনিং তুলে নেয়া হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী রাজধানীতে কয়েক দিনের তীব্র গরমের পর স্বস্তির বৃষ্টি ঢাকা বাইক শো-তে সিএফএমওটিও নিয়ে এলো ‘জিহো’ এবং নতুন মোটরসাইকেল লাইনআপ রাজশাহী ব্যাংকার্স ক্লাব ক্রিকেট টুর্নামেন্টের হ্যাট্রিক চ্যাম্পিয়ন এনআরবিসি ব্যাংক

তেল কিনতে এক কিলোমিটার লাইন, বন্ধ পাম্পেও অপেক্ষা

প্রভাত রিপোর্ট / ২৯ বার
আপডেট : সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬

প্রভাত রিপোর্ট: রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে সোমবারও জ্বালানি তেল কিনতে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। কিছু ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। যেসব স্টেশনে জ্বালানি তেল বিক্রি বন্ধ রয়েছে, সেগুলোতেও ডিজেল, পেট্রল ও অকটেন কেনার আশায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার ও বিভিন্ন যানবাহনের চালকেরা। চালকেরা বলছেন, গাড়ি চালিয়ে অন্য আরেকটি পাম্পে যাওয়ার মতো অবস্থা নেই। কারও তেল একেবারে ফুরিয়ে গেছে, কারও কারও তেল প্রায় শেষ। তাই যেখানে লাইনে দাঁড়িয়েছেন, সেখানেই অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। পাম্প ছেড়ে যাওয়া মানে গাড়ি ঠেলে নিয়ে যাওয়া। অন্যদিকে যেসব পাম্পে জ্বালানি তেল বিক্রি চলছে, সেসব পাম্পে এক থেকে দেড় কিলোমিটার পর্যন্ত মোটরসাইকেল ও বিভিন্ন যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। চালকদের কেউ কেউ দেড় থেকে দুই ঘণ্টার বেশি সময় লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
সোমবার সকালে মিরপুর, কল্যাণপুর, মোহাম্মদপুর, বিজয়সরণি ও কালশী এলাকার ৯টি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায় ৩টিতে বিক্রি বন্ধ। একটিতে শুধু ডিজেল ও একটিতে শুধু অকটেন বিক্রি করতে দেখা গেছে। বাকি চারটিতে অকটেন ও ডিজেল বিক্রি করা হয়। সকাল ৯টার দিকে মিরপুর-২ নম্বরের স্যাম অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড পাম্পের প্রায় ৩০০ মিটার আগে ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সামনে থেকে প্রাইভেট কার ও অন্যান্য যানবাহনের সারি দেখা যায়। আরও কিছুদূর সামনে থেকে ছিল মোটরসাইকেলের সারি। সামনে গিয়ে দেখা যায়, পাম্পটিতে বিক্রি বন্ধ আছে। একজন নিরাপত্তাকর্মী দাঁড়িয়ে থেকে সবাইকে বলছেন, পাম্পে তেল নেই। তাই বিক্রি বন্ধ। ডিপো থেকে তেলের গাড়ি না আসা পর্যন্ত বিক্রি শুরু করা যাবে না।
পাম্পের ভেতরে গিয়ে কথা হয় ক্যাশিয়ার আরাফাত স্বপ্নীলের সঙ্গে। তিনি জানান, রবিবার বিকেল চারটার দিকে এক গাড়িতে সাড়ে চার হাজার লিটার অকটেন পেয়েছিলেন। রাত সাড়ে ১০টার মধ্যেই বিক্রি শেষ হয়ে যায়। এর পর থেকেই পাম্প বন্ধ রাখা হয়েছে।
তেলের গাড়ি নারায়ণগঞ্জ ডিপোতে গেছে, কবে আসবে ঠিক নেই। গাড়ি তেল নিয়ে এলেই বিক্রি শুরু করবেন বলেও জানালেন তিনি। ওই পাম্পের সামনে সকাল সাড়ে সাতটা থেকে জ্বালানির জন্য অপেক্ষা করছিলেন মোটরসাইকেলচালক সেলিম মিয়া। তিনি অ্যাপে রাইড শেয়ারিং করেন।
সেলিম মিয়া গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দেড় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছি। তেল বিক্রি করছে না। অন্য পাম্পে যাওয়ারও উপায় নেই। বাইক ঠেলতে হবে। আর রোজা রেখে বাইক ঠেলে নেওয়ার মতো অবস্থা নাই।’ পরে কল্যাণপুরের খালেক ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, জ্বালানি তেল বিক্রির অংশটি বন্ধ। পাম্পটিতে শুধু সিএনজি গ্যাস বিক্রি করা হচ্ছিল। সাড়ে ৯টার দিকে জ্বালানি তেল বিক্রির অংশের ক্যাশ কাউন্টার ও পাশে ব্যবস্থাপকের কক্ষ, দুটিই বন্ধ দেখা গেছে।
খালেক পাম্পের ঠিক উল্টোপাশের কমফোর্ট ফিলিং অ্যান্ড সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনেও একইভাবে শুধু সিএনজি গ্যাস বিক্রি চলছিল। পাম্পটির প্রবেশপথেই ‘তেল নাই’ লেখা একটি স্ট্যান্ড দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। পৌনে ১০টার দিকে আসাদগেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশনে গিয়ে জ্বালানি তেল ডিজেল ও অকটেন বিক্রি করতে দেখা গেছে। এই পাম্পে প্রবেশের আগে জিয়া উদ্যানসংলগ্ন লেকের প্রধান সেতুর অংশ থেকে প্রাইভেট কারের সারি দেখা গেছে। পাম্প থেকে এই অংশের দূরত্ব প্রায় সোয়া এক কিলোমিটার। সকাল ১০টার দিকে সেখানে কথা হয় ব্যাক্তিগত গাড়ির চালক মহসিন হোসেনের সঙ্গে। সকাল ৯টার কিছু আগে তিনি লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন বলে জানালেন। আর সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে তাঁর গাড়িটি ছিল ৩টি গাড়ির পেছনে।
মহসিন হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, সংকট শুরুর পর আজকেই প্রথম জ্বালানি নিচ্ছেন। গতকাল নিতে চেয়েছিলেন, তবে লাইন অনেক লম্বা দেখে আর নেননি। গতকাল প্রাইভেট কারের লাইন মণিপুরীপাড়া চলে গিয়েছিল বলেও জানান তিনি। এই পাম্পে কথা হয় ক্যাশিয়ার মোহাম্মদ আজমের সঙ্গে। সকাল ১০টার দিকে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল রাতে দুই গাড়িতে ২৭ হাজার লিটার অকটেন এসেছিল। এর মধ্যে ২০ হাজার লিটার বিক্রি হয়ে গেছে। আরও ৭ হাজারের মতো রয়েছে। এটি ফুরিয়ে গেলে আর ডিপোতে যাওয়া গাড়ি এর মধ্যে না এলে তাঁদেরও বিক্রি বন্ধ করা লাগবে। সোয়া ১০টার দিকে শেওড়াপাড়া এলাকার কাছাকাছি দুটি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে মেসার্স সবুর ফিলিং স্টেশন বন্ধ দেখা যায়। আর এ এস ফিলিং স্টেশনে শুধু ডিজেল বিক্রি করা হচ্ছিল। এ এস ফিলিং স্টেশনের সামনে মূল রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে একজন নিরাপত্তাকর্মীকে সবাইকে বলছিলেন, পেট্রল-অকটেন নেই। শুধু ডিজেল বিক্রি হচ্ছে।
সবচেয়ে লম্বা সারি দেখা যায় বিজয়সরণিসংলগ্ন ট্রাস্ট পাম্পে। আজ বেলা পৌনে ১১টার দিকে ওই পাম্প থেকে জ্বালানি নিতে দেড় কিলোমিটারের চেয়ে বেশি লম্বা প্রাইভেট কারের লাইন দেখা গেছে। ব্যক্তিগত গাড়ির সারি জাহাঙ্গীরগেট ছাড়িয়ে মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আর এই পাম্পে মোটরসাইকেলের সারি ছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মূল ফটক পর্যন্ত। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কালশীর সুমাত্রা ফিলিং স্টেশনের সামনে গিয়ে দেখা যায়, এ পাম্পটির সামনেও যানবাহনের দীর্ঘ সারি। এখানে পাম্প থেকে প্রাইভেট কারের সারি ইসিবি চত্বরের কাছে গিয়ে ঠেকেছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে জ্বালানি অস্থিরতা। তার প্রভাবে দেশেও তৈরি হয়েছে ‘কৃত্রিম সংকট’। সরকার কর্তৃক গত শুক্রবার থেকে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল সরবরাহ শুরুর আগে প্যানিক বায়িংয়ের জন্য অনেক পাম্পেই তেল শেষ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্টদের তরফ থেকে বলা হয়, শুক্র-শনি সরকারি ছুটি থাকায় ডিপো থেকে তেলবাহী গাড়ি চলাচল বন্ধ রয়েছে। এরপর থেকেই তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। তবে সোমবার রাজধানীর অনেক পাম্পেই তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি, কোনো পাম্পে আবার তেলও নেই। পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছে, চাহিদার তুলনায় তেল এসেছে অতি অল্প, যা দ্রুতই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এয়ারপোর্টে পরপর অবস্থিত দুইটি পেট্রোল পাম্পে আজ সকাল থেকেই তেল নেই। ডি এল ফিলিং স্টেশন ও মাসুদ হাসান ফিলিং স্টেশনের কর্মীরা বলেন, ৮ মার্চ একটি করে তেলের গাড়ি এসেছে, যা গতকালই শেষ হয়ে গেছে।
ডি এল ফিলিং স্টেশনের কর্মী বলেন, আমাদের দৈনিক গাড়ি লাগে ৬টা, অথচ সেখানে গাড়ি এসেছে মাত্র ১টা। যা বিপুল চাহিদার তুলনায় সামান্য। আজ আবার গাড়ি এলে তেল বিক্রি হবে। মাসুদ হাসান ফিলিং স্টেশনেরও একই বক্তব্য। সকাল থেকে এ পাম্পেও তেল নেই। দুপুর নাগাদ গাড়ি আসলে তেল সরবরাহ করা হবে। শুক্র-শনিবারের সরকারি ছুটির কারণে তেলের গাড়ি না আসার যুক্তি মেনে নিয়ে অধিকাংশ গ্রাহক আজ থেকে স্বাভাবিক তেল সরবরাহের আশা করেছিলেন। তবে তা না মেলায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তারা।
ডি এল স্টেশনে তেল নিতে আসা গ্রাহক মুকুল বলেন, পাম্পগুলো বলছিল শুক্র-শনিবারের পর থেকে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। কিন্তু এখানে এসে তো তা দেখতে পাচ্ছি না। ঘণ্টাখানেক যাবত অপেক্ষা করছি, কখন তেল আসবে কে জানে। আরেক গ্রাহক মো. সগীর বলেন, টঙ্গীর কয়েকটা পাম্পে কোনো তেল নেই, ভাবলাম এখানে এসে পাবো। কিন্তু এখানেও নেই, বলছে গাড়ি এলে পাওয়া যাবে। তেলের এই সংকট কতদিন ভোগাবে কে জানে। অন্যান্য পাম্পে তেল সরবরাহের সংকট থাকলেও তা স্বাভাবিক দেখা গেছে বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফুয়েল স্টেশনে। বরাবরের মতো আজও পাম্পে তেল নিতে আসা গ্রাহকের লাইন ছুঁইছুঁই করছে জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত।
পাম্পের কর্মচারী লিটন বলেন, আমাদের এখানে চাহিদামাফিক গাড়ি আসছ্ েসুতরাং এখানে তেলের সংকট নেই। প্রত্যেকে এসেই তেল নিতে পারছে। একটি তেলের গাড়ি সাধারণত ১৩ হাজার ৫০০ লিটার তেল বহন করতে পারে। রেশনিং পদ্ধতিতে এতে করে ৬ হাজার ৭৫০টি বাইক বা ১ হাজার ৩৫০টি গাড়িকে তেল দেওয়া সম্ভব। যদিও কিছু পাম্প বলছে, সব গাড়ি ফুল লোড হয়ে আসছে না।
কথা হয় মহাখালীর ক্লিন ফুয়েলের কর্মচারী জুয়েলে সঙ্গে। তিনি বলেন, সব পাম্প চাহিদামাফিক তেল পাচ্ছে না। ৬ গাড়ির অর্ডার দিলে ৪ গাড়ি আসে। আমাদের এখানে এখন তেল আছে, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে আশা করি সংকট হবে না।
বিভিন্ন পাম্পে তেলের গাড়ি না যাওয়া বা চাহিদামাফিক তেল না পাওয়ার কারণ জানতে কথা হয় পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির (একাংশ) সভাপতি সৈয়দ সাজ্জাদুল করিমের সঙ্গে। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, এই সংকটের কারণ হলো, মূলত ডিপো থেকেই তেল কম দেওয়া হচ্ছে। ফলে সব পাম্প চাইলেও তেল পাচ্ছে না। ধরুন একটি গাড়ির ধারণক্ষমতা ৪ হাজার লিটার হলে সে তেল পাচ্ছে ১ হাজার লিটার, যা দিয়ে বেশিক্ষণ তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব না। তিনি আরও বলেন, দেশে তেলবাহী জাহাজ প্রবেশ করলেও তা কাস্টমস ও ডিসচার্জ পেরিয়ে পাম্প অবধি আসতে কমপক্ষে ৭ থেকে ১০ দিন সময় লাগে। কিন্তু এটা তো মানুষরা বুঝতে পারছে না, ফলে প্রতিনিয়ত প্যানিক বায়িং বাড়ছে। সরকারের উচিত এখন তেলের দাম কমিয়ে দেওয়া, যাতে বোঝানো হয় যে, আমাদের কোনো সংকট নেই। এতে করে জনগণের আতঙ্কও কমে আসবে।
দেশীয়ভাবে উৎপাদিত জ্বালানি তেলের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রাকৃতিকভাবে আমরা যে পেট্রোল-অকটেন পেয়ে থাকি, সেটার পরিমাণ কমার কারণ হলো গ্যাসের উৎপাদন কমে গেছে। উৎপাদন কমলে কনডেনসেট কম উৎপাদিত হয়, ফলে এদিকেও তার প্রভাব পড়ে।
সার্বিক বিষয়ে বিপিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, রেশনিং পদ্ধতিতে পাম্পগুলোকে তেল দেওয়া হচ্ছে বিধায় কোথাও তেল দ্রুতই শেষ হচ্ছে। তবে তেলের কোনো সংকট নেই, যথেষ্ট মজুদ আছে। এছাড়া শিপমেন্টে আরও তেল দেশে এসেছে। দ্রুতই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও