……………..শহিদুল ইসলাম………………
২৫ মার্চ জুবেরি ভবনে টেলিভিশনে রাতের শেষ সংবাদ শুনে শিক্ষকরা সবাই নিজের বাড়িতে চলে যান। অজিত শুভরাত্রি জানিয়ে নিজের ঘরে ঢুকলো। সামান্য হলেও সবার মনে যেন একটু স্বস্তির ভাব। আমিও প্রতিত্তর জানিয়ে পাশের কক্ষে ঢুকেই বিছানার কোলে নিজকে ছেড়ে দিলাম। সারাদিনের টেনশনের পর ঘুম আসতে বিলম্ব হল না। আমি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। নিবিড় ঘুমে রাত প্রায় শেষের প্রহরে। হঠাৎ দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কায় ঘুম ভেঙে গেল। তড়িঘড়ি করে উঠে দরজা খুলতেই দেখি— তিনজন পাকিস্তানি সেনা রাইফেল উঁচু করে রয়েছে। একজন আমার পাশ দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়লো। বাইরের দু’জন চিৎকার করে উঠলো,‘নিকালো শালা!’ পেছন থেকে এক লাথি। ছিটকে বাইরে বারান্দা হুমড়ি খেয়ে পড়ি। একজন সেপাই আমাকে ধরে দাঁড় করিয়ে ধরে থাকলো। দেখি, তাদের সঙ্গে গণিতের মুজিবুর রহমান এবং অজিত। অজিত কুমার ঘোষ অর্থনীতির সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত প্রভাষক। আমরা তিনজনই জুবেরি ভবনে ছিলাম। তিনটি রাইফেলের নলের প্রহরায় আমাদের নিয়ে চললো। গোল চত্বরের কাছে এসে আমি ওদের বলি, ‘আমার চশমাটা ফেলে এসেছি।’ শুনে একজন বললো, ‘তুমি চোখে দেখতে পাও না?’ বলে আমার চোখের সামনে আঙ্গুল তুলে পরীক্ষা করলো। শেষে একজন রাইফেলের মুখে আমাকে ঘরে ফিরিয়ে আনলো। বেড-সাইড টেবিলের ওপর থেকে চশমা পরে আবার তার সঙ্গে রওনা দিলাম। প্যারিস রোড ধরে উপাচার্য প্রফেসর সাজ্জাদ হোসায়েনের বাড়ির দিকে নিয়ে চললো। তখনও বেশ অন্ধকার। উপাচার্যের বাস ভবনের দিকে ডানে মোড় নিতেই মুজিবুর রহমান চোস্ত উর্দু ভাষায় বলে উঠলেন, ‘‘মোহম্মদ নামে একজন ভালো মানুষের জন্ম হয়েছিল। তারপর মোহম্মদ নামের যত মানুষের জন্ম হয়েছে, তারা সবাই চোর বদমাস।’
এই শুনে সেপাইরা তাঁকে লাথি দিয়ে ফেলে রাইফেল দিয়ে মারতে লাগলো। আমরা দু’জন ভয়ে গুটিশুটি হয়ে চেয়ে দেখি। এ ছাড়া আমাদের কিছুই করার ছিল না। মুজিবুর রহমান দীর্ঘ দিন করাচি ছিলেন। সেই সুবাদে তিনি চমৎকার উর্দু বলতে পারতেন। আমাদের সবার পরনে লুঙ্গি ও গেঞ্জি। খালি পা।
সাজ্জাদ হোসায়েন উপাচার্য ভবনের বিরাট বাগানে সকালের বসন্তের স্নিগ্ধ হাওয়া খাচ্ছিলেন। পরণে সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি। তাঁর সামনে আমাদের হাজির করে সেপাইরা। তিনি বললেন, ‘‘এঁরা সবাই টিচার।’’ কিছু কথার আদান-প্রদানের পর ফের উল্টো যাত্রা। প্রত্যেককে জুবেরী ভবনের নিজ নিজ কক্ষে ঢুকিয়ে দিয়ে সাবধান করে দিল সবাইকেই, ‘‘ঘর থেকে বের হলেই গুলি!’’
সূর্য তখন আকাশে উঠে পড়েছে। ফেরার সময় ভালোভাবে দেখি, সব চত্বরের বিভিন্ন স্থানে পাকসেনারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বসে আছে। সব ক্যাম্পাস তাদের দখলে।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সকালের প্রয়োজনীয় কাজের চাপ বাড়তে থাকে। পেছনের কাঁঠাল তলায় এক প্লাটুন সেনা নিজেদের মধ্যে গল্প করছে। সব ভয়কে জয় করে পেছনের দরজা খুলে তাদের ডাকি। দু’জন এগিয়ে এলে ভাঙা ভাঙা উর্দু বাংলার সঙ্গে অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে তাদের বোঝাতে সক্ষম হই যে, আমাদের ওয়াশরুম ও খাওয়া-দাওয়ার প্রয়োজন আছে। দু’জন তখন ঘুরে এসে আমার ঘরে ঢুকে চারধার দেখতে লাগলো।
জিজ্ঞেস করে আমরা কোথায় খাই। ওদেরকে নিয়ে বারান্দা এসে সামনের ব্লকের একটা ঘর দেখিয়ে বলি ‘‘ওটাই আমাদের খাবার ঘর।’’ ওরা আমাকে রেডি হতে বলে আবার পেছনের কাঁঠাল তলায় চলে গেল।
সকালের সব কাজ শেষ করে লুঙ্গি গামছা তারের ওপর নেড়ে দিয়ে তাদের বলি যে, আমার হয়ে গেছে। দু’জন আবার ঘুরে এসে রাইফেলের সামনে আমাকে বের করলো। পাশের ঘর থেকে অজিতকে সঙ্গে নিয়ে বারান্দা দিয়ে খাবার ঘরের দিকে এগোতে থাকি। মুজিবুর রহমানকে ডেকে বের করলাম। তিনজন একত্রে খাবার ঘরের দরজা ধাক্কা দিলাম। কারও সাড়াশব্দ পেলাম না। তখন আমি জয়নালের নাম ধরে ডাকলে সে দরজা খুললো। একজন সেপাই তাকে এক চড় কষিয়ে দিলো। বলল যে, এর আগে সে দরজা খোলেনি কেন? জয়নাল কেঁদেই অস্থির। আমি তাদের বুঝিয়ে শান্ত করি। তারা আমাদের জন্য নাস্তা বানাতে বললো। আমরা তিনজন শুকনো মুখে টেবিলে বসলাম। পরোটা ও ডিম ভাজবে। পাশের দেয়াল ঘেঁসে ওরা দাঁড়িয়ে রইলো। অনেক কথার মাঝে একজন প্রশ্ন করলো, ‘‘তোমরা কি সবাই মুসলমান?’’ হঠাৎ আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল ‘হ্যা।’ অজিতের সে সময়ের চেহারার কথা আজও চোখের সামনে ভাসছে। ভয়ে আমাদের শরীরও ঠান্ডা হয়ে এল। তারা বলতে বললো, ‘‘একমাস আগে আমাদের পূর্ব পাকিস্তানে এনেছে হিন্দুদের মারার জন্য। আমরা তো হিন্দুদের খুঁজে পাই না। সবাই মুসলমান। হিন্দু কোথায়?’’ তাদের মনের দুঃখটা স্পষ্ট বোঝা গেল।
নাস্তার পর রাইফেলের সামনে আমাদের ঘরে ঢুকিয়ে দিলো এবং সাবধান করে দিল যে, বাইরে বের হলেই গুলি করা হবে। এভাবেই দুপুরের খাবার খেলাম। সেপাইরা মাঝেমধ্যেই আমাদের ঘরে আসছিল। এটা সেটা নাড়াচাড়া করছিল। অজিতের ঘর থেকে তার রেডিওটা নিয়ে যায়। আর ফেরত দেয়নি। বেলা দু’টোর খবর শোনার জন্য আমার নতুন কেনা ট্র্যানজিস্টারটা নিয়ে গেল। ওটা আর ফেরত পাবার আশা করিনি। কিন্ত খবর শুনে আমারটা দিয়ে গেল। একফাঁকে আমি অজিতকে বলে আসি যে, ওরা যদি তোমার নাম জিজ্ঞেস করে বলবে ‘ওয়াজেদ গাউস।’ বেলুচিস্তানের জনৈক নেতার নামের পেছনের গাউস শব্দটি ছিল। ওরা অবশ্য কারও নাম জিজ্ঞেস করেনি।
এভাবেই সারাটা দিন কেটে গেল। সূর্য ধীরে পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়তে লাগলো। সন্ধ্যার আলো আঁধারির মাঝে ওরা আমাদের সাবধান করে দিলো যে, ঘর থেকে যেন বের না হই। নিস্তব্ধ চারদিক। সেপাইরা তাদের গাড়িতে চলে গেল। পরে জেনেছিলাম ওদের শিফ্ট পরিবর্তন। নতুন আর একদল আসবে।
এটাই আমাদের একটি বড় সুযোগ মনে হলো। আমি ব্যাগে কিছু কাপড় ও প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস নিয়ে অজিতকে বের করি। সামনের উইংসে মুজিবুর রহমানের ঘরে যাই, তাকে সঙ্গে নেবার জন্য। কিন্ত মুজিবুর রহমান কিছুতেই আমাদের সঙ্গে এলেন না। আমি পুকুরের উত্তর পাড়ে গণিত বিভাগের বন্ধু আফতাবুর রহিমের বাড়িতে উঠি। আর অজিত গিয়ে ওঠে তার স্যার প্রফেসর মোশাররফ হোসেনের বাসায়।
ওদিকে রাজশাহীর পশ্চিমের পুলিশ লাইনের দিক থেকে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। ২৬ তারিখ সন্ধ্যায় সেপাইরা চলে যাওয়ার পর রাতে আর নতুন প্লাটুন আসেনি, ২৭ মার্চ সকালে তেমনটি শোনা গেল। বাড়ি থেকে শিক্ষকরা বের হয়ে খোঁজ খবর নিতে থাকে। শহরে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। এমন করে দোসরা এপ্রিল পর্যন্ত ক্যাম্পাস ছিল মুক্ত। আমরা বিভাগেও গেছি। বিভিন্ন বিভাগে স্যারদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করেছি। শহরেও সেপাইদের দেখা নাই। তারা ক্যান্টনমেন্টের মধ্যেই আছে। একদিন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের বন্ধু খালেদ হাসান ও বজলুল মোবিন চৌধুরীর সঙ্গে আমি ফলিত পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক আব্দুর রকিব স্যারের কাছে যাই। রেডিও থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করা যায় কিনা, জানতে। উনি এক সময় আর্মিতে ছিলেন। তিনি একটি ছোট্ট পার্টসের নাম বললেন, যেটা নাহলে কোনও সম্প্রচার সম্ভব নয়। তবুও আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবাসটি নিয়ে রেডিওতে গেলাম। রেডিও’র লোকজন একই কথা বললেন এবং জানালেন যে, পাকিস্তান আর্মি সেটা নিয়ে গেছে। ব্যর্থ আমরা ফিরে আসি।
৩ মার্চ খুব কাকডাকা ভোরে আফতাবুর রহিমের দরজায় ধাক্কা। আমরা ভীত হয়ে পড়ি। ফজলুল হালিম চৌধুরীর বাসার ছেলেটার গলা শুনে দরজা খুলতেই সে বলল, ‘‘স্যার আপনাদের ডাকছে।’’
আমরা কালবিলম্ব না করে স্যারের বাসায় যাই। দেখি, মোশাররফ হোসেন ও জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী স্যার বসে আছেন।
চৌধুরী স্যার জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘কিছু শুনেছো?’’
আমরা একসঙ্গে বলে উঠলাম, ‘‘না, স্যার।’’
স্যার বললেন, ‘‘আজ ভোরে পাকিস্তান আর্মি শহরের ক’জন হিন্দু ভদ্রলোককে হত্যা করেছে।’’
শহরের আইনজীবী সালাম সাহেবসহ আরও কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পেরেছেন যে, অ্যাডভোকেট বীরেন সরকার ও সুরেশ পাঁড়েকে হত্যা করেছে। সকাল হয়ে গেছে। স্যারেরা আমাদের বললেন, যে করেই হোক আজ দিনের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হিন্দু শিক্ষক ও তাঁদের পরিবারদের ভারতে পৌঁছে দিতে হবে।
আফতাবুর রহিম ও আমি বের হয়ে পড়লাম। ঠিক হলো যে, সবাইকে পূর্ব পাড়ার সুব্রত মজুমদারের বাসায় তুলতে হবে। বিনোদপুরের আমাদের ঘনিষ্ঠ ক’জন রিকশাওয়ালা আমাদের ভারতে পৌঁছে দেবে।
প্রথমেই আমি সুখরঞ্জন সমাদ্দারের বাড়িতে যাই। তিনি কিছুতেই আমাদের সঙ্গে যাবেন না। তিনি বলেন, ‘‘আমাকে কেন মারবে? আমি তো কারও সাতে-পাঁচে থাকি না।’’ কথাটি শতভাগ সত্যি। কিন্তু ১৩ এপ্রিল পাকিস্তান আর্মি ক্যাম্পাসে ঢুকেই তাঁকে তুলে নিয়ে কাজলা পুকুর পাড়ে হত্যা করে।
আমি একটি রিকশা ধরে শহরের দিকে রওনা দিলাম। দেখি, দলে দলে মানুষ রিকশা, ঘোড়ার গাড়ি করে শহর থেকে গ্রামের দিকে পালাচ্ছেন। পরিচিত জনের দেখা হলে, তারা শহরে যেতে বারণ করেন। কিন্ত শহরের কয়েকজন শিক্ষককে আনতে হবে। অরুণ বসাক, ননীভূষণ ফৌজদারকে পেলাম না। তারা আগেই বের হয়ে গেছে। বড় মসজিদের পাশ দিয়ে পদ্মার দিকে কয়েকটি বাড়ির পরই সনৎকুমার সাহা থাকেন। গিয়ে দেখি, মাসিমাসহ সবাই তৈরি হয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। দু’টো রিকশায় তাঁদের নিয়ে পূর্ব পাড়ার সুব্রতদার বাড়িতে উঠি। খুব বেশি শিক্ষক পেলাম না। সবাই যে যার মতো পালিয়েছেন। বন্ধু ননী ভূষণ ফৌজদার নিজেই উপস্থিত হলো। রিকশাওয়ালারা নিচে অপেক্ষা করছিল। মাজদার, মধু, আলী ও আরও দু’জন।
আমাদের দলে ছিলাম সুব্রত মজুমদার, ছোড়দি ও অন্য দুই দিদির ছেলেমেয়ে, সনৎকুমার সাহা ও মা, কাকি মা, ভাই বোন, গোলাম মুরশিদ ও ভাবি এলিজা ও তাঁদের প্রথম কন্যা অমিতা, তার জন্মের একমাসও পার হয়নি, এলিজার ছোটবোন মিনার, অজিত ও আমি। সদ্য বিবাহিত ননীভূষণ ফৌজদার নেমে কিছুক্ষণ আগে বের হয়ে যায়। তার আর খোঁজ পাইনি। স্বাধীনতার পর শুনেছিলাম, অন্যদিক দিয়ে পদ্মা পার হয়ে ভারতে যায়, সেখান থেকে লন্ডন। পদ্মার চড়ে তাদের সব কিছু চুরি হয়ে যায়।
আমরা দেড়টার দিকে রওনা দিলাম। বিনোদপুর বাজারের মধ্য দিয়ে রিকশা পদ্মার দিকে এগিয়ে চললো। মধু বারবার বলছিলো, ওদের বাড়িতে একটু বসতে। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য, তাড়াতাড়ি পদ্মা পার হওয়া। আগে একবার এসে নৌকা ঠিক করে গিয়েছিলাম। সে পদ্মা আর নেই। পাড় থেকে নেমে অনেকটা হেঁটে নদীর তীরে নৌকায় উঠতে হবে। নেমে আমরা হেঁটে নৌকার দিকে যাচ্ছি, ঠিক তখনই ক্যাডেট কলেজের দিক থেকে দূ’টি যুদ্ধ বিমান উড়ে আসছে। আমাদের মাথার ওপর দিয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেল পশ্চিমে। মধুরা সব জানে। তাই সে আমাদের দ্রুত পেছনের দিকে নিয়ে এলো এবং তার বাড়িতে কিছুক্ষণ বসতে বললো। বিমান দু’টি তিন-চারটি চক্কর দিয়ে স্ট্র্যাপিং করে বোমা মারতে থাকে। চড়ে তখন অনেকেই মারা পড়েছিল। এর মধ্যেই মধুর বৌ রুটি ও মুরগীর ঝোলের বাটি এগিয়ে দিলো। যে যেটুকুন পারলাম খেয়ে নিলাম। তারপর আবার যাত্রা শুরু। এবার আমরা নৌকায় উঠে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওপারে গিয়ে নামলাম।
দূরে সীমান্তের সঙ্গে ভারতের তীর মিশে আছে। সামনে বিস্তীর্ণ চড়। কিষানরা কিছুদিন আগেই লাঙ্গল দিয়ে মাটি আলগা করেছিল। মার্চ-এপ্রিলের রৌদ্রে সেগুলো শুকিয়ে পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। কোনও রাস্তা নেই। সেই পাথরের আঘাত এড়িয়ে আমরা ধীর গতিতে ভারতের তীরের দিকে এগোতে থাকি। সে আর এক অভিযান। এলিজার পক্ষে বেশি হাঁটা সম্ভব ছিল না। আমরাই তাঁকে ধরাধরি করে এগোতে থাকি। মাসিমা মোটাসোটা মানুষ। তিনিও ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিলেন। যাদের পায়ে স্যান্ডেল ছিল, তাঁদের পা ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত হয়েছিল। মধুরা চোর-ডাকাতের ভয় করছিল। আমরা যখন ভারতের মাটিতে পা রাখি, তখন সূর্য অস্ত গেলেও রবির লাল আভায় প্রকৃতি অপরূপ সাঁজে সেঁজেছিল। তীরে উঠে মহিলারা ঘাসের ওপর শুয়ে পড়লেন।
মধুর বোনের বাড়ি মাত্র দু’শো মিটার দূরে। ওদের ভাইবোনের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। তারা সবাই এগিয়ে এলেন। ধরাধরি করে সবাইকেই মধুর বোনের বাড়িতে তোলা হলো। ঝকঝকে কাঁসার গ্লাসের পানি খেয়ে সবাই অনেকটাই সুস্থ বোধ করেন।
সন্ধ্যার পরপরই পুটি ও মলা মাছের পানির মতো ঝোল ও মাস কালাইয়ের ডাল দিয়ে ভাত খেলাম। যেন অমৃত। মেয়েরা ঘরের মধ্যে আর আমরা ঘরের দাওয়ায় শুয়ে মুহূর্তেই ঘুমের কোলে ঢলে পড়লাম।
আমার জীবনের এই দিনটি স্মরণীয় দিনগুলোর মধ্যে প্রধান।
(বছরদুয়েক আগে অজিতের মৃত্যুর সংবাদ পাই। ১৯৯৬ সালে হলদিবাড়িতে একটি সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিতে যাওয়ার আগে অজিতের ছোট ভাই জানায় যে, এই লেখাটি মা পড়তে চান। সম্মেলন শেষে সে আমাদের জলপাইগুড়ি নিয়ে যায়। অজিতের মাকে প্রণাম করি। সেখান থেকে টেলিফোনে অজিতের সঙ্গে শেষ কথা বলি। সে তখন দিল্লিতে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। সেদিন আমরা কেউই কান্না ঠেকাতে পারিনি। অজিতের মায়ের চোখ দিয়েও জল ঝরছিল। সঙ্গে হাসান, জানু আপা ও পলির চোখও ভিজে উঠেছিল।)
লেখক: সাবেক অধ্যাপক,রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (সৌজন্যে : বাংলা ট্রিবিউন)
(এই বিভাগের প্রতিটি লেখা লেখকের বাক স্বাধীনতার প্রতিফলন। এ লেখার দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব। এর জন্য পত্রিকা কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়। )