আজ
|| ১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ২৯শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি
হরমুজ ‘উন্মুক্ত’, ইরানের ঘোষণায় কমল তেলের দাম
প্রকাশের তারিখঃ ১৮ এপ্রিল, ২০২৬
প্রভাত অর্থনীতি: ইরান ঘোষণা দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতির বাকি সময় হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য ‘সম্পূর্ণ উন্মুক্ত’ থাকবে। এই ঘোষণার পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দাম অনেকটা কমে গেছে। এই ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি নেমে আসে ৮৮ ডলারে, যদিও শুক্রবার সকালেই এই তেলের দাম ছিল ৯৮ ডলারের ওপরে।
হরমুজ প্রণালি ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। সাধারণত বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
ইরানের এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে সামুদ্রিক পরিবহন খাতের সংস্থাগুলো বলছে, বাস্তবে পরিস্থিতি কতটা বদলেছে, তা এখনো যাচাই করে দেখা হচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, যুদ্ধবিরতির অবশিষ্ট যে সময় আছে, সেই সময় হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করবে। এই সময়ের জন্য হরমুজ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত।
এই ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। ইউরোপে প্যারিসের ক্যাক ও ফ্রাঙ্কফুর্টের ড্যাক্স সূচক প্রায় ২ শতাংশ করে বৃদ্ধি পায়, লন্ডনের এফটিএসই ১০০ সূচক বেড়েছে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে সামরিক হামলা চালানোর পর থেকেই হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ট্যাংকার চলাচল কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহে চাপ তৈরি হয়। ফলে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
সংঘাত শুরুর আগে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারের নিচে। একপর্যায়ে তা ১০০ ডলার ছাড়িয়ে ১১৯ ডলার পেরিয়ে যায়। এর পর থেকে অবশ্য তেলের দাম ওঠানামা করছে।
এদিকে হরমুজ খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলেও ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি বলে সতর্ক করছে আন্তর্জাতিক শিপিং সংস্থা বিমকো। সংস্থাটির নিরাপত্তাপ্রধান জ্যাকব লারসেন বলেন, প্রণালির নির্ধারিত নৌপথে মাইন বিস্ফোরণের ঝুঁকি এখনো পরিষ্কার নয়। ফলে জাহাজ চলাচল নিরাপদ হয়েছে, এ কথা আপাতত বলা যাচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) মহাসচিব আরসেনিও ডোমিঙ্গেজ জানিয়েছেন, প্রণালি আবার চালুর ঘোষণা খতিয়ে দেখা হচ্ছে, বিশেষ করে সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য নিরাপদ ও বাধাহীন চলাচল নিশ্চিত হয়েছে কি না।
তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার প্রভাব ইতিমধ্যে জ্বালানি বাজারে পড়েছে। পেট্রল ও ডিজেলের দাম বেড়েছে, জেট জ্বালানির সরবরাহ নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। এতে বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা আছে।
হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় কেবল তেল, সার, গ্যাসসহ আরও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সার তৈরির উপাদান এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, ফলে খাদ্যপণ্যের দামের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাজ্যের বাজারে এই প্রথম পেট্রল ও ডিজেলের দাম সামান্য কমার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। দেশটির মোটরিং সংস্থা আরএসি জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার থেকে দাম কিছুটা কমতে শুরু করেছে, যদিও ফেব্রুয়ারির তুলনায় তা এখনো অনেক বেশি।
এদিকে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি হয়েছে। মূলত এই যুদ্ধবিরতির পর ইরান এই ঘোষণা দেয়। ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত এবং চলাচলের জন্য প্রস্তুত। তাঁর দাবি, ভবিষ্যতে এই প্রণালি আর ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করা হবে না। তবে স্থায়ী চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ বহাল থাকবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে শিপিং খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। কেউ কেউ বলছে, তাঁরা অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত নন এবং এখনই এই পথ ব্যবহার শুরু করা যাবে না।
তেলবাহী জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান স্টেনা বাল্ক জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ইসরায়েল-লেবাননের এই যুদ্ধবিরতির কারণে তেলবাহী জাহাজ চলাচলের সুযোগ যে অনেক বেড়ে গেছে তা নয়, বরং এই সুযোগ সীমিত সময়ের জন্য। এই সময়ের মধ্যে কিছু জাহাজ প্রণালি পার হতে পারলেও পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে না।
বেইস বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক মনমোহন সোধি বলেন, সরবরাহব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কয়েক মাস সময় লাগবে। ফলে ভোক্তাদের চাপ যে দ্রুত কমবে, তেমন সম্ভাবনা কম।
Copyright © 2026 প্রভাত. All rights reserved.