• শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬, ১১:১১ অপরাহ্ন
শিরোনাম
স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানার ৬ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা দুদকের মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি কমতে পারে ১.২ শতাংশ হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যু ৭, নতুন রোগী আঠার শতাধিক সংসদের অধিবেশন থেকে বিরোধী দলের ওয়াকআউট সারাদেশে অবৈধ মজুতকৃত ৪ লাখ ৬৯ হাজার লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার অধ্যাদেশ পাস হলে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে স্থানীয় নির্বাচনের সিদ্ধান্ত: সিইসি জ্বালানি খাতে মাসে আড়াই থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন সংস্কার চায় সরকার: তথ্যমন্ত্রী চাহিদা অনুযায়ী শ্রমবাজার খুলতে রাজি মালয়েশিয়া সংসদে ১২ বিল পাস: রহিত হল সুপ্রিম কোর্ট ও মানবাধিকারবিষয়ক অধ্যাদেশ

নাটোরে সমবায় সমিতির টাকা তছরুপের অভিযোগের তদন্তে সত্যতা মিললেও সমবায় কর্মকর্তার ভিন্ন দাবি!

প্রভাত রিপোর্ট / ২১৫ বার
আপডেট : শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬
filter: 0; fileterIntensity: 0.0; filterMask: 0; module: a; hw-remosaic: 0; touch: (0.3736111, 0.3736111); modeInfo: ; sceneMode: Auto; cct_value: 0; AI_Scene: (-1, -1); aec_lux: 77.836815; hist255: 0.0; hist252~255: 0.0; hist0~15: 0.0;

খন্দকার মাহবুবুর রহমান, নাটোর : নাটোরের সিংড়া উপজেলার সুকাশ ইউনিয়নের ‘হাসপুকুরিয়া-ছিলামপুর কৃষক সমবায় সমিতি লিমিটেড‘এর অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির বিরুদ্ধে সমবায় আইন ও সরকারি পরিপত্র অমান্য করে অবৈধ সদস্য ভর্তি এবং সমিতির আমানত তছরুপের অভিযোগ উঠেছে। ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ৭৬ সদস্যের এই সমিতির গচ্ছিত প্রায় পৌনে চার লক্ষ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ মেলায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং জেলা সমবায় কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন সাধারণ সদস্যরা।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ মে ২০২৫ তারিখে নাটোর জেলা সমবায় কার্যালয়ের এক আদেশের মাধ্যমে উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা (পজীব) মো. বুলবুল হাসানকে ৩ সদস্যের অন্তর্বর্তী কমিটির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কমিটির দায়িত্ব ছিল ১২০ দিনের মধ্যে স্বচ্ছ নির্বাচন সম্পন্ন করা। কিন্তু সমবায় অধিদপ্তরের ১ আগস্ট ২০০৭-এর ৪২৮ নং সার্কুলারে অন্তর্বর্তী কমিটির নতুন সদস্য ভর্তি নিষিদ্ধ থাকলেও, এই কমিটি অন্তত ৯০ জন নতুন সদস্য ভর্তি করেছে। অভিযোগ রয়েছে, ১৬.৫ শতাংশ জমি ও ৫০০০ টাকা শেয়ারের নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রত্যেকের কাছ থেকে ৩ থেকে ৮ হাজার টাকা অবৈধ অর্থ হাতিয়ে নিয়ে মাত্র ৫০০ টাকা শেয়ারের বিনিময়ে তাদের সদস্য পদ দেওয়া হয়েছে।
সোনালী ব্যাংক পিএলসি, রণবাঘা বাজার শাখার স্টেটমেন্ট (হিসাব নং- ০৬২৪০০২০৪১৯৫৯) পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ২৯ জুলাই ২০২৫ তারিখে ২,৩০,৩০৬ টাকা স্থানান্তরের মাধ্যমে একাউন্টটি স্থায়ীভাবে বন্ধ (ঈষড়ংবফ) করে দেওয়া হয়েছে। এর আগে জুন ও জুলাই মাসে ধাপে ধাপে আরও ১,১২,৬০০ টাকা নগদ উত্তোলন করা হয়।
সমিতির সাধারণ সদস্য মো. সৌরভ হোসেন মিন্টু বলেন, “অন্তর্বর্তী কমিটি তাদের মেয়াদে নিয়মবহির্ভূতভাবে নতুন সদস্য ভর্তি করেছে এবং গচ্ছিত তহবিল নিয়ে চরম অস্বচ্ছতা তৈরি করেছে। ফাঁকা রেজুলেশনে স্বাক্ষর নিয়ে নিয়ম না মেনে নিজের ইচ্ছেমতো পকেট কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে সমবায় সমিতি আইন ২০০১ (সংশোধিত) এর ৩৪ ধারা সম্পূর্ণভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে। কোনো সাধারণ সভা বা রেজুলেশন ছাড়াই ব্যাংক অপারেটর পরিবর্তন করে ক্যাশ থেকে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। পরবর্তীতে সোনালী ব্যাংকের রণবাঘা শাখার হিসাবটিই স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ ব্যাপারে আমরা জেলা সমবায় কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ জানিয়েছি। অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২ সদস্যের তদন্ত কমিটি গত ২৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে তাদের প্রতিবেদনে বুলবুল হাসানের বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে। তবে আমরা জেনেছি, কমিটির ৩ নং সদস্য সৈয়দা রুনা খাতুন এই অন্যায্য সদস্য ভর্তির সিদ্ধান্তে একমত হননি এবং তিনি সংশ্লিষ্ট রেজুলেশনে স্বাক্ষর করেননি।”
সমিতির প্রবীণ সদস্য মো. আরাফাত হোসেন সরদার বলেন, “আমাদের নিবন্ধিত এই সমিতির মোট সদস্য ৭৬ জন। আমরা সবাই কৃষক। আমাদের কষ্টের টাকায় কেনা গভীর নলকূপ আর শেয়ারের টাকা দিয়ে এই সমিতি দাঁড়িয়েছে। নতুন ভর্তির জন্য ১৩১ জন আবেদন করেন, যার মধ্য থেকে বিধি বহির্ভূতভাবে ৯০ জন নতুন সদস্যকে ভর্তি করা হয়েছে। এই নতুন সদস্যদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৩ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা করে আদায় করে কয়েক লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেছেন সভাপতি বুলবুল হাসান। সরকারি কর্মকর্তা হয়ে তিনি আমাদের আমানত শূন্য করে দিলেন! আমাদের সই জালিয়াতি করে নাকি নতুন লোক ভর্তি করা হয়েছে। আমরা এই অন্যায়ের বিচার চাই।”
সমিতির সদস্য মো. রেজাউল করিম জানান, “নাটোরের শেষ সীমানায় আমাদের গ্রাম। আমাদের গ্রাম থেকে সন্নিকটে বগুড়া জেলার নন্দীগ্রাম উপজেলার রণবাঘা সবচেয়ে বড় বাজার। সমিতি প্রতিষ্ঠাকালে আমরা সেখানে ব্যাংক একাউন্ট খুলেছিলাম। কিন্তু অন্তর্বর্তী কমিটির সভাপতি, সদস্যদের মতামত ছাড়াই এই ব্যাংক অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করে দেন। যাদের কোনো জমি নেই এমন ব্যক্তিদের তিনি নতুন সদস্য হিসেবে ভর্তি করান। আইন অনুযায়ী অন্তর্বর্তী কমিটি সদস্য ভর্তি করতে পারে না।”
সাবেক সভাপতি মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, “নাটোর জেলা সমবায় দপ্তরের ২৭/০৫/২০২৫ তারিখের আদেশে মো. বুলবুল হাসানকে সভাপতি করা হয়েছিল। আমি অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে দায়িত্ব পালন করে এসেছিলাম। দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় আমি ব্যাংক ও নগদে মোট ৩,৭৪,৩৬৯ টাকা এবং যাবতীয় নথিপত্র তার কাছে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তিনি বিধি লঙ্ঘন করেছেন। আমরা অভিযোগ করি এবং তদন্তে তার অপরাধ প্রমাণিত হয়। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও জেলা সমবায় অফিসার কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না, যা আমাদের অবাক করছে। তিনি ফাঁকা রেজুলেশনে স্বাক্ষর নিয়ে পকেট কমিটি গঠন করেছেন এবং সোনালী ব্যাংকের রণবাঘা শাখার হিসাবটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিয়েছেন।”
এদিকে, গত ২৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে দাখিলকৃত তিনটি পৃথক তদন্ত প্রতিবেদনের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পেতে গত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে তথ্য অধিকার আইনে (ফরম ‘ক’) জেলা সমবায় কার্যালয়ে আবেদন করেছেন সমিতির সদস্য মো. ইলিয়াস কাঞ্চন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন যে, হাসপুকুরিয়া/ছিলামপুর কৃষক সমবায় সমিতির পক্ষে-বিপক্ষে দাখিলকৃত অভিযোগের প্রেক্ষিতে গঠিত তদন্ত কমিটির স্মারক নং- ৯৮-এর পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সদস্যদের প্রাপ্য। তবে প্রতিবেদনটি এখনো হাতে না পাওয়ায় তদন্তের প্রকৃত ফলাফল নিয়ে সদস্যদের মধ্যে ধোঁয়াশা কাটছে না।
তবে তদন্ত কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা তদন্তে সভাপতি বুলবুল হাসানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের সুস্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছি। তার ব্যাংক লেনদেন ও সদস্য ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বিধি-বহির্ভূত।”
অভিযুক্ত উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা (পজীব) মো. বুলবুল হাসান বলেন, “তিন মাস কয়েক দিন সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি। শারীরিক অসুস্থতার কারণে ওই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়েছি। সমিতির নিয়ম বহির্ভূত কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম না। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ হয়েছে এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। এব্যপারে আপনি আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে পারেন।”
সিংড়া উপজেলা পল্লী উন্নয়ন অফিসার হাসানুজ্জামান বলেন, “সমিতির অভ্যন্তরীণ বিষয়ের সাথে আমাদের সম্পৃক্ততা নেই। উপজেলা পল্লী উন্নয়ন অফিসার হিসেবে কেবল দাপ্তরিক বিধি অনুসরণ করেছি। অভিযোগ বা তদন্ত বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।”
জেলা সমবায় অফিসার মো. হোসেন শহীদ বলেন, “সমিতির সদস্যরা অভিযোগ করেছে, অভিযোগ তদন্ত হয়েছে। তদন্তের প্রেক্ষিতে শুনানি হয়েছে এবং বিষয়টি নিষ্পত্তিও করা হয়েছে। নতুন সদস্য ভর্তির প্রক্রিয়াটাই অবৈধ, তাই নতুন সদস্য গ্রহণ বা ভর্তি করা হয় নাই।” তবে জেলা সমবায় অফিসারের এই ‘নিষ্পত্তি’ এবং ‘সদস্য ভর্তি না হওয়ার’ দাবির সাথে মাঠ পর্যায়ের সাধারণ সদস্যদের অভিযোগ এবং তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্যের ব্যাপক অসংগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সোনালী ব্যাংকের বন্ধ হয়ে যাওয়া হিসাব ও উত্তোলনকৃত টাকার ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনও অন্ধকারে রয়েছেন সাধারণ কৃষকরা। আর সেচ প্রকল্পের সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আব্দুল্লাহ আল রিফাত বলেন, “বিষয়টি আমার জানা ছিল না। এ ব্যাপারে তদন্ত সাপেক্ষে অতি দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও