প্রভাত রিপোর্ট: সংকটের মুহূর্তে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টিকের বোতল, ড্রাম, ট্যাংক এমনকি মাটির নিচেও বিপজ্জনকভাবে জ্বালানি তেল সংরক্ষণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইরান যুদ্ধ ঘিরে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অস্থির। যার ছোঁয়া লেগেছে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে। বৈশ্বিক এ উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে দেশের জ্বালানি বাজারেও। আতঙ্কে মানুষ ‘প্যানিক বায়িং’ করছেন। মুনাফালোভীরা বিভিন্ন স্থানে মজুত করছেন জ্বালানি তেল। প্রশাসন নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এসব অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। তবুও থামছে না এ প্রবণতা।
সরকার ও বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতি বারবার অতিরিক্ত তেল মজুত না করার আহ্বান জানালেও তাতে কর্ণপাত করছে না কেউ। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পের সামনে দীর্ঘ যানবাহনের লাইন সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলছে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি তেল অত্যন্ত দাহ্য পদার্থ। আবাসিক ভবন বা জনবহুল এলাকায় অনিরাপদভাবে তেল সংরক্ষণ করলে সামান্য আগুনের সংস্পর্শেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড বা বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। এছাড়া তেলের বাষ্প দীর্ঘসময় নিশ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা সতর্ক করে জানান, অনুমোদিত নিরাপদ স্টোরেজ ব্যবস্থা ও নির্ধারিত নিরাপত্তা মান বজায় না রেখে জ্বালানি তেল সংরক্ষণ করলে তা প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হতে পারে।
মুদি দোকানি শাহজালাল। জ্বালানি তেলের চলমান অস্থিরতার মধ্যে বেশি দামে বিক্রির লোভে তেল মজুত করেছিলেন বাড়িতে। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে তার বাড়ি থেকে ৩৭০ লিটার পেট্রোল জব্দ করে প্রশাসন। অরক্ষিত অবস্থায় মজুত করা এসব অতি দাহ্য পদার্থ হতে পারে বড় ধরনের বিস্ফোরণ কিংবা দুর্ঘটনার কারণ। একইভাবে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় বসতবাড়িতে অবৈধভাবে ৩২০ লিটার ডিজেল মজুত করেছিলেন মামুন নামে এক যুবক। গত ১ এপ্রিল তার বাসায় অভিযান চালিয়ে জব্দ করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। পরে তাকে ১০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়।
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সহকারী পরিদর্শক সানজিদা আক্তার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বাসাবাড়িতে জ্বালানি তেল সংরক্ষণ করার কোনো সুযোগই নেই। লাইসেন্স ছাড়া কোথাও রাখতে পারবে না কেউ, আইনেও নেই। দাহ্য পদার্থ আগুনের সংস্পর্শে এলে অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটবে বড় আকারে, ক্ষতিও হবে অনেক।’
ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক (অপারেশন ও মেনটেন্যান্স) মো. মামুনুর রশিদ গণমাধ্যমকে বলেন, দাহ্য পদার্থ অরক্ষিতভাবে সংরক্ষণ করলে নিঃসন্দেহে ঝুঁকি। কোনোভাবে স্পার্ক হলে ম্যাসাকার হয়ে যাবে। অনেক সময় নিজের মোটরসাইকেলে ব্যবহারের জন্য বাসাবাড়িতে বোতলে মজুত করে রাখছে। গ্যাসের চুলা জ্বালানো, ম্যাচের কাঠি জ্বালানো ও লাইটার জ্বালানোর সময় বিস্ফোরণ হলে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।’
বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘জ্বালানি তেল মজুত করা সম্পূর্ণ আইনগত অপরাধ। সরকারও মজুত করে রাখে, তবে সেটা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে। পেট্রোল-অকটেন খুব দ্রুত বাষ্পে পরিণত হয়। কোনোভাবে খোলা থাকলে গ্যাসের মতো ভরে যাবে। তখন আশপাশে যদি কেউ সিগারেট অথবা স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি হয় তখন বিস্ফোরণ ঘটবে।’ তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কোনো বড় দুর্ঘটনার খবর না পেলেও ভবিষ্যতে হতে পারে। এজন্য সবার সচেতন হওয়া জরুরি।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ জানান, ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের অধীনে, যে ব্যক্তি কালোবাজারে মজুত বা লেনদেনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হবেন তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান আছে। স্বাধীনতার পর পণ্য মজুত করে সংকট তৈরির ঘটনা ঘটেছিল। তখনই এই আইনটি করা হয়েছিল। এ আইনে চোরাচালান, কৃত্রিম সংকট তৈরি ও ক্ষতিকারক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত যে কাউকে সরকারের আটক করার বিধান রয়েছে। এ আইনের অধীনে, যে ব্যক্তি কালোবাজারে মজুত বা লেনদেনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হবেন তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। অথবা ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। জরিমানাও করা হবে।
তবে, শর্ত হিসেবে এতে বলা হয়েছে, যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রমাণ করতে পারেন যে তিনি লাভ ছাড়া অন্য উদ্দেশ্যে মজুত করেছিলেন তবে তিনি তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। একই সঙ্গে জরিমানাও করা হবে তাকে। একই সঙ্গে আদালত কালোবাজারি বা মজুত হয়েছে এমন কিছু সরকারকে বাজেয়াপ্ত করার আদেশও দিতে পারবেন।
গত ২৮ মার্চ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের মতো জ্বালানি তেল অত্যন্ত দাহ্য পদার্থ হওয়ায় এগুলো ঘরে বা অনিরাপদ স্থানে মজুত করা ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। অবৈধ মজুতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ নিজেই বলেছেন, কালোবাজারিরা তেলের মজুত তৈরি করে সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
দেশে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট রোধে অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। ২৭ মার্চ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, এখন থেকে জ্বালানি তেল অবৈধভাবে মজুত করার সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পুরস্কৃত করা হবে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, জ্বালানি তেলের সরবরাহ তদারকি করতে ইতিমধ্যে দেশের সব জেলায় ভিজিলেন্স টিম গঠন করা হয়েছে। অবৈধ মজুতদারি বন্ধে যারা তথ্য দিয়ে সহায়তা করবেন, তাদের জন্য দ্রুতই আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কারের ঘোষণা আসতে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে সচেতন নাগরিকদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও পরামর্শ দেওয়ার অনুরোধ।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, যারা অবৈধ মজুতদারির তথ্য দিচ্ছে, তাদের ১ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।