আজ
|| ২৭শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১৪ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ৯ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
তৈরি পোশাক খাতে সবুজ কারখানা প্রতিষ্ঠায় নতুন রেকর্ড বাংলাদেশের
প্রকাশের তারিখঃ ২৯ মার্চ, ২০২৬
প্রভাত রিপোর্ট: তৈরি পোশাক খাতে সবুজ কারখানা প্রতিষ্ঠায় নতুন রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। পরিবেশসম্মত সবুজ কারখানার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন বা লিড সনদ পাওয়া বিশ্বের সেরা ১০০ কারখানার ৫২টি বাংলাদেশে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, পরিবেশবান্ধব বা সবুজ কারখানা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে আলাদা মর্যাদা এনে দিচ্ছে। এসব কারখানায় উৎপাদিত পণ্যে ‘গ্রিন ট্যাগ’ যুক্ত থাকে; যা ক্রেতাদের কাছে পণ্যের পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়ার নিশ্চয়তা দেয়। ফলে বিদেশি ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের মধ্যে আস্থা বাড়ে। পাশাপাশি, এসব কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে ক্রেতাদের সঙ্গে দরকষাকষির সুযোগও বেশি থাকে। উদ্যোক্তাদের মতে, সবুজ কারখানা শুধু পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা রাখছে না, বরং দেশের পোশাক খাতের ইতিবাচক ব্র্যান্ড ইমেজ গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বিদায়ী ২০২৫ সালে এক বছরে সর্বোচ্চ ৩৮টি কারখানা লিড (এলইইডি) সনদ অর্জন করে সবুজ কারখানার তালিকায় যুক্ত হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
এর ফলে বিশ্বে সবুজ কারখানার সংখ্যায় শীর্ষ অবস্থান আরও দৃঢ় করেছে বাংলাদেশ। বর্তমানে দেশে মোট ২৮০টি লিড সনদপ্রাপ্ত সবুজ কারখানা রয়েছে; যা বিশ্বে সর্বাধিক। এর মধ্যে ১১৮টি প্লাটিনাম এবং ১৪৩টি গোল্ড রেটিং অর্জন করেছে; যা বিশ্বব্যাপী সবুজ শিল্পায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শক্ত অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে।
বিশ্বব্যাপী সর্বোচ্চ স্কোরপ্রাপ্ত শীর্ষ ১০০টি লিড রেটেড কারখানার মধ্যে ৫২টিই বাংলাদেশের; যা পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নে দেশের নেতৃত্বের প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টেকসই উৎপাদন, জ্বালানি দক্ষতা, পানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রে বিনিয়োগের ফলেই এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। রবিবার (২৯ মার্চ) আরও পাঁচটি পোশাক কারখানা নতুন করে পরিবেশবান্ধব সনদ পাওয়ার তথ্য জানিয়েছে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। এর মধ্যে তিনটি গোল্ড এবং দুটি প্লাটিনাম মান অর্জন করেছে।
সংস্থাটি জানায়, ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি) ‘এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন (লিড)’ মানদণ্ডের ভিত্তিতে এসব সনদ দেয়। ইউএসজিবিসির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সবুজ কারখানার এই অগ্রযাত্রা বৈশ্বিকভাবে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করেছে।
এপিক গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং কো. লিমিটেড (ইউনিট-৭)। নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত এই কারখানাটি নতুন কারখানা নির্মাণ ক্যাটাগরিতে ৬৭ পয়েন্ট পেয়ে গোল্ড মান অর্জন করেছে। পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো, জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং দক্ষ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতিষ্ঠানটি এই স্বীকৃতি পেয়েছে।
সুরমা গার্মেন্টস লিমিটেড: ঢাকায় অবস্থিত এ কারখানাটি বিদ্যমান ভবনের পরিবেশবান্ধব পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার জন্য ৭১ পয়েন্ট পেয়ে গোল্ড মান অর্জন করেছে।
নাফা অ্যাপারেলস লিমিটেড-ইউনিট ০২: ঢাকার ধামরাইয়ের জয়পুরায় অবস্থিত এই কারখানাটি নতুন নির্মাণ ক্যাটাগরিতে ৬৫ পয়েন্ট পেয়ে গোল্ড মান অর্জন করেছে। আধুনিক অবকাঠামো এবং জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে প্রতিষ্ঠানটি এই স্বীকৃতি পেয়েছে।
উইন্টার ড্রেস লিমিটেড: সাভারের কালমা ডেইরি ফার্ম এলাকায় অবস্থিত এই কারখানাটি বিদ্যমান ভবনের পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার জন্য ৮৫ পয়েন্ট পেয়ে প্লাটিনাম মান অর্জন করেছে।
মেহের গার্মেন্টস লিমিটেড: চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে অবস্থিত এই কারখানাটি ৮৯ পয়েন্ট পেয়ে প্লাটিনাম মান অর্জন করেছে। জ্বালানি ও পানির দক্ষ ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ের স্বীকৃতি পেয়েছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে একটি মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা নতুন কারখানা নির্মাণের পাশাপাশি পুরনো কারখানাগুলোতেও সবুজ প্রযুক্তি ও জ্বালানি দক্ষতা নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল গণমাধ্যমকে বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এখন পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বিদেশি ক্রেতারা এখন কার্বন নিঃসরণ কমানো, জ্বালানি সাশ্রয় এবং টেকসই উৎপাদনের বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প ইতোমধ্যে সেই চাহিদার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে। এর ফলে বিশ্বে পরিবেশবান্ধব কারখানার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নেতৃত্বের অবস্থানে পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিবেশবান্ধব কারখানার সংখ্যা বাড়ার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে টেকসই উৎপাদনের গুরুত্ব বাড়ায় বাংলাদেশের রফতানি প্রতিযোগিতায় ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একইসঙ্গে জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং পরিবেশগত ঝুঁকি হ্রাসের ক্ষেত্রেও এসব কারখানা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবুজ শিল্পায়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে পরিবেশবান্ধব সনদপ্রাপ্ত কারখানার সংখ্যায় বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যাবে এবং বৈশ্বিক পোশাক শিল্পে টেকসই উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করবে।
Copyright © 2026 প্রভাত. All rights reserved.