• সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬, ০৩:০১ অপরাহ্ন

ফুটবলের ‘টপ সিক্রেট’ লিগ: উত্তর কোরিয়ার অজানা জগৎ

প্রভাত রিপোর্ট / ০ বার
আপডেট : সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬

প্রভাত স্পোর্টস: নারী এশিয়ান কাপে ৬ মার্চ সিডনিতে বাংলাদেশের বিপক্ষে ৫–০ গোলে জিতেছে উত্তর কোরিয়া। ‘বি’ গ্রুপের খেলায় এর আগে উজবেকিস্তানকেও হারানোয় টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার ফাইনালেও উঠেছে দলটি। এএফসি এশিয়ান কাপে উত্তর কোরিয়ার খেলোয়াড়েরা কেমন খেলছেন, ম্যাচের ফল কী, তা সবার চোখের সামনে। তবে উত্তর কোরিয়ার এই ফুটবলারেরা সারা বছর যে লিগে খেলেন, তা একপ্রকার লোকচক্ষুর অন্তরালেই থাকে। বলা হয়ে থাকে, উত্তর কোরিয়ার ঘরোয়া ফুটবল পৃথিবীর ‘টপ সিক্রেট’ লিগগুলোর একটি, যে লিগের তথ্য যতটা সম্ভব গোপন রাখা হয়।
যেমন সবজান্তা বলে পরিচিত গুগল সার্চ ইঞ্জিনেও উত্তর কোরিয়ার চলমান শীর্ষ লিগের সর্বশেষ পয়েন্ট তালিকা খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনকি মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়াতেও নেই সূচি বা হালনাগাদ তথ্য। উত্তর কোরিয়ার জাতীয় দল বা ক্লাবগুলো যখন ফিফা বা এএফসির প্রতিযোগিতায় খেলে, তখনই কেবল তাদের সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। এর বাইরে কোন দলের ম্যাচ কখন কোথায়, তা জানা যায় না, যতক্ষণ না রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কিছু জানায়।
ফুটবলবিষয়ক অনুষ্ঠান ‘দ্য সুইপার পডকাস্ট’ সম্প্রতি উত্তর কোরিয়ার এই গোপন লিগ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে দেশটির গোপনীয় ফুটবল লিগের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে।
উত্তর কোরিয়া প্রিমিয়ার লিগের খেলার সূচি আগে প্রকাশ করা হয় না। ম্যাচের আগের দিন স্টেডিয়ামের বাইরে ঘোষণা দিয়ে জানানো হয় পরদিন ম্যাচ হবে। সেই ঘোষণা অনুযায়ী দর্শকেরা খেলা দেখতে যান। বিদেশি দর্শকেরা সাধারণত ম্যাচের খবর পান তখনই, যখন রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো খবর দেয়। তবে সেটির বেশির ভাগই দেয়া হয় অনেক পরে।
দ্য সুইপার পডকাস্ট লিখেছে, কয়েকটি ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ এবং ইরিত্রিয়ার পাশাপাশি উত্তর কোরিয়া হলো একমাত্র ফিফা সদস্যদেশ, যাদের ঘরোয়া ফুটবলের তথ্য লাইভ স্কোর অ্যাপগুলোতেও পাওয়া যায় না। তবে দেশটির ফুটবল কাঠামো সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। উত্তর কোরিয়ায় পুরুষ ও নারীদের তিন স্তরের লিগ আছে। ফুটবল মৌসুম চলে ডিসেম্বর থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ফিফার মতে, উত্তর কোরিয়ার খেলোয়াড়েরা অপেশাদার বা অ্যামেচার। তবে এই খেলোয়াড়েরা যে সংস্থার প্রতিনিধিত্ব করেন, সেখানে তাঁরা বেতনভুক্ত কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। যে কারণে তাঁরা আক্ষরিক অর্থে অপেশাদারও নন।
উত্তর কোরিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে সফল ক্লাব এপ্রিল ২৫ স্পোর্টস ক্লাব, সংক্ষেপে ‘৪.২৫’। উত্তর কোরিয়ার বিপ্লবী সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠার দিনের নামানুসারে এই নামকরণ করা হয়েছে। মোট ২২টি শিরোপাজয়ী এই দল ২০১৯ সালে এএফসি কাপে (এশিয়ার তৎকালীন দ্বিতীয় স্তরের ক্লাব প্রতিযোগিতা) রানার্সআপ হয়েছিল। ১২ দলের এই শীর্ষ লিগের অন্য ক্লাবগুলো বেশির ভাগই পিয়ংইয়ংভিত্তিক এবং সেগুলো বিভিন্ন শিল্পকারখানা বা সরকারি দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত।
উত্তর কোরিয়ান লিগের বেশির ভাগ ম্যাচই রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিশ্বের বৃহত্তম ফুটবলকেন্দ্রিক স্টেডিয়ামের অবস্থান। ‘রংগ্রাডো ১ মে’ নামের স্টেডিয়ামটি তায়েডং নদীর একটি দ্বীপের মধ্যে অবস্থিত, এর দর্শক ধারণক্ষমতা ১ লাখ ১৪ হাজার। পিয়ংইয়ংয়ে আরও আছে কিম ইল সুং স্টেডিয়াম, যার ধারণক্ষমতা ৫০ হাজার।
উত্তর কোরিয়ায় ঢুকতে পারা পর্যটকেরা চাইলে লিগের ফুটবল ম্যাচ দেখতে পারেন। তবে ম্যাচের সময় তাঁদের আলাদা করে রাখা হয়, যাতে তাঁরা স্থানীয় লোকজনের সংস্পর্শে আসতে না পারেন। তাঁদের সঙ্গে সব সময় গাইড থাকেন। অনেক পর্যটকের মতে, তাঁরা গাইডের চেয়ে পাহারাদারের ভূমিকাই বেশি পালন করেন।
কোরিয়ান লিগে খেলা দেখার মূল মাধ্যম মাঠে যাওয়া। টিভিতে ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচার করা হয় না। পরে দেখানো হয় হাইলাইটস বা সংকলন। তবে বেশির ভাগ উত্তর কোরীয় তাদের নিজেদের স্থানীয় খেলার চেয়ে ইউরোপীয় লিগ ও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের ম্যাচ টিভিতে বেশি দেখার সুযোগ পান। তবে ম্যাচগুলো দেখানো হয় পরে, কখনো কখনো এক বছর পর।
৯০ মিনিটের ম্যাচগুলোকে কেটে প্রায় এক ঘণ্টায় নামিয়ে আনা হয়। অনেক সময় খামখেয়ালিভাবে কাটছাঁট করার কারণে ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তও বাদ পড়ে যায়। আবার স্টেডিয়ামের ভেতরে দৃশ্যমান ইংরেজি লেখাগুলো কোরিয়ান গ্রাফিকস দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। আর যে ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার সন হিউন মিন থাকেন, সেসব ম্যাচ কখনোই প্রচার করা হয় না। সন আগে প্রিমিয়ার লিগের টটেনহামে খেলতেন, গত বছর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারে লস অ্যাঞ্জেলেসের হয়ে খেলছেন।
ফুটবল ম্যাচ কাটছাঁট করে দেখানোর পেছনে ২০১০ বিশ্বকাপের ভূমিকা আছে মনে করেন অনেকে। সেবার গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে উত্তর কোরিয়া ব্রাজিলের কাছে ৩–১ গোলে হেরে যায়। সাধারণত এ ধরনের ঘটনার পর সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু পর্তুগালের বিপক্ষে পরের ম্যাচও সরাসরিই দেখানো হয়। সেই ম্যাচে উত্তর কোরিয়া ৭–০ গোলে হেরে যায়। এরপর উত্তর কোরিয়া আর কোনো বিশ্বকাপে জায়গা করতে পারেনি। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, সেই ঘটনার পর থেকেই দেশটিতে ফুটবল সম্প্রচারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কড়াকড়ি করা হয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও