• রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৩৫ অপরাহ্ন
শিরোনাম
এপ্রিলের ২৫ দিনে এলো ২৫৭ কোটি ডলার রেমিট্যান্স বাংলাদেশে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী সুইজারল্যান্ড : বাণিজ্যমন্ত্রী দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কার্যক্রম চলছে : সেতুমন্ত্রী গাইবান্ধায় বজ্রপাতে পাঁচজনের মৃত্যু জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে বর্তমান সংসদ কার্যকরী ভূমিকা রাখবে : স্পিকার এ মাসেই জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে আরও ১,৯৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আজহারীর ‘ডিপফেক’ ভিডিও বানিয়ে প্রতারণা : ১০ যুবক কারাগারে নাটোরে ২১ বছর বয়স দেখিয়ে ৭ বছরের শিশুর নামে মামলা একনেকে ১৭ প্রকল্প উত্থাপন, পাস ১৫ : অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী পরিবারের দিক থেকে আমি রাজকপালী, বললেন নিপুণ রায়
ডিজেল-অকটেন বিক্রি বেড়েছে ১২-১৮ শতাংশ

সংকটের মধ্যেও মজুত করছে দেশের মানুষ

প্রভাত রিপোর্ট / ৩৭ বার
আপডেট : বুধবার, ১১ মার্চ, ২০২৬

প্রভাত রিপোর্ট: বিশ্ব বাজারে দাম বাড়ায় বাংলাদেশ সরকারও দেশে দাম বাড়াবে- এমন আশঙ্কায় ডিলার-ডিস্ট্রিবিউটর থেকে শুরু করে ব্যবহারকারীরাও কৃত্রিম মজুতের দিকে ঝুঁকেছে। বিপিসি বলছে, এটি প্যানিক। প্যানিক কেটে গেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গত দুদিনে তিনটি জাহাজে ৮৫ হাজার টন ডিজেল চট্টগ্রামে এসেছে। এর মধ্যে একটি খালাস হয়েছে। আরও দুটি খালাসের অপেক্ষায়।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সারা বিশ্বের তেল-গ্যাসের বাজার উত্তপ্ত। সংকটে সর্বকালের বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে জ্বালানি তেল। এর আঁচ লেগেছে বাংলাদেশেও। তবে সংকটের মধ্যে সাশ্রয়ী না হয়ে আরও কিনছে, মজুত করছে দেশের মানুষ। গত মাসের প্রথম সপ্তাহের চেয়ে চলতি মাসে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোলের বিক্রি বেড়েছে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত।
বেশ কিছু পেট্রোল পাম্পে দেখা যায়, লোকজন পানির বোতল, লুব্রিকেন্টের ব্যবহৃত বোতল ও ড্রামে করে ডিজেল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বিমা অফিসের লোকজন ড্রাম ও প্লাস্টিকের জারে ডিজেল সংগ্রহ করছেন ওই পাম্প থেকে। অনেকে বলছেন, মার্কেট ও বাসাবাড়ির জেনারেটর চালানোর জন্য এক লিটার থেকে ৪০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল কিনছেন তারা। বাইকপ্রতি দুই লিটার অকটেন বিক্রির সরকারি নির্দেশনা থাকলেও ওই পাম্পে মোটরসাইকেলে ২০০ টাকার অকটেন দেয়া হচ্ছে। দুপুর ১টার দিকে দেখা যায়, বড় ড্রামে তেল দিচ্ছেন পেট্রোল পাম্পটির এক কর্মচারী। তিনি বলেন, ‘পুলিশ প্লাজার জেনারেটরের জন্য এসব তেল দেওয়া হচ্ছে।’ বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে। কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল এ জলপথকে বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন বলা হয়। বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক চতুর্থাংশ, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বড় অংশ হরমুজ প্রণালি হয়েই পরিবাহিত হয়। প্রধান রপ্তানিকারক সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ইরাক এবং ইরানের মতো তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো এই জলপথ ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ করে। দৈনিক প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেলের মতো অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। চলতি সপ্তাহে আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনার কারণে ইরান এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করলে বিশ্ববাজারে তেলের দামে প্রভাব পড়ে। এ জলপথ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও এলপিজি নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়।
বিপিসির গত সোমবারের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি মার্চ মাসের প্রথম ৮ দিনে ডিজেল বিক্রি হয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৭৫৭ টন। অকটেন ১২ হাজার ৩০৮ টন এবং পেট্রোল বিক্রি হয়েছে ১৩ হাজার ৪৭৩ টন বিক্রি হয়েছে। তবে গত ২০২৫ সালের মার্চের প্রথম ৮ দিনে ডিজেল বিক্রি হয়েছিল ৯৮ হাজার ৮৪২ টন, অকটেন ৮ হাজার ৯৯৩ টন এবং পেট্রোল ১১ হাজার ১০৫ টন। এতে এক বছরের তুলনায় চলতি মার্চ মাসের প্রথম আট দিনে ৩৪ হাজার ৯১৫ টন ডিজেল, ৩ হাজার ৩১৫ টন অকটেন এবং ২ হাজার ৩৬৮ টন পেট্রোল অতিরিক্ত বিক্রি হয়েছে। এক বছর আগে একই সময়ের তুলনায় বর্তমানে ৩৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ অকটেন, ২১ দশমিক ৩২ শতাংশ পেট্রোল এবং ৩৫ দশমিক ৩২ শতাংশ ডিজেলের বিক্রি বেড়েছে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম ৮ দিনে বিপিসির জ্বালানি বিক্রির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ওই ৮ দিনে ১ লাখ ১৯ হাজার ৭৬০ টন ডিজেল (যা দিনে গড়ে ১৪ হাজার ৯৭০ টন), ১০ হাজার ৯৪৭ টন অকটেন (যা দিনে গড়ে ১ হাজার ৩৬৮ টন) এবং ১১ হাজার ৪৮৬ টন পেট্রোল (যা দিনে গড়ে ১ হাজার ৪৩৬ টন) হিসেবে বিক্রি হয়েছে। মাসের ব্যবধানে ১২ দশমিক ৪৩ শতাংশ অকটেন, ১৮ দশমিক ১৫ শতাংশ পেট্রোল এবং ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ ডিজেল বিক্রি বেড়েছে।
বিপিসির তথ্য বলছে, দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদার ৯২ শতাংশ আমদানি করতে হয়। অবশিষ্ট ৮ শতাংশ স্থানীয় উৎস থেকে পাওয়া যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি পণ্য সরবরাহ করে বিপিসি। ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের মধ্যে ৬২ দশমিক ৬৯ শতাংশ ডিজেল, ১৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ ফার্নেস অয়েল, ৬ দশমিক ৩২ শতাংশ পেট্রোল, ৫ দশমিক ৯০ শতাংশ অকটেন, ১ শতাংশ কেরোসিন, ৮ দশমিক ১৯ শতাংশ জেটএ-১ এবং ১ দশমিক ৫৬ শতাংশ অন্য পেট্রোলিয়াম পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে ১৫ লাখ টন ক্রুড পরিশোধন করে ডিজেল-পেট্রোলসহ পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য উৎপাদন পরবর্তী বিপিসিকে সরবরাহ দেয় ইস্টার্ন রিফাইনারি।
ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. শরীফ হাসনাত জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা প্রতি মাসে গড়ে ৫০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ দিই। পাশাপাশি আমরা পেট্রোল উৎপাদন করি। অন্য প্রোডাক্ট বাদে ১৫ হাজার টন পেট্রোল সরবরাহ দিই।’
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ লাখ ১৫ হাজার ৬৫৩ টন অকটেন, ৪ লাখ ৬২ হাজার ৪৭৫ টন পেট্রোল এবং ৪৩ লাখ ৫০ হাজার ৭৫ টন ডিজেল বিক্রি করেছে বিপিসি। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টনের কাছাকাছি পেট্রোল-অকটেন আসে সরকারি গ্যাসক্ষেত্র এবং বেসরকারি ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্টগুলো থেকে।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসের প্রথম আট দিনে দৈনিক গড়ে ১৬ হাজার ৭২০ টন ডিজেল, ১ হাজার ৫৩৯ টন অকটেন এবং ১ হাজার ৬৮৪ টন পেট্রোল বিক্রি হয়েছে। এতে হিসাব করলে দেখা যাবে, বর্তমান চলমান পরিস্থিতিতে মার্চ মাসেই ৫ লাখ টন ডিজেল, সাড়ে ৪ হাজার টন অকটেন এবং ৫ হাজার টনের বেশি পেট্রোলের প্রয়োজন পড়বে।
বিপিসির সদ্য অবসরপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক ও যমুনা অয়েল কোম্পানির সদ্য সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কুদরত-এ ইলাহি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বর্তমানে মানুষ গুজবে গা ভাসিয়েছে। যেভাবে কৃত্রিম মজুতের চেষ্টা চলছে, তাতে সপ্তাহে পাঁচ জাহাজ তেল এনেও সামাল দেওয়া যাবে না।’
বিপিসির তথ্য মোতাবেক, ৯ মার্চ বিপিসির বিপণন কোম্পানিগুলোর মেইন ইনস্টলেশন পয়েন্ট ও ডিপোগুলোতে সাকুল্যে ১ লাখ ৩৪ হাজার টন ডিজেল, ২৪ হাজার ৯৯৬ টন অকটেন, ২০ হাজার ৪৯ টন পেট্রোল, ১৩ হাজার ৮৪৯ টন কেরোসিন, ৬৮ হাজার ৩২০ টন ফার্নেস অয়েল, ১৮ হাজার ৫০ টন জেট ফুয়েল এবং ৪ হাজার ৯০৯ টন মেরিন ফুয়েল মজুত ছিল। এর মধ্যে ১০ শতাংশ ডেড স্টক (সরবরাহ অযোগ্য) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে সোমবার সকালে ২৭ হাজার ২০৪ টন ডিজেল নিয়ে ‘এমটি জিউ চি’ চট্টগ্রামে আসার পর খালাস করেছে। মঙ্গলবার ২৭ হাজার টন ডিজেল নিয়ে সিঙ্গাপুর থেকে আরেকটি জাহাজ ‘এমটি লিয়ান হুয়ান হু’ এবং ৩০ হাজার টন ডিজেল নিয়ে মালয়েশিয়া থেকে ‘এসপিটি থেমিস’ চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছেছে।
বিপিসির বাণিজ্য ও অপারেশন বিভাগে সোমবার দায়িত্ব নিয়েছেন অর্থ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মোরশেদ হোসাইন আজাদ। দায়িত্ব নেওয়ার পর কথা হলে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। মানুষের মধ্যে বদ্ধমূল ধারণা দেশেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে। যারা এ ব্যবসায় যুক্ত না তারাও জ্বালানির কৃত্রিম মজুত করছে। এটি একটি প্যানিক। এখন যতটুকু না ব্যবহার হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি কিনে অনেকে মজুত করছে। সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখার জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। প্যানিক কেটে গেলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও