প্রভাত রিপোর্ট: অবশেষে শেষ হলো অপেক্ষার পালা। আগামীকাল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সারা দেশে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে। এর ৪৮ ঘণ্টা আগে প্রচার কার্যক্রম শেষ করার নিয়ম মেনেই মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টায় সারা দেশে সব ধরনের প্রচারের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হয়েছে। এর পরও নানাভাবে অনানুষ্ঠানিক প্রচার এবং পোলিং এজেন্ট চূড়ান্তকরণে ব্যস্ত রয়েছেন প্রার্থীরা। দেশ এক নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রার দ্বারপ্রান্তে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর নানা শঙ্কা ও গুঞ্জন ছিল তারা হয়তো দীর্ঘমেয়াদে থেকে যাবেন। আস্থার ঘাটতি ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও। তবে সব ধরনের শঙ্কা ও গুঞ্জন উড়িয়ে দিয়ে দেড় বছরের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভোটগ্রহণের যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন। সারা দেশে এরই মধ্যে পৌঁছে গেছে বিশাল এ যজ্ঞের নানা সরঞ্জাম। দেশজুড়ে এখন উৎসবের আমেজ ও টানটান উত্তেজনা। আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে প্রায় ৮ লাখ কর্মকর্তা নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী, এ নির্বাচনে মোট ৬৯ জন রিটার্নিং অফিসার ও ৫৯৮ জন সহকারী রিটার্নিং অফিসার দায়িত্বে থাকবেন।
সারা দেশে মোট ভোটকেন্দ্র ৪২ হাজার ৭৭৯টি। এর মধ্যে সাধারণ ভোটকেন্দ্র ২১ হাজার ২৭৩টি এবং গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্র ২১ হাজার ৫০৬টি।
ভোটগ্রহণ পরিচালনায় প্রিজাইডিং অফিসার থাকবেন ৪২ হাজার ৭৭৯ জন। সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন। পোলিং অফিসার থাকবেন ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ জন। সব মিলিয়ে মোট ৭ লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন কর্মকর্তা নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবেন।
ইসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন। আসন সংখ্যা ২৯৯টি (একটি আসনে প্রার্থীর মৃত্যুতে নির্বাচন স্থগিত)। নির্বাচনে অংশ নেয়া নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ৫১টি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পতন হওয়া রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত হওয়ায় এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। এবারের নির্বাচনে ২ হাজার ২৮ প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে নারী প্রার্থী রয়েছেন ৮১ জন। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৫ জন। নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। দলটির প্রতীক ‘ধানের শীষ’ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২৯১ জন প্রার্থী। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৫৮ জন প্রার্থী ‘হাতপাখা’ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জামায়াতের ২২৯ জন প্রার্থী ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন ১৯৮ জন প্রার্থী। আর ৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন ৩২ প্রার্থী। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ৭৬ জন ‘ফুটবল’ প্রতীক নিয়ে মাঠে রয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত ৮১টি সংস্থার মোট ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন দেশি পর্যবেক্ষককে এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োজিত থাকবেন ৭ হাজার ৯৯৭ জন। আর বিভিন্ন সংসদীয় এলাকায় ছড়িয়ে থাকা ৪৭ হাজার ৪৫৭ জন পর্যবেক্ষক স্থানীয়ভাবে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন। দেশীয় পর্যবেক্ষকদের পাশাপাশি এবারের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক। নির্বাচনের মোট ভোটকেন্দ্র রয়েছে মোট ৪২ হাজার ৬৫৯টি (এর মধ্যে স্থায়ী কেন্দ্রের পাশাপাশি দুর্গম এলাকায় কিছু অস্থায়ী কেন্দ্রও রয়েছে)। মোট বুথ (ভোটকক্ষ) রয়েছে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি। এর মধ্যে পুরুষ বুথ প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার ১৩৭টি। আর নারী বুথ রয়েছে প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার ৬০২টি। এবার সবচেয়ে বেশি কেন্দ্র রয়েছে ঢাকা বিভাগে এবং সবচেয়ে বড় নির্বাচনী এলাকা হিসেবে গাজীপুর-২ আসনে কেন্দ্রের সংখ্যা অন্যান্য আসনের তুলনায় অনেক বেশি।
সারা দেশে ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণের জন্য মোট ৮ লাখের বেশি কর্মকর্তাকে চূড়ান্ত নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্ত থাকছেন ৪২ হাজার ৭৭৯ জন। সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন (প্রতিটি ভোটকক্ষের বা বুথের জন্য ১ জন)। আর পোলিং অফিসার হিসেবে থাকছেন ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ জন (প্রতিটি ভোটকক্ষের জন্য ২ জন)।
এবারের নির্বাচনে ভোটারদের দুটি পৃথক ব্যালট পেপার দেয়া হবে। একটিতে থাকবে সংসদীয় আসনের পছন্দের প্রার্থীর প্রতীক এবং অন্যটিতে থাকবে সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন বা ‘জুলাই সনদ’ অনুমোদনের পক্ষে-বিপক্ষে ভোট দেওয়ার সুযোগ।
ইসি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মোট ৯ লাখ ৭০ হাজার ৯৪৮ জন নিরাপত্তা সদস্যের নির্বাচনী দায়িত্বে থাকার কথা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন সেনাবাহিনীর ১ লাখ ৩ জন সদস্য। এ ছাড়া নৌবাহিনীর ৫ হাজার, বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০, বিজিবির ৩৭ হাজার ৪৫৩, কোস্টগার্ডের তিন হাজার ৫৮৫, পুলিশের ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩, র্যাবের ৯ হাজার ৩৪৯ এবং আনসার ও ভিডিপির ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৪৮৩ জন সদস্য মোতায়েন থাকবেন। এর বাইরে ১ হাজার ৯২২ জন বিএনসিসি ক্যাডেট এবং ৪৫ হাজার ৮২০ জন গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার ও দফাদার) দায়িত্ব পালন করবেন। নৌবাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন উপকূলীয় ১৭টি আসনের ২৪টি উপজেলায় ও দুটি সিটি করপোরেশনে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রয়েছেন ২ হাজার ১০০ জন। আর ৯৫৭ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট। বিচারিক হাকিমরা দায়িত্ব পালনকালে কোনো নির্বাচনী অপরাধ বিচারার্থে আমলে নিলে যথাসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে বিচার (সামারি ট্রায়াল) নিষ্পত্তি করবেন এবং এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন ইসি সচিবালয়ের উপসচিব (আইন-১ শাখা) বরাবর নির্দিষ্ট ছকে পাঠাবেন।
নির্বাচন উপলক্ষে মোটরসাইকেল চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে, যা শুক্রবার মধ্যরাত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। এ ছাড়া ট্যাক্সি ক্যাব, মাইক্রোবাস, জিপ, পিকআপ, কার, বাস, ট্রাক ও ইজিবাইক চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শুরু হচ্ছে বুধবার রাত ১২টা থেকে, যা বৃহস্পতিবার মধ্যরাত পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এ সময় শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, প্রশাসনের সদস্য ও অনুমোদিত পর্যবেক্ষক, জরুরি সেবার যানবাহন, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অভিন্ন কাজে ব্যবহৃত জিনিসপত্র এবং সংবাদপত্র বহনকারী সব ধরনের যানবাহন, দূরপাল্লার যানবাহন, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের এজেন্টদের ক্ষেত্রে এ বিধিনিষেধ শিথিল করা হবে। সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক, নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, জাতীয় মহাসড়ক, প্রধান আন্তঃজেলা রুট, মহাসড়ক এবং প্রধান মহাসড়কের সংযোগ সড়কের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ শিথিল করা হবে।
ইসির ‘স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি’ নামের অ্যাপে ভোটার নম্বর, কেন্দ্রের নাম ও অবস্থান, ভোট পড়ার হার, প্রার্থীদের হলফনামাসহ নির্বাচনের বিভিন্ন তুলনামূলক চিত্র ঘরে বসেই জেনে নিতে পারবেন আগ্রহীরা। দুই ঘণ্টা পরপর আসনভিত্তিক ভোট পড়ার হারও জানানো হবে সেখানে। অ্যান্ড্রয়েড ও অ্যাপল উভয় প্লে স্টোরে অ্যাপটি পাওয়া যাবে। অ্যাপটি ব্যবহার করতে হলে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মতারিখ ও মোবাইল নম্বর দিয়ে নিবন্ধন করতে হয়। পরে জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মতারিখ দিলেই মিলবে তথ্য। পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রবাসী, আইনি হেফাজতে থাকা ব্যক্তি ও পেশাগত কাজে ব্যস্ত ভোটাররা এরই মধ্যে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।
নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, পোস্টাল ভোট গতকাল সকাল পর্যন্ত ৭ লাখ ৩০ হাজারে পৌঁছেছে। ভোট পর্যবেক্ষণে ড্রোন, বডিওর্ন ক্যামেরা থাকছে। নজরদারি নিশ্চিতে ৯০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা আছে। বডিওর্ন ক্যামেরার ফিড ইসির কাছে থাকবে। যেখানে ইসির ক্রিটিকাল সিদ্ধান্ত নিতে হবে, সেখানে এ ফিড প্রয়োজন হবে।