প্রভাত ডেস্ক: প্রায় দুই দশক পর লন্ডন থেকে দেশে ফেরার মাত্র দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন তারেক রহমান। এক সময় যেমন তার বাবা-মা দেশ শাসন করেছিলেন, ইতিহাস যেন আবার সেই মোড়েই ফিরছে।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স মঙ্গলবার (১০ জানুয়ারি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জনমত জরিপের পূর্বাভাস সত্যি হলে বৃহস্পতিবারের (১২ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন ৬০ বছর বয়সী এই শান্তস্বভাব নেতার জন্য হবে এক বিস্ময়কর রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি সপরিবারে লন্ডনে চলে যান।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন তার দল বিএনপির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ও দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে তারেক রহমান পান বীরোচিত সংবর্ধনা। বর্তমানে শেখ হাসিনা নয়াদিল্লিতে নির্বাসনে রয়েছেন। শেখ হাসিনা ও তারেক রহমানের মা খালেদা জিয়া দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছেন। তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম নেতা এবং ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত দেশের শাসনভার পরিচালনা করেন।
তারেক রহমান বলেছেন, তিনি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব নতুনভাবে গড়ে তুলতে চান, যাতে বিনিয়োগ বাড়ে। তবে কোনো একক শক্তির ওপর দেশ অতিরিক্তভাবে নির্ভরশীল না হয়ে পড়ে। এটি শেখ হাসিনার নীতির বিপরীত, যিনি দিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের জন্য পরিচিত ছিলেন। তিনি দরিদ্র পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পাশাপাশি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে খেলনা ও চামড়াজাত পণ্যের মতো শিল্পখাতে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। স্বৈরাচারী প্রবণতা ঠেকাতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই দফায়, অর্থাৎ ১০ বছরে সীমাবদ্ধ রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন।
কার্ডিওলজিস্ট স্ত্রী ও ব্যারিস্টার কন্যাকে নিয়ে ঢাকায় ফেরার পর থেকে ঘটনাপ্রবাহ এত দ্রুত এগিয়েছে যে, নিজের সময় কীভাবে কেটেছে তা ভাবার সুযোগই পাননি বলে জানান তিনি।
বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে কন্যা জায়মা রহমানকে পাশে নিয়ে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, আমরা দেশে ফেরার পর প্রতিটি মিনিট কীভাবে কেটেছে, তা আমি নিজেও জানি না। ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকায় জন্ম তারেক রহমানের। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও তা সম্পন্ন করেননি। পরে বস্ত্র ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন।
দেশে ফেরার পর তিনি নিজেকে একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন, যিনি শেখ হাসিনার শাসনামলে নিজের পরিবারের ওপর হওয়া নিপীড়নের ঊর্ধ্বে উঠে সামনে এগোতে চান। তার ভাষায়, প্রতিশোধে কী আসে? প্রতিশোধ মানুষকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। এতে ভালো কিছু হয় না। এই মুহূর্তে দেশের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজন শান্তি ও স্থিতিশীলতা।
শেখ হাসিনার শাসনামলে তারেক রহমান একাধিক দুর্নীতি মামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু হন এবং অনুপস্থিতিতেই কয়েকটি মামলায় দণ্ডিত হন। ২০০৪ সালে শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় ২০১৮ সালে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে তিনি সব অভিযোগ বরাবরই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সব মামলায় তিনি খালাস পান।
লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, কীভাবে একের পর এক নির্বাচনে তার দল কোণঠাসা হয়েছে, শীর্ষ নেতারা কারাগারে গেছেন, কর্মীরা নিখোঁজ হয়েছেন এবং দলীয় কার্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে।
দেশে ফিরে তিনি সংযত ও পরিমিত ভাষায় কথা বলছেন, উসকানিমূলক বক্তব্য এড়িয়ে চলছেন এবং সংযম ও সমঝোতার আহ্বান জানাচ্ছেন। তিনি ‘রাষ্ট্রের ওপর জনগণের মালিকানা’ ফিরিয়ে আনা এবং প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কথা বলছেন, যা নতুন সূচনার আশায় থাকা বিএনপি সমর্থকদের উজ্জীবিত করেছে।
তারেক রহমানের পরিবারে রয়েছে সাইবেরিয়ান জাতের আদুরে বিড়াল ‘জেবু’, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জেবু সম্পর্কে তার মেয়ে জায়মা রহমান বলেন, ওর বয়স সাত বছর। ও আধা সাইবেরিয়ান।
দলের ভেতরে তারেক রহমানের নিয়ন্ত্রণ এখন দৃঢ়। দলীয় সূত্রগুলো জানায়, প্রার্থী নির্বাচন, কৌশল নির্ধারণ ও জোট আলোচনা সবকিছুই তিনি সরাসরি তদারকি করছেন, যা একসময় বিদেশে বসেই করতেন।
তারেক রহমানের ভাষায়, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও তা টিকিয়ে রাখাই হবে তার সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। তিনি বলেন, গণতন্ত্র চর্চার মাধ্যমেই আমরা সমৃদ্ধ হতে পারি এবং দেশ পুনর্গঠন করতে পারি। গণতন্ত্র থাকলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়। তাই আমরা গণতন্ত্র চর্চা করতে চাই, আমরা আমাদের দেশকে নতুন করে গড়ে তুলতে চাই।