আজ
|| ১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ২৯শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি
জ্বালানিসংকটের প্রভাবে দেশে ই-বাইক বিক্রি বাড়ছে
প্রকাশের তারিখঃ ১৮ এপ্রিল, ২০২৬
প্রভাত অর্থনীতি: দেশে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশে চীনের রিভো ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে বিশ্বের ২০টির বেশি দেশে তাদের ব্যবসা রয়েছে। বাংলাদেশে তাদের বিক্রয়কেন্দ্র আছে ৬০টি।
রিভো বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ভেন বলেন, ‘মার্চ ও এপ্রিলের জ্বালানিসংকট বিক্রি বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। মার্চে আমাদের বিক্রি প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। দক্ষিণ এশিয়া ও পশ্চিম আফ্রিকায় এ বাজার দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশও দীর্ঘ মেয়াদে সম্ভাবনাময়।’
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলে প্রতি কিলোমিটারে খরচ পড়ে ১৫ থেকে ২০ পয়সা। অন্যদিকে জ্বালানিচালিত মোটরসাইকেলে পড়ে ২ থেকে ৩ টাকা। ফলে খরচের দিক থেকে ই-বাইক অনেক বেশি সাশ্রয়ী। এ কারণে এটির প্রতি তরুণদের আগ্রহ বাড়ছে।
জ্বালানিসংকটের প্রভাবে দেশে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল তথা ই-বাইক বিক্রি বাড়ছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যেখানে বিক্রি হয়েছিল ২ হাজার ১৯৫টি ই-বাইক, সেখানে মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৬১টিতে। অর্থাৎ এক মাসে বিক্রি বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ।
রাজধানীর ধানমন্ডির ২৭ নম্বর রোডের বাসিন্দা স্থপতি হাসান শাহরিয়ার খান জানান, প্রায় ১৬ বছর ধরে তিনি দুই হাজার সিসির একটি এসইউভি গাড়ি ব্যবহার করছেন। কিন্তু চলতি এপ্রিলের শুরুতে তিনি ১ লাখ ৫৭ হাজার টাকা ব্যয়ে চীনের ইয়াদিয়া ব্র্যান্ডের একটি বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল কিনেছেন। নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলে প্রতি কিলোমিটার যেতে ২০ পয়সারও কম খরচ হয়। প্রতিদিনই টুকটাক কাজে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় যেতে হয়। জ্বালানিসংকটের সময় একদিন প্রায় ছয় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হয়েছিল। আগে প্রতি লিটার জ্বালানিতে ৭-৮ কিলোমিটার যাওয়া যেত। এখন ই-বাইকে এক চার্জে ১০০ কিলোমিটারের বেশি যাওয়া সম্ভব।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের তিন রাস্তার মোড়ে অবস্থিত ইয়াদিয়া ব্র্যান্ডের একটি ফ্ল্যাগশিপ বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে জানা যায়, তাদের বিক্রি বেড়েছে। মার্চে সেখানে ৪৫টি ই-বাইক বিক্রি হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে বিক্রি হয়েছিল ৩২টি। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহেই বিক্রি হয়েছে ২১টি।
বিক্রয়কেন্দ্রটির নির্বাহী খায়রুল আলম বলেন, ‘হঠাৎ চাহিদা বাড়ায় আমাদের স্টক প্রায় শেষ। দ্রুত নতুন করে সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে।’
আলাপকালে কয়েকজন ব্যবহারকারী গণমাধ্যমকে বলেন, শহরে স্বল্প দূরত্বে চলাচলের জন্য বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল একটি উপযোগী বাহন। ব্যাটারির সক্ষমতা অনুযায়ী এসব মোটরসাইকেল ১৫০ থেকে ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে পারে। যেহেতু এতে শুধু মোটর ও ব্যাটারি থাকে, তাই রক্ষণাবেক্ষণ খরচও কম। পাশাপাশি এটি পরিবেশবান্ধব এবং জ্বালানিচালিত মোটরসাইকেলের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ কম খরচে চলাচল করা যায়।
দেশে ‘ট্যাকিয়ন’ নামে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল তৈরি করে ওয়ালটন গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডিজি-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ। বর্তমানে ৭টি মডেলের ই-বাইক তৈরি করছে, যেগুলোর দাম ৮৯ হাজার থেকে ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ফেব্রুয়ারিতে তাদের বিক্রি হয়েছিল প্রায় ২০০ ইউনিট ই-বাইক, যা মার্চে বেড়ে প্রায় ৪০০-তে পৌঁছে।
ওয়ালটন ডিজি-টেক ইন্ডাস্ট্রিজের প্রধান ব্যবসা কর্মকর্তা তৌহিদুর রহমান বলেন, তিন বছর ধরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৭-১০ শতাংশ। কিন্তু এবার মার্চে বিক্রি বেড়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ। জ্বালানিসংকটই এর প্রধান কারণ।
বর্তমানে দেশে ১০টির বেশি প্রতিষ্ঠান বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল আমদানি, সংযোজন ও বাজারজাত করছে। বাজারের একটি বড় অংশই রয়েছে চীনা প্রতিষ্ঠান রিভো ও ইয়াদিয়ার দখলে। এ ছাড়া ওয়ালটন, আকিজ, আইমা, সালিদা ও টেইলজি ব্র্যান্ডও বাজারে রয়েছে। ব্র্যান্ডভেদে এসব মোটরসাইকেলের দাম ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিক জানুয়ারি-মার্চে মোট ৬ হাজার ৫৩২টি ই-বাইক বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১ হাজার ৭৭৬টি, ফেব্রুয়ারিতে ২ হাজার ১৯৫টি ও মার্চে ২ হাজার ৫৬১টি বিক্রি হয়।
দেশে চীনা ব্র্যান্ড ইয়াদিয়ার স্থানীয় পরিবেশক রানার অটোমোবাইল। তারা জানায়, বর্তমানে দেশে ইয়াদিয়ার ৮৬টি বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। আগামী মাসে আরও ১০টি কেন্দ্র চালু হবে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যে মোট ২৫০টি বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
রানার অটোমোবাইলসের প্রধান ব্যবসায়িক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবু হানিফ বলেন, ‘মার্চে ইয়াদিয়ার বিক্রি ৮০ শতাংশ বেড়েছে। আগে কম মাইলেজের বাইকের চাহিদা বেশি থাকলেও এখন বেশি মাইলেজের বাইকের চাহিদা বাড়ছে।’
এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ৭ হাজার ৬৫৮টি ই-বাইক আমদানি হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৩৬ কোটি টাকা। পরের বছরে একই সময়ে আমদানি বেড়ে ১২ হাজার ৩৩০টিতে দাঁড়ায়, যার মূল্য প্রায় ৬২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে আমদানি বেড়েছে ৬১ শতাংশের বেশি।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এখনো দেশের মোটরসাইকেল বাজারে ই-বাইকের হিস্যা মাত্র ৩ শতাংশ। চার্জিং অবকাঠামো, ব্যাটারির মান ও রেঞ্জ নিয়ে অনেক গ্রাহকের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। এরপরও জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা থাকলে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের চাহিদা বাড়তে পারে।
Copyright © 2026 প্রভাত. All rights reserved.