• সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫২ অপরাহ্ন

তেল পাম্পে তেলের জন্য অপেক্ষা, যানবাহনের দীর্ঘ লাইন

প্রভাত রিপোর্ট / ৪১ বার
আপডেট : শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬

প্রভাত রিপোর্ট: ইরানে হামলা পাল্টা হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। ইরান যুদ্ধের পর থেকে ধীরে ধীরে সংকট আরও গভীর হচ্ছে। এমন অবস্থায় দেশের পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেলের সরবরাহ ঠিক না থাকায় বিভিন্ন পাম্পে বন্ধ রয়েছে যানবাহনে তেল দেয়া কার্যক্রম। যেসব পাম্পে তেল বিক্রি কার্যক্রম চলমান সেগুলোতেও টানা বেশকিছু দিন ধরে তেল সংগ্রহে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন লেগে থাকছে। কোনোভাবে ভিড় কমছে না পাম্পগুলোতে। শনিবারও সকাল থেকে রাজধানীর জ্বালানি তেল পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে।
শনিবার (৪ এপ্রিল) রাজধানীর বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফুয়েল স্টেশন, আসাদগেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশন ও সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশন ঘুরে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে।
ট্রাস্ট ফুয়েল স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, পাম্পটির সামনে থেকে শুরু করে মহাখালীমুখী সড়কে তেল নিতে আসা যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। যানবাহন চালকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। এছাড়া তীব্র রোদে মোটরসাইকেল চালকরা লাইনে সারিবদ্ধভাবে গাড়ি রেখে ফুটপাতের ওপর ছায়াযুক্ত স্থানে তেলের অপেক্ষা করছেন।
আসাদগেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে শুরু হয়ে জিয়া উদ্যান ঘুরে বিজয় সরণির মেট্রোরেল স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছেছে অপেক্ষারত যানবাহনের লাইন। সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে শুরু হওয়া মোহাম্মদপুর টাউন হলের দিকের সড়কে লম্বা লাইন দেখা গেছে।
তালুকদার ফিলিং স্টেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মোজাম্মেল বলেন, সকাল ৮টার দিকে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি। এখনও তেল নিতে পারিনি। তেল পেতে আর কয় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা লাগবে বা দাঁড়িয়ে থেকে আদৌ তেল পাবো কি না সন্দেহ।
সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনের সামনে অপেক্ষারত মোটরসাইকেলচালক সাগর বলেন, কি আর বলবো ভাই। প্রতিদিন একই পরিস্থিতির মধ্যে পার করতে হচ্ছে। তেল দিচ্ছে অল্প। যে কারণে দুদিন, তিনদিন পরপরই তেল নিতে লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় পার করতে হচ্ছে।
ট্রাস্ট তেল পাম্পের লাইনে কথা হয় অন্য এক মোটরসাইকেলচালক মিনহাজের সঙ্গে। তিনি বলেন, গতকাল তেল নিতে এসেছিলাম। এসে লাইন দেখে তেল না নিয়ে চলে গেছি। ভাবছিলাম বন্ধের দিন তাই ভিড় বেশি আজ এলে অনেকের অফিস খোলা থাকবে। ভিড় কম থাকবে। এজন্য আজ এসেছিলাম। কিন্তু আজও এসে সেই একই অবস্থা দেখছি। এ অবস্থার কোনো পরিবর্তন নেই। কষ্ট হলেও আজ লাইনেই দাঁড়িয়ে আছি। তেল না নিয়ে ফিরতে পারছি না।
বেলা গড়িয়ে দুপুর। বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসা বাইকারদের লাইন ছাড়িয়েছে অ্যারোস্পেস অ্যান্ড এভিয়েশন বিশ্ববিদ্যালয়। তপ্ত রোদে ঘেমে-নেয়ে উঠছেন সবাই। রোদ থেকে বাঁচতে কেউ গাছের নিচে দাঁড়াচ্ছেন, কেউবা অপেক্ষার ‘অভিজ্ঞতা’ থেকে সঙ্গে ছাতা নিয়ে এসেছেন। কতক্ষণ অপেক্ষার পর তেল মিলবে, তার অবশ্য নিশ্চয়তা নেই। তবে এতো কষ্ট ও অপেক্ষা শেষে ফিলিং স্টেশনে থেকে তেল মিলছে সর্বোচ্চ ৬০০ টাকার, অর্থাৎ ৫ লিটার (অকটেন)। সরকার গত ১৪ মার্চ জ্বালানি তেল ক্রয়ে সব ধরনের রেশনিং তুলে দেয়। কিন্তু তাতে করে আগের-পরের পরিস্থিতির খুব একটা তফাৎ আসেনি। অনেক পাম্পে আজও তেল নেই, হাতেগোনা দু-একটি পাম্প গ্রাহকের চাহিদামাফিক তেল দিচ্ছে, আর যেসব পাম্পে তেল রয়েছে, তারা নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি দিচ্ছে না।
ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে কথা হয় অপেক্ষারত বাইকার ইরফান মাহমুদের সঙ্গে। তিনি বলেন, এখানে আসার আগে দুইটা পাম্পে ঘুরেছি, সেখানে তেল নেই। পরে এই পাম্পে এসেছি। লাইন এতো বিশাল যে, কখন তেল নিতে পারবো জানি না। ফিলিং স্টেশনের কর্মী জানান, বাইকে ৬০০ টাকা, প্রাইভেটকারে ১ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকার তেল দেয়া হচ্ছে। তেলের সাপ্লাই থাকলেও চাপ এতটা বেশি যে, সবাইকে যেন তেল দেওয়া সম্ভব হয়, তাই পরিমাণ হিসেব করে দেয়া হচ্ছে।
একই চিত্র দেখা যায় মহাখালীর ক্লিন ফুয়েল স্টেশনেও। ট্রাস্টে ৬০০ টাকার তেল মিললেও এখানে ৫০০ টাকার বেশি তেল মিলছে না। এই পাম্পেও অপেক্ষারত বাইকারদের লাইন ছাড়িয়ে গেছে মহাখালী বাস টার্মিনাল পর্যন্ত। এক ঘণ্টা অপেক্ষা শেষে তেল নিয়ে স্টেশন থেকে বের হচ্ছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ৫০০ টাকার বেশি তেল দিচ্ছে না। কিন্তু এই তেলে আমার হবে না। অন্য কোনো স্টেশন থেকে আবার তেল নিতে হবে। এই গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে তেল নেওয়াটা খুবই কষ্টের।
এসব স্টেশনে অপেক্ষা করে তেল মিললেও যেসব স্টেশনে তেলই নেই, সেখানেও ঠায় বসে আছেন গ্রাহকরা। তেজগাঁওয়ের আইডিয়াল ফিলিং স্টেশনের ঢোকার মুখেই চোখে পড়ে বোর্ডে লিখে রাখা একটা নোটিশ ‘অকটেন নেই, ডিপো থেকে আসলে দেয়া হবে’। তবে ডিপো থেকে ঠিক কখন আসবে, তার নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না কর্মীরা। আইডিয়াল ফিলিং স্টেশন সাধারণত চাহিদামাফিক তেল দিয়ে থাকে। তাই ভোগান্তি দ্বিগুন না করতে গ্রাহকরাও তেলহীন স্টেশনে লাইন ধরে বসে আছেন।
জ্বালানি তেলের এই পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে কথা বলা হয় বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিমের সঙ্গে। তিনি বলেন, একেকটা পাম্প তেল পাচ্ছে সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৪ হাজার লিটার, অথচ গ্রাহকের চাহিদা তার চাইতে অনেক বেশি। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে তেলের কাছে পৌঁছানোর পর সে যদি তেল না পায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই রাগান্বিত হবে। কিন্তু এখানে তো পাম্প মালিকদের কিছু করার নেই। তিনি বলেন, ডিপো থেকে চাহিদামাফিক তেল পেলে এই চাপটা অনেকাংশেই কমানো যেত। কিন্তু সেটা তো পাম্প পাচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়েই পাম্প নির্দিষ্ট পরিমাণে তেল দিচ্ছে। গ্রাহকদের ভোগান্তিতে ফেলার কোনো উদ্দেশ্য আমাদের নেই, আমরা বরং চাই এই পরিস্থিতি দ্রুত ঠিক হোক।
জানতে চাইলে বিপিসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, আগাম পরিস্থিতি বিবেচনা করে পাম্পে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে সবাই হয়তো চাহিদামাফিক তেল পাচ্ছে না। কিন্তু গ্রাহকদের প্যানিক বায়িংও সংকটটা আরো বাড়িয়ে তুলেছে। প্রয়োজনের বেশি তেল না নেওয়ার বিষয়ে তাদের সচেতন হওয়া জরুরি।


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও