……………….সালেক খোকন……………………..
২৫ মার্চ ১৯৭১। রাতেই পৃথিবীর ইতিহাসের ভয়াবহতম গণহত্যার শিকার হয় স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশের মানুষ। ট্যাংক ও সাঁজোয়া বহর নিয়ে পথে নামে সশস্ত্র পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে কুখ্যাত অভিযানে কালরাতের প্রথম প্রহরে তারা শুরু করে গণহত্যা। রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, পিলখানার ইপিআর ব্যারাক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস, শিক্ষকদের আবাসিক এলাকা, পুরান ঢাকার শাঁখরীবাজারসহ ঢাকা এবং সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে তারা হত্যাযজ্ঞ চালায়। আবার ওই রাতেই গড়ে ওঠে প্রতিরোধ, শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।
কেমন ছিল একাত্তরের ভয়াল সেই কালরাত? তা জানতেই ঢাকায় ওই রাতে পাকিস্তানি সেনাদের নৃশংসতা প্রত্যক্ষ করেছেন এমন কয়েকজনের মুখোমুখি হই। তাদের চোখেই দেখার চেষ্টা করি রক্তাক্ত ২৫ মার্চকে।
রাজারবাগে মানবতা পদদলিত হয়েছিল
কনস্টেবল মো. আবু শামা সামাদ। একাত্তরে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে অস্ত্রাগারের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি বললেন, রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের ভেতরের রক্তাক্ত ইতিহাস। তার ভাষায়, “রাজারবাগে তখন স্পেশাল আর্মড ফোর্সে ছিলেন সাড়ে পাঁচশ’র মতো সদস্য। তারা থাকতেন তৎকালীন চারতলা বিল্ডিংয়ে। নিচতলায় ছিল দুটি অস্ত্রাগার। আড়াইশ থেকে তিনশ সদস্য ছিলেন ইস্ট পাকিস্তান প্রভেনশিয়াল রিজার্ভ ফোর্সে (ইপিপিআরএফ)। চারটি টিনশেড ব্যারাকে থাকতেন এই ফোর্সের সদস্যরা। ডিএসবি, এসবি, বিভিন্ন সোর্স ও গোয়েন্দাদের মাধ্যমে আসছিল নানা খবর। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই রাজারবাগকে সিরিয়াসভাবে টার্গেট করে রেখেছে। কারণ ইস্ট পাকিস্তানের বৃহত্তম পুলিশ লাইনস ছিল রাজারবাগ, যেখানে বাঙালি সদস্য ছিলেন সবচেয়ে বেশি।
সন্ধ্যার ঠিক পরের ঘটনা। তখনও পাকিস্তানের চাঁদতারা পতাকা উড়ছিল। আমরা ‘জয় বাংলা’ ও ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ স্লোগান তুলে ওই পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দিই। রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টা। একটা ওয়্যারলেস মেসেজ আসে ক্যান্টনমেন্ট থেকে ৩৭ ট্রাক সশস্ত্র সেনা ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে। সেন্ট্রিও তখনই পাগলা ঘণ্টি পেটায়।
অস্ত্রাগারে গিয়ে দেখলাম তালা মারা। সেন্ট্রি বলে, ‘হাশেম স্যার (সুবেদার আবুল হাশেম) তালা মাইরা চাবি নিয়া গেছে মফিজ স্যারের বাসায়।’ দৌড়ে গেলাম সেখানে। দেখি একটি ট্রাকের ভেতর মফিজ স্যার পরিবারসহ উঠে গেছেন। তাকে থামাই। অস্ত্রাগারের চাবি চাই। চাপের মুখে একটা অস্ত্রাগারের চাবি দেন।
ওই চাবি নিয়ে একটা অস্ত্রাগারের দরজা খুলে দিই। রাইফেল দিয়ে আরেকটা অস্ত্রাগারের তালার মধ্যে গুলি করেন একজন। তবু তালাটা ভাঙে না। এরপর একটা শাবল দিয়ে ওই তালাটা ভেঙে ফেলি। ভেতরের অস্ত্রগুলো তখন যে যার মতো নিয়ে যায়।
প্যারেড গ্রাউন্ডে একটা গ্রুপ, ১ নম্বর ও ২ নম্বর গেট, মূল ভবনের ছাদ ও বিভিন্ন স্থানে পজিশন নিয়ে অপেক্ষায় থাকি আমরা।
রাত আনুমানিক ১১টা। পাকিস্তানি কনভয়ের ওপর শান্তিনগরে ডন স্কুলের ছাদের ওপর থেকে পুলিশ প্রথম গুলি চালায়। স্বাধীনতার পক্ষে ওটাই ছিল প্রথম বুলেট।
শাহজাহান, আব্দুল হালিম, ওয়্যারলেস অপারেটর মনির, গিয়াসউদ্দিনসহ পজিশনে থাকি মূল ভবনের ছাদে। রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাজারবাগের দিকে ওরা আক্রমণ করে। আমাদের ১০টা গুলির বিপরীতে ওরা জবাব দিয়েছে প্রায় কয়েক হাজার গুলির মাধ্যমে। ওরা ট্যাংক, রকেট লঞ্চার ও হেভি মেশিনগান ব্যবহার করে। অল্প সময়ের ভেতর টিনশেডের ব্যারাকগুলোতে আগুন লেগে যায়। জীবন বাঁচাতে ভেতর থেকে পুলিশ সদস্যরা দৌড়ে বের হওয়ার চেষ্টা করে। তখন পাকিস্তানি সেনারা ব্রাশফায়ার করে নির্মমভাবে তাদের হত্যা করে।
ফজরের আজান দিচ্ছে তখন। আর্মিরা রাজারবাগের ১ ও ২ নম্বর গেট দুটি ট্যাংকের সাহায্যে ভেঙে ভেতরে ঢোকে। আসে ১০টি খালি ট্রাকও। এক থেকে দেড়শ পুলিশের লাশ পড়ে ছিল। ওগুলো ট্রাকে করে ওরা সরিয়ে ফেলে।
ছাদে উঠে টেনেহিঁচড়ে নামায় আমাদের। বেয়নেট দিয়েও খুঁচিয়েছে, অস্ত্র কেড়ে নিয়ে হাত ওপর দিকে তুলে মারতে মারতে নিচে নামিয়েছে। রাস্তায় ফেলে ক্রলিং করায়। নির্দয়ভাবে পেটায়ও।
দেখলাম, একটা ময়লার ড্রেনে পড়ে আছে আমাদের ক্যান্টিন বয়। বয়স চৌদ্দর মতো। আর্মিরা তাকে সেখান থেকে উঠিয়ে পিচঢালা রাস্তায় এনে আছড়ায়। তার মুখ ফেটে রক্ত বের হতে থাকে। ছেলেটা কাঁপতে কাঁপতে বলছিল, ‘পানি পানি’। এক পাকিস্তানি আর্মি পাশে নিয়ে প্যান্টের জিপার খুলে তার মুখে প্রস্রাব করে দেয়। ওই মুহূর্তটা খুবই খারাপ লাগছিল। একাত্তরে মানবতা প্রতি মুহূর্তে পদদলিত হয়েছে রাজারবাগে!”
ইকবাল হলের মাঠে ডেডবডির নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে ছিল
মুক্তিযোদ্ধা নাজমা শাহীন বেবীর বাবা আবু জায়েদ শিকদার তখন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। থাকতেন ফুলার রোডের ১৭ নম্বর চারতলা বিল্ডিংয়ের একতলায়। এটি ছিল তৎকালীন ইকবাল হলের (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ঠিক সামনেই। ফলে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাদের হত্যাযজ্ঞ তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন খুব কাছ থেকে।
সেদিনের সেই ভয়াল রাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে নাজমা শাহীন শিউরে ওঠেন। তার ভাষায়, “রাত তখন ১০টা হবে। বাড়ির সামনেই মা-খালারা একসঙ্গে গল্প করছে। বান্ধবী ফ্লোরার সঙ্গে আমিও তখন দোলনা আর স্লাইডে খেলছি। দেখলাম, ইকবাল হলের ক্যান্টিনটায় কিছু ছাত্র জড়ো হয়েছে। ওরা আবার দৌড়াদৌড়ি করে চলেও গেল।”
এর মধ্যে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আহমদ শরীফ দৌড়ে এসে বাবাকে ডাকতে থাকেন। তখন ফুলার রোড পাড়ার সেক্রেটারি ছিলেন নাজমার বাবা। কী যেন কথা হলো তাদের। এরপর ইংরেজি বিভাগের মুনিম সাহেবের ছেলেকে তারা পাঠালেন ইকবাল হলে। বার্তা একটাই, কোনও ছাত্র যদি সেখানে থেকে থাকে, তারা যেন তখনই হল ছেড়ে চলে যায়। বাবা বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন।
“বাবা আমাদের বললেন, ‘গুলি শুরু হলে বাতি জ্বালাবে না, জানালা দিয়ে উঁকিও দেবে না কেউ।’ কেননা, আমাদের দুটি বেডরুমের জানালাই ছিল ইকবাল হলের দিকে।”
“মধ্যরাতে প্রচণ্ড গোলাগুলি শুরু হয়। ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। গুলির শব্দে লাফিয়ে উঠি। সবাই ক্রলিং করে মাঝখানের ড্রইংরুমটাতে চলে আসি। সময় দেখার জন্য বাবা একটা ঘড়ি এনে রাখেন। গোলাগুলি তখন বেড়ে যায়। আবার একটু কমেও আসে। এভাবেই চলছিল। পুরো ঘরেই নিস্তব্ধতা। বাবা যে ঘড়িটা এনে রেখেছেন— তার টিকটিক আওয়াজটাও আমাদের বুকের মধ্যে এসে লাগছিল।”
গোলাগুলি তখনও চলছে। ট্রেসার গান দিয়ে ওরা ফায়ার করছে, আকাশে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন রঙের আলো। চারপাশে মানুষের আর্তচিৎকার। এক সময় ফজরের আজান হয়। বাড়ির সবাই ভেবেছিলেন, এখন হয়তো ওরা চলে যাবে।
নাজমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “না, দেখা গেল আজানের পর গোলাগুলির মাত্রা আরও বেড়ে গেছে। দু-একটা বাসায় বাতি জ্বালিয়েছিল কেউ কেউ। তা দেখে আর্মিরা বিল্ডিংয়ের দিকে গুলি ছোড়ে।”
ভোরের আলো ফোটার পর কী দেখলেন তারা? নাজমার কণ্ঠে তখন কান্নার রেশ, “ভোরে দেখতে পাই ইকবাল হলের বিভিন্ন রুমে আগুন জ্বলছে। পাকিস্তানি আর্মিরাও হাঁটাচলা করছে। বুঝে গেলাম একটা ভয়াবহ সময় পার করছি আমরা।”
তিনি বলতে থাকেন, “দেখলাম আইন বিভাগের কামরুদ্দিন হোসাইনকে পাকিস্তানি আর্মি বাড়ি থেকে ইকবাল হলের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ওনাকে নিয়ে কী করে যাচ্ছে দেখছি। হঠাৎ হল থেকে চিৎকার করে ওঠে চিশতী শাহ হেলালুর রহমান। পাকিস্তানি আর্মি তাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক। আমাদের বাড়ির দিকে মুখ করে চিৎকার করে তিনি বলেন, ‘রোজী-বেবি আমাকে বাঁচাও’।”
কিন্তু তখন কিছুই করার ছিল না। পরে চিশতী ভাইয়ের আর কোনও খবর পাওয়া যায়নি। শোনা যায়, অনেকগুলো ডেডবডি নীলক্ষেত পেট্রোল পাম্পের কাছে আর্মিরা জ্বালিয়ে দিয়েছিল। চিশতী ভাইয়ের কথা মনে হলে আজও শিউরে ওঠেন নাজমা।
সকালে অন্যান্য ফ্ল্যাটের সবাই একত্রিত হন। দোতলায় থাকতেন উর্দু বিভাগের অধ্যাপক ড. নাগবি। ধারণা ছিল পাকিস্তানি আর্মি এলে হয়তো নন-বেঙ্গলি বাড়িতে ঢুকবে না। এদিকে পাকিস্তানি আর্মিরা জিপ নিয়ে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল সেন্টারের ডা. মোর্তজাকে তুলে নিয়ে যায়। ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় ব্রিটিশ কাউন্সিলেও আগুন ধরিয়ে দেয়।
গোলাগুলি চলছিল থেমে থেমে। পরদিন সকালে কারফিউ ভাঙলে বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন, এখানে আর থাকা যাবে না। ফুলার রোডের বাসা থেকে বের হয়ে পলাশীর দিকে যাওয়ার সময় নাজমা শাহীন যে দৃশ্য দেখেছিলেন, তা কোনোদিন ভুলবার নয়।
“দেখি অনেকগুলো ডেডবডি স্তূপ করে মাঠের ভেতর ফেলে রাখা হয়েছে। কতগুলো ডেডবডির নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে গেছে। বেয়নেট চার্জ করে মারা হয়েছিল তাদের। এ দৃশ্য দেখে বুকের ভেতরটা কেঁদে ওঠে। একটা রিকশা পেয়ে আমরা দ্রুত শেখ সাহেব বাজারের দিকে চলে যাই।”
জগন্নাথ হলের পরিস্থিতি ছিল বিভীষিকাময়
রবীন্দ্র মোহন দাস ছিলেন জগন্নাথ হলের সাবেক সিনিয়র অফিস অ্যাটেনটেন্ড। কথা হয় তার সঙ্গে। বীভৎস ওই রাতের কথা তিনি বললেন এভাবে, “রাতে ঘুমাতে গেলে শুনতে পাই পাথরের ওপর দিয়ে খচখচ করে কারও হাঁটার শব্দ। দেয়ালের ওপরে উঠে একটু মাথা তুলে দেখলাম— জগন্নাথ হল চারদিক থেকে ঘেরাও করছে পাকিস্তানি আর্মিরা। হলের মাঠের পাশের দেয়াল ভাঙা ছিল। ওই পাশ দিয়েও আর্মি ঢুকলো। পরে ওপরের দিকে সার্চলাইট জ্বালায়। অতঃপর ব্ল্যাকআউট করে শুরু করলো গুলি। এরপরই মা…রে… বাবা…রে, বাঁচা… রে বাঁচা…রে বলে মানুষ আর্তনাদ করতে লাগলো। সে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি।
আমাদের টিনের যে ঘর ছিল সেখানে আর্মিরা আগুন লাগিয়ে দেয়। সকালবেলা ওরা আমাকেসহ আরও ৩০ জনকে আটক করে হলেরই একটা গোয়ালঘরে রাখলো। গোয়ালঘরের দরজায় রাইফেল দিয়ে দাগ দিয়ে বললো, ‘বাইনচোদ লোক, ইসকো বাহার যায়ে গা তো শ্যুট করকে ফ্যাক দুনগা’।
কিছু সময় পর আর্মি এসে তাগড়া তাগড়া জোয়ান এমন ১৫ জনকে ধরে নিয়ে যায়। তাদের দিয়ে হলের বিভিন্ন প্রান্তে পড়ে থাকা লাশ জড়ো করালো, বর্তমানে হলের শহীদ মিনারের পেছনের গণকবরে। অতঃপর ওই ১৫ জনকে লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে মেরে ফেললো।
আমরা আর ১৬ জন বাকি ছিলাম। এর মধ্যে আমি সবার ছোট। সবার পেছনে একজনের শার্টের পেছন ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছি আর কাঁপছি। এক আর্মি এসে গণনার পর ১৫ জনকে সামনে এগিয়ে দিয়ে আমাকে রাইফেলের বাঁট দিয়ে মেরে দূরে ফেলে দেয়, বুট দিয়ে লাথিও দেয়। এরপর ওই ১৫ জনকে লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে মেরে তারা ওখান থেকে ইউটিসির গেট দিয়ে চলে যায়।
একটা লোক তখন লাশের ভেতর থেকে উঠে হাতের ইশারায় ডাকছে। আমি দেখতে পেয়ে লোকটির কাছে দৌড়ে গেলাম। সে বলে, ‘ভাই, আমাকে একটু জল খাওয়াও।’ আমি হাতের তালুতে জল নিয়ে আসলাম। কিন্তু আসতে আসতেই সব জল আঙুলের ফাঁক দিয়ে পড়ে গেল। এরপর একটা ছোট্ট টিনের কৌটা পেলাম। সেটায় পানি নিয়ে লোকটির মুখে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গেই লোকটি ঢলে পড়ে মারা গেল।
ড. জিসি দেব ও মধুদার লাশও আনা হয়েছিল ওখানে। সব আমার চোখের সামনে দেখা। এসএমলি হাউসের মধ্যে একজন হোম টিউটর থাকতেন। তার নাম অনদ্যপান স্যার। তাকে গেটের ওখানে মেরেছে। আমরা তার রক্তের ওপর দিয়েই হেঁটে বের হয়েছি।
এরপর বকশীবাজার গেলাম। ওখানেও গিয়ে দেখি একই অবস্থা। দু-তিনটি লাশ পড়ে আছে। সোয়ারীঘাটে গেলাম, দেখি নদীর কিনারে শত শত লাশ পড়ে আছে।”
শাঁখারীপট্টিতে মানুষ পুড়ে চর্বি গলে পড়ে ছিল
একাত্তরে স্বাধীনতার জন্য ‘বিশ্ববিবেক জাগরণ পদযাত্রা’য় অংশ নিয়েছিলেন কামরুল আমান। তখন তার বাবা চাকরি করতেন ঢাকেশ্বরী কটন মিলে। ওই সুবাদেই থাকতেন নারায়ণগঞ্জে। ছিলেন তোলারাম কলেজের ছাত্র।
তিনি বলেন, “২৫ শে মার্চ রাতের মধ্যেই ঢাকার গণহত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। কারফিউ চলছিল। তা শিথিল হতেই কাউকে কিছু না জানিয়েই রওনা হলাম ঢাকার দিকে। ডেমরার ডিএনডি মাটির বাঁধ। ওই পথেই শত শত লোক পালিয়ে আসছে ঢাকা থেকে। সবার মুখে লোক মরার খবর। মাতুয়াইলে এসে দেখি— রাস্তার ঢালে পড়ে আছে সাত-আটজনের গলা কাটা লাশ। তাদের কখন মারা হয়েছে কেউ জানে না। দেহ তখনও কই মাছের মতো নড়ছিল। এ যেন জিন্দা লাশ! বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় গিয়ে দেখি, একজনের হাতের কবজি বেরিয়ে এসেছে মাটির ওপরে। কার লাশ এটা? কেউ জানে না। খবর পেয়ে ছুটে যাই শাঁখারীপট্টিতে। আহা রে! কী নির্মমভাবে ওরা মানুষ পোড়াইছে। কোর্ট বিল্ডিংয়ের পাশেই শাঁখারীপট্টির প্রবেশমুখ। সেটি বন্ধ করে আগুন দিয়ে দেয় পাকিস্তানি সেনারা। সবাই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কয়েকটি বাড়িতে তখনও আগুন জ্বলছিলো। একটি বাড়িতে পা রাখতেই গা শিউরে ওঠে। মানুষ পুড়ে চর্বি গলে মেঝেতে পড়ে আছে, তাতে পড়েছে আমার পা। এর চেয়ে ভয়াবহ আর মর্মান্তিক দৃশ্য কী হতে পারে!”
পাঁচ দিনে হত্যা করা হয় এক লাখ বাঙালিকে
ওই রাতে পাকিস্তানি সেনারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, ইকবাল হল ও রোকেয়া হলেও গণহত্যা চালায়। বিশ্ববিদ্যালয় কৃর্তপক্ষ ১৯৫ জন শহিদের তালিকা করলেও বিভিন্ন তথ্য বলছে, ওই রাতে সেখানে আড়াইশ থেকে তিনশ জনকে হত্যা করা হয়েছে ৷ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ওয়্যারলেসের সংলাপেও হত্যার এমন সংখ্যার উল্লেখ পাওয়া যায়। জগন্নাথ হলে হত্যার শিকার হন ৪ জন শিক্ষক, ৩৬ জন ছাত্র এবং ২১ জন কর্মচারী ও অতিথি। ৬ জন ছাত্রকে পাকিস্তানি সেনারা কবর খোঁড়ার কাজে লাগায়। এরপরও তারা বাঁচতে পারেনি। ইকবাল হলে ওরা ১১ জন ছাত্রকে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে গুলি করে। এরপর রোকেয়া হলে আগুন ধরিয়ে দিলে ছাত্রীরা হল থেকে দৌড়ে বের হয়ে আসে। তাদের তখন মেশিনগান দিয়ে অবিরাম গুলি করা হয়। অনেককে হত্যা করা হয় বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে। সিডনি মর্নিং হেরাল্ড পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী, ঢাকায় ২৫ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত পাঁচ দিনে পাকিস্তানি বাহিনী হত্যা করেছিল এক লাখ বাঙালিকে।
একাত্তরের পঁচিশ মার্চে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুধু একটি রাতের হত্যাকাণ্ডই ছিল না, এটা ছিল কলঙ্কজনক ইতিহাসে এক জঘন্যতম ঘটনার সূচনামাত্র। পরবর্তী ৯ মাসে বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার লক্ষে ৩০ লাখ নিরপরাধ নারী-পুরুষ-শিশুকে হত্যার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা পূর্ণতা দিয়েছিল গণহত্যার ওই বর্বর ইতিহাসকে। এখনও পর্যন্ত জঘন্যতম ওই গণহত্যার জন্য পাকিস্তান ক্ষমা চায়নি, বিচার করেনি তৎকালীন একজন জেনারেলেরও। মেলেনি জেনোসাইড বা গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও।
লেখক: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক (সৌজন্যে : বাংলা ট্রিবিউন)
(এই বিভাগের প্রতিটি লেখা লেখকের বাক স্বাধীনতার প্রতিফলন। এ লেখার দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব। এর জন্য পত্রিকা কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়। )