আজ
|| ২৭শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১৪ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ৯ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
ঢাকা থেকে ১০ ঘণ্টায় যমুনা সেতু
প্রকাশের তারিখঃ ১৯ মার্চ, ২০২৬
প্রভাত রিপোর্ট: এবারের ঈদে অফিস থেকে ছুটি মিলেছে হুট করেই। তত দিনে বাস-ট্রেনের টিকিট বিক্রি শেষ। পাব না ভেবেই অনলাইনে ঢুঁ দিই। বিস্ময়করভাবে কপালগুণে বাসের টিকিট পেয়ে যাই। যাত্রা ১৮ মার্চ (বুধবার) রাত ১০টায়। বাস ছাড়বে ঢাকার শ্যামলী থেকে। গন্তব্য উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁও। গতকাল বুধবার সন্ধ্যা থেকে ঢাকায় তুমুল ঝড়বৃষ্টি। কালবৈশাখী। এর মধ্যে পথে নামতে হবে ভেবে মনটা কেমন যেন করছিল। তবে মনকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম, একবার বাসে উঠে গেলে আরামে চলে যাওয়া যাবে। খবরে দেখছি, ‘পথে যানজট নেই। এবার ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন।’
ঝড়বৃষ্টির দমক একটু কমে এলে বাসা থেকে বের হলাম। রিকশায় লাগেজ তুলে শ্যামলী গেলাম। তখন ঘড়ির কাঁটা রাত ১০টা ছুঁই ছুঁই। দেখি, বাস প্রায় ছেড়েই দিচ্ছে। ঈদের আগে সময় মেনে বাস ছাড়ছে, এটা অবাক করা ঘটনা। যা-ই হোক, তাড়াহুড়ো করে বাসে চড়ে বসলাম। রাত ১০টা ১০ মিনিটে বাস শ্যামলী থেকে ছেড়ে দিল। এসি বাস। মান ভালো, সেবাও ভালো। আরামদায়ক পরিবেশ। যদিও টিকিটের দাম প্রায় দ্বিগুণ নিয়েছে। অবশ্য প্রতি ঈদেই নেয়। এবার শুনলাম, কোথাও নাকি বাসভাড়া বেশি নিচ্ছে না। টিকিট কাটতে গিয়ে বুঝেছি, এটা পুরোটাই গালগল্প। বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই।
বাস ছাড়তেই শুরু হলো আরেক দফা তুমুল ঝড়, সঙ্গে বৃষ্টিও। ভেজা পথে চালক তুলনামূলক কম গতিতে, সাবধানে চালাচ্ছেন। হেমায়েতপুর পার হইনি তখনো, সুপারভাইজার করুণ স্বরে বললেন, ‘ভাই, পথে অনেক জ্যাম শুরু হয়ে গেছে। কী যে হয়!’ শুনেই নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার উচ্ছ্বাস মুহূর্তে চুপসে গেল। বললাম, ‘কোথায় জ্যাম?’ উত্তরে বললেন, ‘নবীনগরের পর থেকেই। যমুনা সেতুর আগে পর্যন্ত।’ এ কথা শুনে কীই-বা বলার থাকে!
নবীনগরে আসার পর দেখলাম, পথে গাড়ির সারি বেশ লম্বা। বাস, মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার—সব নবীনগর হয়ে বাইপাইল, চন্দ্রার পথে। কেউ কেউ ছোট পিকআপে চেপে বাড়ির পথ ধরেছেন। ঢাকার ভেতরে চলাচল করা বহু বাস যাত্রী নিয়ে উত্তরের পথে যেতে দেখলাম।
আমার বাসের চালক বুদ্ধি করে বাইপাইলের পথে না গিয়ে মানিকগঞ্জের পথ ধরলেন। যানজট এড়াতে তিনি সেই পথ দিয়ে গিয়ে টাঙ্গাইলে উঠবেন। এতে অন্তত বাইপাইল, চন্দ্রা আর কালিয়াকৈরের একাংশ এড়িয়ে যাওয়া যাবে। বলে রাখি, ততক্ষণে ঘড়ির কাঁটা রাত ১২টা ছুঁয়েছে। ভেতরের পথে রাস্তা সরু। তার ওপর বৃষ্টিতে ভেজা। সাবধানে বাস চলছে। কিন্তু টাঙ্গাইলের কাছাকাছি পৌঁছে থমকে গেল। দূরপাল্লার বাসসহ বহু গাড়ি আমাদের মতোই সেই পথে এসেছে। সেখানে যানজট পিছু ছাড়েনি। এর মাঝে পথেই সাহ্রি করেছেন যাত্রীরা। থেমে থেমে যখন ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে বাস উঠল, তখন পুবের আকাশে সুয্যিমামা উঁকি দিচ্ছে।
এরপর যমুনা সেতুর টোল প্লাজা অবধি বাস আর নড়েই না। সারি সারি যানবাহন পথে থমকে দাঁড়িয়ে আছে। ঘড়ির কাঁটা নিজ গতিতে ছুটছে, আর আমরা আটকে আছি একই জায়গায়। এর মাঝে দেখলাম, উল্টো লেন ধরে উত্তরের পথে শাঁই শাঁই করে ছুটে চলেছে বাস, যাত্রীসহ পিকআপ।
আফসোস হচ্ছিল, এসব অব্যবস্থাপনা দেখার কি কেউ নেই? আগে ঈদযাত্রায় দেখতাম, মোড়ে মোড়ে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। কোথাও বাস দাঁড়াতে দিচ্ছেন না। এবার তা খুব কমই চোখে পড়ল। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যেখানে–সেখানে বাস দাঁড়াচ্ছে, যাত্রী ওঠানামা করছে, উল্টো লেন ধরে চলছে। ফলাফল—দীর্ঘ যানজট। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে থাকা। সীমাহীন ভোগান্তি। ততক্ষণে সকাল ৭টা ৪৫ বেজে গেল। আমরা ধীরে ধীরে যমুনা সেতুর টোল প্লাজার কাছে এলাম। সেখানেও যানবাহনের জট লেগে আছে। বেশ চওড়া রাস্তা, সেখানে এসে অনেকটাই সরু হয়ে গেছে। আবার টোল দিতে-নিতেও সময় লাগছে। যানবাহনের চাপও বেশি। সব মিলিয়ে ভজকট অবস্থা। সকাল ৮টা নাগাদ টোল দিয়ে বাস উঠে পড়ল উত্তরের প্রবেশমুখ যমুনা সেতুতে। রওনা দিয়েছিলাম রাত ১০টায়। অর্থাৎ ১০ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। ঢাকা থেকে টানা এলে যমুনা সেতু অবধি আসতে ৪ থেকে সাড়ে ৪ ঘণ্টা লাগার কথা। সেখানে লাগল পাক্কা ১০ ঘণ্টা।
যমুনা পেরিয়ে বাসে বসেই মুঠোফোনে এই লেখা লিখেছি। ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁও যেতে সচরাচর ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা সময় লাগে। এবার ঈদে টাঙ্গাইল পেরোতেই ১০ ঘণ্টা চলে গেল। বাকি পথটুকু পেরোতে আরও কত সময় লাগবে, জানি না।
বাসে বসেই ফেসবুকে ঢুঁ দিতে দেখি, পরিচিতজন রওশন জামাল মিলন ঈদযাত্রার ভোগান্তি নিয়ে একটা পোস্ট দিয়েছেন। বেসরকারি চাকরিজীবী মিলন ঢাকার আজমপুর থেকে রাজশাহী যাচ্ছেন। তিনি জানালেন, গত রাতে চন্দ্রা থেকে তাঁর বাসে ওঠার কথা ছিল ১১টায়। সেই বাস ছেড়েছে আজ ভোর ৫টায়। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে মুঠোফোনে কথা হওয়ার সময়ও তিনি সিরাজগঞ্জের হাটিকুমড়ুল এলাকায় যানজটে আটকে ছিলেন। মিলন বলেন, ‘রাতে দীর্ঘ সময় ঢাকার পথের বাসগুলো ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তাই বাস পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে। তার ওপর চন্দ্রা-কালিয়াকৈরে টানা যানজট। পরিবার নিয়ে যাঁরা বাড়ির পথে আছেন, তাঁদের ভোগান্তির শেষ নেই।’
যানজটে আটকে থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আরেক পরিচিতজন মোহাম্মদ আলী ফিরোজ। তিনি বলেন, ‘আমরা যাঁরা উত্তরবঙ্গে ঈদযাত্রায় নিয়মিত, তাঁরা জানি, ৮ ঘণ্টার রাস্তা আমাদের পাড়ি দিতে ১৮ থেকে ২২ ঘণ্টা লাগে। কার্যকর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আর লোকাল-টাইপ গাড়ির লাগাম টানা না গেলে, এই দুর্ভোগ কমানো মুশকিল।’
বেসরকারি চাকরিজীবী মোহাম্মদ আলী ফিরোজ গাইবান্ধার বাড়িতে ঈদ করতে যাচ্ছেন। গতকাল রাত সাড়ে ১১টায় তাঁর বাস ঢাকার কল্যাণপুর থেকে ছাড়ে। আজ বেলা ১১টার দিকে তিনি বগুড়া অবধি পৌঁছেছেন বলে জানালেন। তিনি বললেন, যানজটের কারণে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত আসতেই প্রায় ৫ ঘণ্টা লেগেছে। প্রায় প্রতি ঈদে উত্তরের যাত্রীদের এভাবেই পথে সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হয়। তারপরও বলি, সবার ঈদযাত্রা নিরাপদ হোক, নির্বিঘ্ন হোক। দূর হোক যাত্রাপথের সব অব্যবস্থাপনা, ভোগান্তি।
Copyright © 2026 প্রভাত. All rights reserved.