প্রভাত রিপোর্ট: জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও এলপিজির নতুন মূল্য নির্ধারণ দুইয়ের চাপ একসঙ্গে পড়েছে ভোক্তাদের ওপর। সরবরাহ বাড়ানোর ঘোষণা এলেও পেট্রোল পাম্পে কমেনি দীর্ঘ লাইন। অপরদিকে নির্ধারিত দামের চেয়ে বরাবরের মতো দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে এলপিজি সিলিন্ডার। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় পাম্পগুলোতে এখনও তেল নিতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। অনেক জায়গায় সীমিত সরবরাহের কারণে অপেক্ষার সময় বাড়ছে বলে অভিযোগ গ্রাহকদের। এদিকে এলপিজির ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়। বাজারে আগে থেকেই অস্থিরতা থাকায় নির্ধারিত দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল না, এখন দাম বাড়ার পর অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দিয়েই কিনতে হচ্ছে সিলিন্ডার। সামগ্রিকভাবে জ্বালানি খাতে চাপ কমার বদলে আরও বেড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও ব্যয়ের ওপর।
গত ১৮ এপ্রিল সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সরকার। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অকটেনের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। বুধবার (২২ এপ্রিল) এই জ্বালানি প্রতি লিটার বিক্রি হয়েছে ১২০ টাকা করে। পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ১৯ টাকা আর ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে বাড়ানো হয়েছে ১৫ টাকা। নতুন দামে প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রি হবে ১১৫ টাকা করে। আর কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ করা হয়েছে। গত ১৯ এপ্রিল রাতে বিপিসির এক নির্দেশনায় জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানোর কথা জানানো হয়। এতে বলা হয়, ডিজেল ও পেট্রোল ১০ শতাংশ এবং অকটেন ২০ শতাংশ বর্ধিত হারে বরাদ্দ দেওয়া হয়।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর ১৯ এপ্রিল বাড়ানো হয় এলপিজির দাম। ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, চলতি মাসে দুই দফায় ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ানো হলো মোট ৫৯৯ টাকা।
বিইআরসি প্রতি মাসে দাম নির্ধারণের নিয়ম অনুযায়ী গত ২ এপ্রিল চলতি মাসের জন্য নতুন দামের ঘোষণা দেয়। সে সময় ১২ কেজি সিলিন্ডারের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৭২৮ টাকা—যা আগের মাসের তুলনায় ৩৮৭ টাকা বেশি। শুধু ১২ কেজি নয়—সব ওজনের সিলিন্ডার, অটো গ্যাস এবং বাসাবাড়িতে কেন্দ্রীয়ভাবে ব্যবহার করা রেটিকুলেটেড এলপিজির দামও বাড়ানো হয়৷
মার্চ মাসে শুরু হওয়া জ্বালানি তেলের সংকট থেকে বের হতে পারেনি সাধারণ মানুষ। পেট্রোল পাম্পের লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, রাতভর অপেক্ষার গল্পও এখন খবরের পাতায়। মঙ্গলবার রাজধানীর শেরাটন হোটেলের উল্টো দিকের মেঘনা পেট্রোল পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, তেলের জন্য অপেক্ষমাণ মানুষের লাইন চলে গেছে শাহবাগের দিকে। পরীবাগের গলির ভেতরে লাইনের একটা অংশ। জানতে চাইলে তাদের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নীলক্ষেত থেকে তেল নিতে আসা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী রুহুল আমিন বলেন, দাম বাড়িয়ে কোনও লাভ হয়নি। ভোগান্তি কমেনি। সরবরাহ বাড়ানোর ঘোষণা শুধু পত্রিকার পাতায়। আমরা আগের মতোই লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। অফিসের কাজের ফাঁকে বসের অনুমতি নিয়ে এসেও লাইনে দাঁড়াতে হয় অনেক সময়।
গাড়িচালকদের ক্ষোভ আরও বেশি। প্রাইভেটকারের চালক সাব্বির হোসেন এসেছেন মতিঝিল থেকে মালিকের গাড়ি নিয়ে। লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন ঘণ্টাখানেক ধরে। তিনি বলেন, মোটরসাইকেলের লাইন বরং দ্রুত যায়৷ আমাদের লাইন তো আগায়ই না। এখানকার মেঘনা পাম্পের কর্মচারীরা বলেছেন, আগের তুলনায় লাইন কম। তেল সরবরাহ ভালো। মেঘনা ছাড়া রাজধানীর বেশ কয়েকটি পাম্পে আরও বেশি ভোগান্তির কথা জানা যায়। অনেকেই তেলের জন্য সারা রাত ফিলিং স্টেশনগুলোতে অপেক্ষা করছেন।
রাজধানীর ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন, রমনা ফিলিং স্টেশন ঘুরে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। রমনা ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট গাড়ির লাইন শিল্পকলা-সেগুনবাগিচা- পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়- গণপূর্ত অধিদফতর ঘুরে পাম্পের সামনে গিয়ে ঠেকেছে। অর্থাৎ, পাম্পের সামনে লাইন দিয়ে লম্বা পথ ঘুরে তেল নিতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মিজানুর রহমান রতন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘‘তেলের দাম বাড়ানোতে কিছুটা স্বস্তি এসেছে সত্যি। কিন্তু সরবরাহ বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও চাহিদা অনুযায়ী এখনও আমরা তেল পাচ্ছি না। আগের মতোই রেশনিং করে তেল দেওয়া হচ্ছে। আমরাও দিন রাত ২৪ ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনের এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি চাই। আমরা চাহিদা অনুযায়ী তেল দেওয়ার জন্য সরকারকে বার বার অনুরোধ করছি।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর গত ৬ মার্চ সরকারি আদেশে জ্বালানি তেল সরবরাহ ২৫ শতাংশ হারে কমিয়ে দেওয়া হয়। তারপর থেকেই দুর্ভোগের শুরু। এরপর ১৫ মার্চ রেশনিং তুলে নেওয়া হলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক আর হয়নি। পরে সরকার বাধ্য হয়ে পাম্পে ট্যাগ অফিসার নিয়োগসহ মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে। তারপরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে—পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা হচ্ছে, কিন্তু মাঠে যেন হাহাকার থামছেই না। সর্বশেষ ‘ফুয়েল পাস অ্যাপ’ চালু করেছে সরকার। ঢাকার ২০টি পাম্পে এবং ঢাকাসহ ১৪ জেলায় এই পাস চালু করা হয় বাইকারদের জন্য।
এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, দেশে জ্বালানি তেলের মজুতের কোনও বড় সংকট নেই। মূলত ‘প্যানিক বায়িং’ বা প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কেনার ভীতি এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের অবৈধ মজুতের প্রবণতাই বাজারে একটি কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে।
পেট্রোল পাম্পভিত্তিক সরবরাহের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে উপদেষ্টা জানান, রাজধানীর পিডব্লিউডি স্পোর্টস ক্লাব (আসাদ গেট) পাম্পে গত বছর পুরো মাসে মোট ৩ লাখ ১৫ হাজার লিটার অকটেন সরবরাহ করা হয়। কিন্তু চলতি বছর এপ্রিলের মাত্র ১৯ দিনেই ২ লাখ ৭০ হাজার লিটার সরবরাহ করা হয়েছে। ডিজেলের ক্ষেত্রেও গত বছরের পুরো মাসের সরবরাহ (২ লাখ ২১ হাজার ৫০০ লিটার) এ বছর এপ্রিলের প্রথম ১৯ দিনেই সম্পন্ন হয়েছে।
একইভাবে সততা ফিলিং স্টেশনে (তেজগাঁও) ১৯ দিনে ১ লাখ ৮০ হাজার লিটার ডিজেল এবং পূর্বাচল ট্রেডার্সে (পরীবাগ) ১৯ দিনে গত বছরের পুরো মাসের চেয়েও বেশি অর্থাৎ ৬৭ হাজার ৫০০ লিটার পেট্রোল সরবরাহ করা হয়েছে।
জ্বালানি মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতির সর্বশেষ পরিসংখ্যান তুলে ধরে উপদেষ্টা জানান, ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ডিজেল ১ লাখ ২২ হাজার ৬৩৩ মেট্রিক টন, অকটেন ২৭ হাজার ৬০২ মেট্রিক টন, পেট্রোল ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫৪ মেট্রিক টন এবং জেট ফুয়েল ২১ হাজার ৩৮২ মেট্রিক টন মজুত ছিল। উপদেষ্টা বলেন, ‘সাপ্লাইয়ের বড় কোনও সংকট নেই। নতুন জ্বালানি নিয়ে জাহাজ আসছে। কিন্তু প্যানিক বায়িংয়ের কারণে চাহিদা এখন স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।’
তেলের মতো এলপিজির গ্রাহকদের ভোগান্তিও চরমে। ১২ কেজি সিলিন্ডার মঙ্গলবার বিক্রি হয়েছে ২১০০ টাকা দামে। অথচ বিইআরসি দাম নির্ধারণ করেছে ১ হাজার ৯৪০ টাকা। পশ্চিম ধানমন্ডিতে অবস্থিত তাকওয়া এন্টারপ্রাইজের ডিলার জানান, এর চেয়ে কম দামে বিক্রি করা সম্ভব না। তাদেরও নাকি বেশি দামেই কিনে আনতে হচ্ছে। কাঠালবাগানের জাকির ট্রেডার্স মালিক জানান, ১২ কেজির সিলিন্ডার ২৩০০ টাকার নিচে বিক্রি করা সম্ভব নয়। কেন এত দাম জানতে চাইলে এই ডিলার বলেছেন, চাহিদার তুলনায় সিলিন্ডার কম পাওয়া যায়, যা পাওয়া তাও বাড়তি দাম দিয়ে আনতে হয়।
এলপিজি ব্যবহারকারী গ্রাহকরা বলেছেন, দাম অনেক সময় ২৫০০ পর্যন্ত ওঠে। মাসের শুরুতেই কেউ কেউ কিনেছেন প্রতি সিলিন্ডার ২২০০/২৩০০ টাকা করে। রামপুরা উলনের বাসিন্দা কাজী মিলি জানান, এলপিজির দাম কখনোই সরকার নির্ধারিত দামে কিনতে পারেননি তিনি। তিনি বলেন, কোথায় আসলে সরকারি দামে পাওয়া যায়, সেটা জানা গেলে উপকার হতো। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিইআরসির তরফ থেকে বরাবরই বলা হয়, তারা বেশি দামে কেনার অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। অভিযোগ না পেলে এটা তদারকি করা কঠিন।
জ্বালানির এই সংকটময় পরিস্থিতি কীভাবে কাটিয়ে ওঠা যায় জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘‘সরবরাহ বাড়ানোর তো কোনও লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি না। কথার সঙ্গে বাস্তবতার তো কোনও মিল নেই।’’ আগে যেসব পাম্প চালু ছিল তার মধ্যে আজকে কয়েকটা বন্ধ দেখলাম জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘সরকারের উচিত চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ বাড়ানো। অতিরিক্ত চাহিদা হলে সে অনুযায়ীই সরবরাহ করা। তারা তো বলছে অতিরিক্ত মজুত আছে। তাহলে তেল দিতে সমস্যা কোথায়?’’ ম. তামিম বলেন, ‘‘যখন ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার মিল থাকে না, তখনই মানুষের মনে আতঙ্ক বাড়ে। অনাস্থার জন্ম নেয়।’’