প্রভাত স্পোর্টস: একটা সিনেমা কি কারও জীবন বদলে দিতে পারে? উত্তরটা ‘না’–ই হওয়ার কথা বেশির ভাগ মানুষের কাছে। কিন্তু পাকিস্তানের স্পিনার উসমান তারিকের কথা আলাদা। একটা সিনেমা তাঁর জীবনটা শুধু বদলেই দেয়নি, এখন যে কেউ তাঁকে নিয়েও সিনেমা বানিয়ে ফেলতে পারেন চাইলে।
অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে পাকিস্তান ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন দুবাইয়ে। সেখানে সেলসম্যানের চাকরি করতে করতে ছেড়ে দিয়েছিলেন ছোটবেলা থেকে লালন করা ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নও। কিন্তু হুট করে একটা সিনেমা আবার তাঁর পথ বদলে দিয়ে ফিরিয়ে আনে ক্রিকেটে—ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নে যে সাহসটুকু দরকার ছিল, উসমান পেয়ে যান তা।
ধোনির বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক হওয়ার গল্প উসমান তারিককে এতটাই অনুপ্রাণিত করেছিল যে দুবাই ছেড়ে তিনি চলে যান পাকিস্তানে। গল্পটা তাঁর মুখেই শুনুন, ‘ক্রিকেটে নাম করব, এমন আশা একসময় ছেড়েই দিয়েছিলাম। কিন্তু হঠাৎ একদিন এই সিনেমাটা দেখলাম, পরে মনে হলো আমিও তো এমন হতে পারি।’
দেশে ফেরার পর এক বন্ধু উসমান তারিককে পরিচয় করিয়ে দেন পাকিস্তানের ওপেনার ফখর জামানের সঙ্গে। ফখর তাঁকে নিয়ে যান খাইবার পাখতুনখাওয়াতে ক্রিকেট একাডেমি চালানো ওয়াজাহাতুল্লাহ ওয়াস্তির কাছে।
সেদিনের ঘটনাটা এখনো যেন চোখের সামনে ভাসে পাকিস্তানের সাবেক এই ক্রিকেটার, ‘ফখর জামান আমার কাছে তরুণ ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ একটা ছেলেকে নিয়ে এসেছিল। আমি বিস্ময়ের সঙ্গে ওর বোলিং দেখেছিলাম—ওকে খুবই আলাদা মনে হয়েছিল। আমি ওকে একটু বেশি গতিতে বল করার পরামর্শ দিয়েছিলাম। আজ সে নিজের নাম করে নিয়েছে।’
কতটা নাম করেছেন ওয়াজাহাতুল্লাহর ছাত্র উসমান? উত্তরটা এত দিনে জেনে যাওয়ার কথা ক্রিকেটানুরাগীদের। পাকিস্তানের হয়ে মাত্র তিন মাস আগে অভিষেক হলেও অদ্ভুত অ্যাকশনের কারণে পরিচিতি পেয়ে গেছেন দুনিয়াজুড়ে।
শুধু তো আর অ্যাকশন নয়, রোমাঞ্চের জীবন পাড়ি দিয়ে আগামীকাল টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচে কলম্বোতে উসমান সেই ধোনির ভারতের বিপক্ষেই খেলতে নামবেন। পাকিস্তান অধিনায়ক সালমান আগার কাছে যিনি ‘এক্স ফ্যাক্টর’ আর ‘মূল অস্ত্র’ও হয়ে উঠেছেন পারফরম্যান্সের কারণে।
আন্তর্জাতিক টি–টুয়েন্টিতে ৪ ম্যাচে পেয়েছেন ১১ উইকেট। তবে বল হাতে উসমানের এই সাফল্য আড়াল হয়ে যাচ্ছে ওই অ্যাকশনের কারণে। স্লিঙ্গিং অ্যাকশনের অফ ব্রেকটা করতে এসে বল ছোড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে উসমান থেমে যান বলে অস্বস্তিতে পড়ে যান ব্যাটসম্যানরা।
এ জন্য দুবার বোলিং অ্যাকশন ‘বৈধ’ কি না সেই পরীক্ষা দিতে হয়েছে উসমান তারিককে, দুবারই তিনি পাস করে গেছেন। আলোচনা তবু থামছে না। এই টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপের আগেই অস্ট্রেলিয়া সিরিজে তাঁর বলে আউট হয়ে বিরক্তিটা লুকাতে পারেননি ক্যামেরন গ্রিন। ডাগআউটে এসে উসমান তারিকের বোলিং অ্যাকশন ভেঙাতেও দেখা গেছে তাঁকে।
উসমান অবশ্য পাশেও পাচ্ছেন অনেককে। ভারতের সাবেক স্পিনার রবিচন্দ্রন অশ্বিনই যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘ব্যাটসম্যানরা তো আম্পায়ার বা বোলারকে না জানিয়েই সুইচ হিট অথবা রিভার্স শট খেলে, তাহলে বাধাটা কেন শুধু বোলারদের জন্যই থাকবে?’
উসমান তারিকের বোলিংটা তাই ‘বৈধ’ বলেই মনে করেন অশ্বিন। নিজের বোলিং নিয়ে আত্মবিশ্বাসী উসমানও, ‘দুবার আমি বোলিং অ্যাকশন পরীক্ষা দিয়েছি, আমি তাই আত্মবিশ্বাসী যে অ্যাকশনটা বৈধ। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি, এসব ভিত্তিহীন প্রশ্ন নিয়ে তাই আমি চিন্তিত নই।’
লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে একটা গন্তব্য উসমান তারিক খুঁজে পেয়েছিলেন গত বছর নভেম্বরে। জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার সেই গল্পটাও ছিল নাটকীয়। উসমানের মুখে গল্পটা শুনতে শুনতেই লেখাটা শেষ করা যাক, ‘কোচ আমাকে বলল যে জাতীয় দলে ডাক পেয়েছি। তখন আমি বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত। শুরুতে ভেবেছিলাম, হয়তো মজা করছেন, কিন্তু আসলে তা সত্যি ছিল। স্ত্রী–ই আসলে ভাগ্যটা নিয়ে এসেছে!’