প্রভাত রিপোর্ট: ধূমপান ও তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ই-সিগারেট নিষিদ্ধসংক্রান্ত বিধান বাতিলের যেকোনো উদ্যোগকে ‘আত্মঘাতী’ আখ্যা দিয়ে জনস্বাস্থ্য কর্মীরা বলেছেন, এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে দেশের লাখ-কোটি তরুণ-তরুণীর জীবন নেশা, আসক্তি ও নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়বে।
তাদের দাবি, ধারা ৬(গ) সংশোধনের প্রস্তাব থাকলেও সরকার ই-সিগারেট নিষিদ্ধের বিধান পুরোপুরি বিলুপ্ত করার দিকেই এগোচ্ছে। এ নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত স্পষ্ট অবস্থান না নেওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। রবিবার (৫ এপ্রিল) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন।
‘ই-সিগারেট নিষিদ্ধ সংক্রান্ত ধারা বাতিল: নেশা, স্বাস্থ্য হুমকিতে লক্ষ তরুণের জীবন’ শীর্ষক এ সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির সভাপতি ও ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডা. গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক। বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মানস’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী, একাত্তর টেলিভিশনের প্লানিং এডিটর ও তামাক নিয়ন্ত্রণ গবেষক সুশান্ত সিনহা, সিএলপিএ’র হেড অব প্রোগ্রাম আমিনূল ইসলাম বকুল, পাবলিক হেলথ ল ইয়ার্স নেটওয়ার্কের সদস্য সচিব ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ এবং ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক মো. বজলুর রহমান। তামাক নিয়ন্ত্রণ গবেষক ও সাংবাদিক ইব্রাহীম খলিলের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন তামাক নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ ফারহানা জামান লিজা। তিনি জানান, ই-সিগারেট কোম্পানিগুলো মূলত দুটি যুক্তি সামনে এনে এই পণ্যকে বাজারে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করছে।
প্রথমত, তারা বলছে এটি কেবল প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রচলিত সিগারেটও শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের কাছে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে একই যুক্তিতে ই-সিগারেট বৈধতা পেলে সেটিও অবধারিতভাবে শিশু-কিশোরদের হাতে পৌঁছে যাবে। দ্বিতীয়ত, ই-সিগারেটকে ‘কম ক্ষতিকর’ বলে যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তার পক্ষে বাংলাদেশে তো নয়ই, বিশ্বব্যাপীও নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ই-সিগারেটকে ক্ষতিকর ও আসক্তি-সৃষ্টিকারী পণ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ফারহানা জামান লিজা বলেন, যেখানে দেশে এখনো এই পণ্যের ব্যবহার ব্যাপক নয়, সেখানে ‘কম ক্ষতিকর’ তকমা দিয়ে এটি বাজারে আনা মানে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর নতুন ঝুঁকি চাপিয়ে দেওয়া।
সভাপতির বক্তব্যে ডা. গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক বলেন, ই-সিগারেটের কেমিক্যালের ফলে নারী ও পুরুষের প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে। আবার তাদের মাধ্যমে যেসব শিশু জন্ম নিচ্ছে তারাও ত্রুটিপূর্ণভাবে জন্মগ্রহণ করছে। ফলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ই-সিগারেট নিষিদ্ধের কোনো বিকল্প নেই।
সরকার অতীতে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। কিন্তু এত বছর পর কেন এই আইনকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হচ্ছে, কারা এর পেছনে রয়েছে তা সরকারের খতিয়ে দেখা দরকার।
ড. অরূপরতন চৌধুরী বলেন, ই-সিগারেট কম ক্ষতিকর বলে যে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, সেটার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে ক্ষতিকর বলে জানিয়েছে। যেখানে বাংলাদেশে এই পণ্যের ব্যবহার নেই, সেখানে এই পণ্যকে কম ক্ষতিকর বলে বাজারে এনে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে নতুন ঝুঁকিতে ফেলার কোনো যুক্তিই হয় না। বিশ্বে ৪১টি দেশ ইতোমধ্যে নিষিদ্ধ করেছে। ফলে বাংলাদেশ সরকার ধূমপান ত্যাগের জন্য ইতোমধ্যে কুইটিং সিস্টেম এবং ধূমপান ত্যাগে সহায়ক ওষুধ চালু করেছে। যদি সরকার ওষুধ ও ধূমপান ত্যাগের কর্মসূচি নিয়ে আসে, তাহলে একই সময়ে ‘কম ক্ষতিকর’ বলে এমন একটি নেশা পণ্য কেন নিয়ে আসতে চায়?
সুশান্ত সিনহা বলেন, বিশ্বব্যাপী ই-সিগারেট তামাকজাত দ্রব্য হিসেবে বিবেচিত। অথচ দেশে তামাকজাত দ্রব্যের সংজ্ঞা থেকে ই-সিগারেটকে বাদ দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে। একইসঙ্গে বিক্রয় কেন্দ্রে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধের ধারাও বাতিলের চেষ্টা করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। সরকার ২০০৫ সালে বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। অথচ বর্তমানে কেন এই ধারা বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সেটা স্পষ্ট নয়। এসব ধারা বাতিল করা হলে সব দিক থেকেই তরুণদের ধ্বংসের পথে নিয়ে যাওয়া হবে।
আমিনূল ইসলাম বকুল বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ই-সিগারেট নিষিদ্ধের ধারা বাতিল সংক্রান্ত যে সুপারিশ করা হয়েছে, সে ব্যাপারে কোনো কঠোর ভূমিকা রাখতে পারছে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে এই ই-সিগারেট নিষিদ্ধের বিধান বজায় রাখার জন্য কঠোর অবস্থান নেওয়া। বিশ্বের ৪১ দেশ যখন ই-সিগারেট নিষিদ্ধ করেছে, ঠিক একই সময়ে আমরা বাংলাদেশে এই অপ্রচলিত পণ্যটি শুধু একটি বিদেশি কোম্পানি এবং কিছু ব্যবসায়ীর জন্য উন্মুক্ত করছি, যার ব্যবহারকারীর সংখ্যা মাত্র ০.২%। যদি এই ই-সিগারেটের বিধান তুলে দেওয়া হয় এবং বৈধতা দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের হাতে এই মারাত্মক নেশাদ্রব্য পৌঁছে যাবে এবং তরুণ সমাজ ধ্বংসের পথে চলে যাবে।
ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ বলেন, আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, সরকার ধাপে ধাপে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। একই রায়ে দেশে নতুন কোনো তামাক বা তামাকজাত দ্রব্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন না দেওয়া এবং বিদ্যমান তামাক কোম্পানিগুলোকে বিকল্প পণ্য উৎপাদনে উৎসাহিত করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়। আমরা চাই খুচরা শলাকা বিক্রি, নিকোটিন পাউচ বিক্রি বন্ধ হোক। ই-সিগারেট অত্যন্ত ক্ষতিকর, ফলে এটা কোনোভাবেই বৈধতা না দিয়ে নিষিদ্ধ রাখতে হবে।
তামাকবিরোধী জোটের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী হেলাল আহমেদ বলেন, ই-সিগারেটের ভয়াবহতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে তরুণরা ই-সিগারেটের প্রতি বেশি ঝুঁকছে। ফলে তরুণদের সুরক্ষায় ক্ষতিকর ই-সিগারেট নিষিদ্ধ বহাল রাখতে হবে।
মো. বজলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে ই-সিগারেট নিষিদ্ধ থাকার পরও এটা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ফলে এটার যদি বৈধতা দেওয়া হয় তাহলে এটা মহামারি আকারে ছড়িয়ে যাবে। ফলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এ ধারা বহালের কোনো বিকল্প নেই।
সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা ১৮টি সংগঠন হলো বাংলাদেশ তামাকবিরোধী জোট (বাটা), বাংলাদেশ টোব্যাকো কন্ট্রোল এডভোকেটস (বিটিসিএ), বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি), বাংলাদেশ টোব্যাকো কন্ট্রোল রিসার্চ নেটওয়ার্ক (বিটিসিআরএন), বাংলাদেশ সেন্টার ফর গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিসিজিডি), বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি, আর্থ ফাউন্ডেশন, লিডার্স ইন টোব্যাকো কন্ট্রোল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, লেটস ওয়ার্ক, প্রত্যাশা মাদকবিরোধী সংগঠন, পাবলিক হেলথ ল’ ইয়ার্স নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্য আন্দোলন, সেতু, তামাকবিরোধী নারী জোট (তাবিনাজ), ইউনাইটেড ফোরাম অ্যাগেইনস্ট টোব্যাকো, স্কুল অব লাইফ, ইয়ুথ ফর টোব্যাকো ফ্রি বাংলাদেশ ও সিটিজেন্স ফর সাসটেইনেবল ডেভলপমেন্ট।