আজ
|| ১৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ১লা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
নানা সংকটে কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল
প্রকাশের তারিখঃ ৭ এপ্রিল, ২০২৬
প্রভাত সংবাদদাতা, কুড়িগ্রাম: ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল। জেলার বিশ লক্ষাধিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবার এই আশ্রয়স্থলটি নানা সংকটে নিজেই যেন ‘দুরারোগ্য’ রোগে ভুগছে। কয়েক দশক ধরে চিকিৎসক, কর্মচারী আর চিকিৎসা সরঞ্জাম সংকটে হাসপাতালটির স্বাস্থ্যসেবা তলানিতে পৌঁছেছে। পত্র চালাচালিতেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ২৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে ১০০ শয্যারও চিকিৎসক নেই। চিকিৎসক, জনবল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির চাহিদা জানিয়ে বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিত প্রতিবেদন দেওয়া হলেও কার্যকর কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। নানা সংকট নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে চলছে হাসপাতালটি। ফলে নামমাত্র স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে চলা জেলার প্রধান এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সেবার মানে গতি আসছে না। সেবার বদলে মিলছে কষ্ট আর হয়রানি।
হাসপাতালের প্রশাসনিক শাখার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ৫০ শয্যার কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালটি পরবর্তী সময়ে ১০০ শয্যায় উন্নীত হয়। ২০১৭ সালে ২৫০ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত হওয়া হাসপাতালটিতে বর্তমানে ১৭৮ জন চিকিৎসকের প্রয়োজন থাকলেও আছেন মাত্র ২৩ জন। চিকিৎসা সরঞ্জামসহ অন্যান্য সংকট তীব্র।
বহির্বিভাগসহ হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে গিয়ে চিকিৎসক ও জনবল সংকটের সত্যতা পাওয়া গেছে। সংকট মোকাবিলায় মজুরিভিত্তিতে নেওয়া উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার (সেকমো) দিয়ে সেবা দেওয়ারও ঘটনা ঘটছে। এতে মাঝে মাঝেই ‘ভুল চিকিৎসা’ কিংবা ‘চিকিৎসা অবহেলায়’ রোগীর মৃত্যু অভিযোগ উঠছে। চিকিৎসক সংকটে বহির্বিভাগে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খান দায়িত্বরত চিকিৎসকরা। আর ভর্তি রোগীদের বিড়ম্বনা আরও দুঃসহ।
কর্তৃপক্ষ বলছে, হাসপাতালটিতে নিয়মিত ৫ শতাধিক ভর্তি রোগী চিকিৎসাধীন থাকেন। চিকিৎসক সংকটের কারণে সারাদিনে মাত্র একবার চিকিৎসকের দেখা মেলে। দুপুরের পর হাসপাতালে কোনও রোগী ভর্তি হলে তার কপালে তাৎক্ষণিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব হয় না। জরুরি বিভাগের মেডিক্যাল অফিসার কিংবা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শুধু সেকমো দিয়ে নামমাত্র চিকিৎসা শুরু করতে হয়। পরের দিন সকালের আগে ওয়ার্ডে আর কোনও চিকিৎসকের দেখা মেলে না। কোনও স্বাস্থ্য পরীক্ষা দিলে তার রিপোর্ট দেখাতে হয় পরের দিন। ফলে মূল চিকিৎসা পেতে অনেক রোগীকে ভর্তির পর ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। এ ছাড়াও ওয়ার্ডের শয্যা সংকট এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়েও ক্ষোভ আছে রোগীদের।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য মতে, ২৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে বর্তমানে চিকিৎসক প্রয়োজন ১৭৮ জন। কিন্তু চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ২৩ জন। মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি এবং কার্ডিওলজি বিভাগের মতো অতিগুরুত্বপূর্ণ বিভাগে নেই কোনও সিনিয়র কনসালটেন্ট। অ্যানেসথেসিস্ট ও অর্থো-সার্জারি ছাড়া সিনিয়র কনসালটেন্টের ৮টি পদ শূন্য। জুনিয়র কনসালটেন্টের ১২টি পদের ৬টিই শূন্য। মেডিক্যাল অফিসার এবং ইনডোর মেডিক্যাল অফিসার নেই। নেই রেজিস্ট্রার, সহকারী রেজিস্ট্রার। চিকিৎসক সংকটে হাসপাতালটি নিজেই যখন ধুঁকছে তখন জনগণের স্বাস্থ্যসেবার বেহাল দশার চিত্র সহজেই অনুমেয়।
হাসপাতাল সূত্র বলেছে, পুরনো দ্বিতল ভবনের পাশে আধুনিক সুবিধা সংবলিত ৮তলা ভবন নির্মাণ করা হলেও জেলার বাসিন্দারা তার সুবিধা ভোগ করতে পারছেন না। নতুন ভবনে প্রয়োজনীয় পরিসর থাকলেও আইসিইউ সুবিধা স্থাপন করা হয়নি। শিশুদের জন্য নেই অতি জরুরি এনআইসিইউ সুবিধা। ফলে গুরুতর অসুস্থ কোনও রোগীকে আইসিইউ কিংবা এনআইসিইউ সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। এই সুবিধা নিতে গেলে রোগীদের রংপুর যেতে হয়। ফলে পথেই অনেক রোগীর মৃত্যু ঘটে।
শুধু চিকিৎসক সংকট নয়। আছে চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট। হাসপাতালটিতে নেই কোনও সিটিস্ক্যান ও এমআরআই মেশিন। ইকোকার্ডিওগ্রাম, এন্ডস্কপি ও ল্যাপরোস্কপি মেশিন থাকলেও তা কয়েক বছর ধরে অকেজো পড়ে আছে। অপারেশনের যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করার আধুনিক কোনও অটোক্লেভ মেশিন নেই। মান্ধাতা আমলের ছোট একটি মেশিনে কোনও রকম কাজ সারতে হচ্ছে। চাহিদার ৬টি ইসিজি মেশিনের বিপরীতে আছে মাত্র ৩টি। শুধু তাই নয়, চিকিৎসাসংক্রান্ত বেশ কিছু মূল্যবান মেশিন হাসপাতাল স্টোরে পড়ে থাকলেও সরবরাহকারীর পাওনা পরিশোধ ও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে তা বাক্সবন্দি হয়ে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা।
শুধু চিকিৎসক ও সরঞ্জাম নয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সংকটও তীব্র। আয়া, ওয়ার্ড বয়, ক্লিনার আর সিকিউরিটি গার্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রয়োজনীয় জনবল নেই। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় বন্ধ হয়ে আছে নিয়োগ প্রক্রিয়া।
হাসপাতালটিতে নেই আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। পাশের পুকুর পাড়ে চিকিৎসা বর্জ্য ফেলে রাখা হয়। যা রোগী ও আশেপাশের বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
জনবল সংকটের কথা স্বীকার করে হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক ডা. নুর নেওয়াজ আহমেদ বলেন, ‘চিকিৎসকসহ অনেক বিষয়ে সংকট রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আমরা চাহিদা পাঠিয়েছি। সম্প্রতি চার জন চিকিৎসক যোগদান করলেও তাতে চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। অন্যান্য চাহিদার বিষয়ে আমরা বারবার কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে যাচ্ছি। কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা না নিলে আমাদের করণীয় কিছু থাকে না। সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আমরা সেবা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
Copyright © 2026 প্রভাত. All rights reserved.