প্রভাত রিপোর্ট: আগামীকাল বৃহস্পতিবার ( ১২ ফেব্রুয়ারি ) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন ঘিরে ব্যস্ত সময় পার করছে ইসি ও রাজনৈতিক দলগুলো। এরই মধ্যে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ প্রধান দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। ইশতেহারে বড় বড় উন্নয়ন পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ স্বপ্নের কথা তুলে ধরা হলেও, অবহেলিত রয়ে গেছে রাজধানী ঢাকার নাগরিক জীবনের সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক দুটি সমস্যা— ফুটপাত দখল এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল।
রাজধানীর যানজট বৃদ্ধি, সড়ক দুর্ঘটনা এবং পথচারীদের চরম ভোগান্তির পেছনে এই দুটি সমস্যার সরাসরি প্রভাব থাকলেও দলগুলোর ইশতেহারে এর কার্যকর কোনো সমাধান বা অঙ্গীকার প্রায় অনুপস্থিত।
বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ সব রাজনৈতিক দলের ইশতেহার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেখানে খাতভিত্তিক ব্যাপক উন্নয়ন ও পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করা হলেও উপরের দুই বিষয় নিয়ে বিস্তারিত তেমন কোনো পরিকল্পনা নেই। গত ৬ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে দলটি। ৫১ দফার এই ইশতেহারকে ‘রেনেসাঁ’ বা ‘পরিবর্তনের ইশতেহার’ হিসেবে দাবি করেছেন দলটির নেতারা। সেখানে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘রাষ্ট্র সংস্কার’ এবং ‘জনগণের ক্ষমতায়ন’-কে মূল প্রতিপাদ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছে। যেখানে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, প্রবাসী কার্ড, বেকার ভাতা, জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দুর্নীতি দমন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল, জ্বালানি ও কৃষি, পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা, জাতীয় স্বার্থ প্রাধান্যসহ উন্নয়ন পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ স্বপ্নের কথা তুলে ধরা হলেও রাজধানীর প্রধান ও নিত্যদিনের সমস্যা ফুটপাত ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
‘ফুটপাত’ সম্পর্কে ইশতেহারে বলা হয়েছে, হকারদের উচ্ছেদ না করে তাদের জন্য ‘হকার্স জোন’ বা ‘নির্ধারিত বিপণন এলাকা’ তৈরি করা হবে। আর ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিষয়ে ইশতেহারে বলা হয়েছে, ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোকে একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর আওতায় আনতে যথাযথ রেজিস্ট্রেশন বা লাইসেন্স প্রদান করা হবে। যানজট নিরসনে বড় রাস্তা বা হাইওয়ে বাদ দিয়ে পাড়া-মহল্লা বা অভ্যন্তরীণ রাস্তায় এসব রিকশা চলাচলের অনুমতি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
জামায়াত তাদের ২৬ দফার অগ্রাধিকার তালিকায় রাজধানীর এই জ্বলন্ত সমস্যা দুটি নিয়ে সরাসরি কিছু উল্লেখ করেনি। তবে তারা ক্ষমতায় গেলে ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি, অটোরিকশার জন্য চার্জিং স্টেশন স্থাপন এবং অনিরাপদ অটোরিকশাগুলোর ডিজাইন পরিবর্তনের মাধ্যমে সেগুলোকে নিরাপদ ও লাইসেন্সের আওতায় আনার সাধারণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এছাড়া জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ, ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠন, যুবকদের ক্ষমতায়ন, নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়ন, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন, প্রযুক্তিনির্ভর সমাজ গঠন, ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ, বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব টেকসই ও স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ, সুসংহত ও কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা, রাষ্ট্র পরিচালনায় জুলাইয়ের স্বপ্নকে ধারণ করা, কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা, ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা এবং ‘তিন শূন্য ভিশন’ বাস্তবায়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিতে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান তৈরির ঘোষণা আছে।
১১ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক এই নতুন দলটির ৩৬ দফার ইশতেহারে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার ও ডিজিটাল সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর ফুটপাত নিয়ে তাদের পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ফুটপাত ব্যবসায়ীদের সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার মাধ্যমে বৈধ ও করের আওতায় এনে চাঁদাবাজি বন্ধ করা হবে। তবে অটোরিকশা নিয়ে তাদের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দেখা যায়নি।
২৮ দফার ইশতেহারে দলটি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও সুশাসনের ওপর ব্যাপক জোর দিলেও রাজধানীর ফুটপাত দখল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সমস্যা সমাধানে কোনো আলোকপাত করেনি।
ধানমন্ডির বাসিন্দা জাকির হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঢাকার প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি পর্যন্ত এখন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার রাজত্ব। কোনো নীতিমালা ছাড়াই এগুলো চলছে, ফলে প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ঘটছে। অন্যদিকে, ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় আমাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে হচ্ছে। আমরা ইশতেহারে এই ভোগান্তি অবসরের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি চেয়েছিলাম, কিন্তু দলগুলো আমাদের হতাশ করেছে।’
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আজগর আলী বলেন, ‘অটোরিকশা ও ফুটপাত দখলের সমস্যাটি কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি নগর ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। বড় বড় প্রজেক্টের ভিড়ে আমাদের প্রতিদিনের হাঁটাচলার অধিকার ও নিরাপত্তা ইশতেহারে হারিয়ে গেছে।’
রাজধানীর টেকসই ও বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে এসব সমস্যার জন্য স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রয়োজন। অন্যথায় উন্নয়নের বড় বড় বুলি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ভোগান্তি কমাতে ব্যর্থ হবে— যোগ করেন তিনি।