আজ
|| ২৭শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১৪ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ৯ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের চেয়েও বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে ভোজ্যতেল
প্রকাশের তারিখঃ ১৫ মার্চ, ২০২৬
প্রভাত অর্থনীতি: দেশের কোনো কোনো জায়গায় সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের (এমআরপি) চেয়েও বেশি দরে ভোজ্যতেল বিক্রি হচ্ছে। পবিত্র রমজান মাসের মাঝামাঝি থেকেই এমন পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। শুধু তা–ই নয়, কোনো কোনো জায়গায় পাঁচ লিটারের বোতলের ভোজ্যতেলই পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কেউ কেউ এক বোতলের বেশি বিক্রি করছেন না ভোজ্যতেল।
খুচরা বাজারে লিটারে ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি দামে সয়াবিন তেল কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। স্বপ্ন, মীনা বাজারের মতো চেইন শপগুলোতে লেখা রয়েছে, ভোজ্যতেলের মজুত সীমিত এবং এক বোতলের বেশি বিক্রি করা হবে না।
এক লিটারের সয়াবিন তেলের বোতলের এমআরপি ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকা। আর পাঁচ লিটারের এমআরপি ৯২০ থেকে ৯৫৫ টাকা। গত ৭ ডিসেম্বর থেকে এ দর চলছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, গত এক সপ্তাহে পাঁচ লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেলের সর্বনিম্ন দাম ৩০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৯৫০–৯৫৫ টাকায়। খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে বেড়েছে ৭ থেকে ১০ টাকা। বিক্রি হচ্ছে প্রতি লিটার ১৮৫–১৯৩ টাকা দরে। অন্যদিকে খোলা পাম তেলের দাম বেড়েছে ৬ থেকে ১৩ টাকা, বিক্রি হচ্ছে ১৬৩–১৬৮ টাকা দরে।
ঢাকার নিউ ইস্কাটনে দিলু রোডের গলিতে ১২টি বড় আকারের মুদিদোকান রয়েছে। রমিজ মোল্লা নামের দোকানদার বলেন, ‘ডিলারদের কাছ থেকে আমরা তেল পাচ্ছি না। তাঁদের কাছ থেকে আমাদেরই কিনতে হচ্ছে এমআরপি দরে।’ তিনি বলেন, ‘তেল না থাকলে কাস্টমাররা অন্য দোকানে চলে যান বলে কম লাভ হলেও তেল রাখতে হচ্ছে।’ তাঁর প্রশ্ন, ‘এক বোতল তেল বিক্রি করে ৫ থেকে ১০ টাকা লাভ না থাকলে পোষাবে?’
সোহাগ মিয়া নামের এক ক্রেতাকে রমিজ মোল্লার সঙ্গে ঝগড়া করতেও দেখা গেছে। তিনি বলছিলেন, ‘ছোট-বড় সব ব্যবসায়ীই এক। কোনো না কোনো উসিলায় খালি কীভাবে পাবলিকের গলা কাটা যায়।’
তবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির এমআরপির চেয়ে বেশি দামে বিক্রিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উল্লেখ করলেন। সিলেট এলাকার কিছু বাজার ঘোরার চিত্র তুলে ধরে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আপনি যে উদাহরণ দিলেন, তা সারা দেশের সাধারণ চিত্র নয়। সিলেটের প্রান্তিক এলাকায় আমি এমআরপি দরেই ভোজ্যতেল বিক্রি হতে দেখেছি।
দিলু রোডের গলির এক পাশে চেইন শপ স্বপ্ন, আরেক পাশে মীনা বাজার। উভয়টিতেই গিয়ে দেখা যায়, লেখা রয়েছে ‘স্টক সীমিত। সকল গ্রাহকের সয়াবিন তেল কেনার অধিকার নিশ্চিত করতে সাময়িকভাবে প্রতি গ্রাহক সর্বোচ্চ ১ পিস (বোতল) তেল কিনতে পারবেন।’ তবে এমআরপির চেয়ে বেশি দাম রাখা হচ্ছে না এসব শপে।
দিলু রোড থেকে ঢাকার কারওয়ান বাজারে বিসমিল্লাহ ট্রেডিংয়ে গিয়ে দেখা যায়, এমআরপি দরেই ভোজ্যতেল বিক্রি হচ্ছে। তবে সরবরাহের ঘাটতি রয়েছে। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ফ্রেশ ব্র্যান্ডের ভোজ্যতেল ছাড়া এ দোকানে কোনো ভোজ্যতেল নেই। ম্যানেজার আবদুর রহমান বলেন, ‘রূপচাঁদাসহ সব কোম্পানির মালই চাচ্ছি। কিন্তু কেউ দিতে পারছে না। ফ্রেশ পেয়েছি, সেটাই বিক্রি করছি।’
সরকারের পক্ষ থেকে ভোজ্যতেলের সার্বিক সরবরাহ পর্যালোচনা বৈঠক হয়েছে ৯ মার্চ। বাণিজ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে ভোজ্যতেল পরিশোধন কারখানার মালিকেরাও উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) ওই বৈঠকে ভোজ্যতেলের সরবরাহ ও দাম পরিস্থিতি নিয়ে একটি উপস্থাপনা তুলে ধরে। এতে ভোজ্যতেলের সরবরাহ ঘাটতির কথা উল্লেখ রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে বলে তাঁরা সরকারের কাছে ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয়ের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু সরকার তাতে কর্ণপাত করছে না।
বৈঠকে জানানো হয়, বর্তমানে সাতটি পরিশোধন কারখানা ভোজ্যতেল ব্যবসায়ে জড়িত। এগুলো হচ্ছে মেঘনা গ্রুপ, টি কে গ্রুপ, সিটি এডিবল অয়েল, বাংলাদেশ এডিবল অয়েল, বসুন্ধরা মাল্টি ফুড প্রোডাক্টস, স্মাইল ফুড প্রোডাক্টস ও মীর বনস্পতি প্রোডাক্টস। বৈঠকে জানানো হয়, পরিশোধিত ও অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেলের মজুত রয়েছে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৯ টন। সাতটির মধ্যে চার কারখানার ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছে ৫৫ হাজার ৫০০ টন এবং চার কারখানার ভোজ্যতেল পাইপলাইনে রয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ৩৫৩ টন। কারখানাগুলো প্রতিদিন ৯ হাজার ৮৮ টন করে ভোজ্যতেল বাজারে ছাড়ছে এবং ৯ মার্চ পর্যন্ত ১৫ দিনে সরবরাহ করেছে ৫৭ হাজার ৬৪৪ টন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী দেশে ভোজ্যতেলের বার্ষিক চাহিদা ২৪ থেকে ২৫ লাখ টন। স্থানীয়ভাবে শর্ষে ও রাইস ব্র্যান মিলে ভোজ্যতেল উৎপাদন হয় চার লাখ টন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে বলে তাঁরা সরকারের কাছে ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয়ের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু সরকার তাতে কর্ণপাত করছে না। দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী কোম্পানির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে বলেন, তাঁরা তেল সরবরাহ করছেন। বাজারে সংকট থাকার কথা নয়। তবে ভোজ্যতেলের আমদানি যথেষ্ট নয়।
এদিকে গত সপ্তাহে বাণিজ্যমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করার বিষয়ে বিটিটিসি জানিয়েছে, এক মাস আগের তুলনায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের ফ্রেইট অন বোর্ড (এফওবি) অর্থাৎ রপ্তানিকারক দেশের বন্দরে জাহাজে তুলে দেওয়া পর্যন্ত মূল্য ৬ শতাংশ কমেছে। গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম ছিল প্রতি টন ১ হাজার ৮৩ মার্কিন ডলার, যা আগের সপ্তাহে ছিল ১ হাজার ১১৪ ডলার।
সার্বিক চিত্র তুলে ধরলে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, ভোজ্যতেল নিয়ে এবার যেটা হচ্ছে, তা আসলে সরকারের ওপর চাপ তৈরির জন্য। এটা যে তাঁদের পুরোনো কৌশল, সরকার তা বুঝলেই হলো।
Copyright © 2026 প্রভাত. All rights reserved.