প্রভাত অর্থনীতি: আগামীকাল মঙ্গলবার নতুন সরকার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে, তার আগে এটি ছিল না কেবল একটি আবেদন, বরং বাংলাদেশের সিরামিক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিসিএমইএ) সভাপতি মইনুল ইসলামের ভাষ্যমতে—একটি সুস্পষ্ট প্রেসক্রিপশন। তিনি বলেন, “টেক্সটাইল থেকে গার্মেন্টস, সিরামিক—সব শিল্পই বাড়বে, যদি আমরা জ্বালানি পাই।”এই একক দাবিতেই প্রতিফলিত হচ্ছে আগত সরকারের সামনে থাকা সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও কঠিন চ্যালেঞ্জ—জ্বালানি খাতকে স্থিতিশীল করে ইতোমধ্যে চাপের মুখে থাকা অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনা। চাপের মুখে থাকা বিদ্যুৎখাতের কথাই ধরুন।
স্থানীয় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের (আইপিপি) কাছে সরকারের বকেয়া রয়েছে ১৩ হাজার থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকা। যৌথ উদ্যোগভিত্তিক কেন্দ্রগুলো যুক্ত করলে মোট বকেয়া ২৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি হতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিপ্পা)।
সম্প্রতি সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, বকেয়ার অন্তত ৬০ শতাংশ দ্রুত পরিশোধ না করা হলে উৎপাদকদের অনেকেরই বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করা ছাড়া উপায় থাকবে না। এতে রমজান ও গ্রীষ্মের চাহিদার সর্বোচ্চ বা পিক মৌসুমের আগে নাজুক বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় আরও সংকট তৈরি হতে পারে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল এনালাইসিসের (আইইইএফএ) বাংলাদেশ-বিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম জানান, গত অর্থবছরে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো গড়ে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১০.৭৩ শতাংশ সরবরাহ করেছে। মার্চ থেকে মে সময়কালে এই অবদান বেড়ে ১১.২৭ থেকে ১২.৫ শতাংশে দাঁড়ায়—যা বার্ষিক গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
তিনি সতর্ক করে বলেন, “বকেয়া বিল নিয়ে বিরোধের কারণে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সরবরাহ বন্ধ হলে গ্রীষ্মে তীব্র লোডশেডিং দেখা দেবে।”এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মুদ্রার মানের চাপ ও আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ব্যবস্থাপনায় লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা—ফলে নীতিনির্ধারকদের সামনে নড়াচড়ার সুযোগও সীমিত।
বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া তাৎক্ষণিক আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করলেও—গ্যাসের পরিস্থিতি আরও গভীর কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একাধিক দফায় মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও গ্যাস সরবরাহ কমতেই রয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ১৪ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি, আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে মোট গ্যাস সরবরাহ দাঁড়ায় ১,৯৫৮ এমএমসিএফডি, যেখানে উৎপাদন সক্ষমতা ৩,৮৫৪ এমএমসিএফডি। গত ৩১ ডিসেম্বর এই সরবরাহ ছিল ২,৫৫৮ এমএমসিএফডির বেশি। শুধু আমদানি করা এলএনজির সরবরাহই ১৪ ফেব্রুয়ারি কমে ৫৭১ এমএমসিএফডিতে নেমে আসে, যা ডিসেম্বরের শেষে ছিল ৮২২ এমএমসিএফডি।
শিল্পখাতের জন্য, বিশেষ করে টেক্সটাইল খাতে, এটি সামান্য অসুবিধা নয়—বরং উৎপাদন কার্যক্রমে বড় বাধা। অনিশ্চিত গ্যাস সরবরাহের কারণে অনেক কারখানাই সক্ষমতার অনেক নিচে চলছে।
লিটল গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, “প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ পেলে টেক্সটাইল মিলের উৎপাদন ২৫ থেকে ২৮ শতাংশ বাড়বে এবং খরচ ৭ শতাংশ কমবে।”
তার দাবি, অনেক শিল্পপতি অব্যবস্থাপনার কারণে নয়, বরং গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ঋণখেলাপিতে পড়েছেন।
বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতির দায়িত্বও পালন করা খোরশেদ আলম বলেন, “স্পষ্ট গ্যাস নীতি থাকতে হবে। না হলে দেশীয় বা বিদেশি—কোনো বিনিয়োগই আসবে না।” অর্থাৎ জ্বালানি সংকট সরাসরি ব্যাংকিং খাতের চাপ বাড়াতে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দ্বিধা বা সংশয়ে ভূমিকা রাখছে।
তবে জ্বালানি সংকটই একমাত্র সমস্যা নয়; এটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার দৃশ্যমান অংশ মাত্র। মইনুল ইসলাম জানান, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ— মোট ঋণের ৩০ শতাংশ ছাড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর সঙ্গে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিষয়ও নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, প্রায় পক্ষাঘাতগ্রস্ত আমলাতন্ত্রকে পুনরুজ্জীবিত করাও বড় পরীক্ষা হবে। একইসঙ্গে তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চলমান সংস্কারমূলক পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানান।
গবেষণা সংস্থা–পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম মাসরুর রিয়াজ চারটি তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকারের কথা বলেন—সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সংহত করা, প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তিগুলো পুনরুজ্জীবিত করা, অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠন এবং সময়সীমাবদ্ধ সংস্কার বাস্তবায়ন। তিনি বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা এসেছে; কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ ও মন্থর আমদানির প্রেক্ষাপটে সেটিকে আরও সংহত করতে হবে।”
বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। কোভিড-১৯ মহামারির ধাক্কা সামাল দিতে না পেরে ক্ষুদ্র ও অতি ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলো এখনও তীব্র চাপে রয়েছে। প্রবৃদ্ধির এই ইঞ্জিনগুলোকে সচল করাই হবে গতি ফিরিয়ে আনার মূল চাবিকাঠি।
মাসরুর জোর দিয়ে বলেন, অর্থনৈতিক শাসন, শুল্ক আধুনিকীকরণ, কর কাঠামোর যৌক্তিকীকরণ ও বাণিজ্য সহজীকরণ—এসব অন্তর্ভুক্ত করে সময়সীমাবদ্ধ সংস্কার কর্মসূচি প্রয়োজন, যা বিনিয়োগ টানতে ও রপ্তানি বাড়াতে অপরিহার্য। জ্বালানি ও বিনিয়োগ মন্থরতার প্রভাব শ্রমবাজারেও স্পষ্ট হচ্ছে।
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ২০ লাখ কর্মসংস্থান কমেছে, এবং ২০২৫ সালে আরও ৮ লাখ কমারও পূর্বাভাস দেয়। ধীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও স্বল্প দক্ষ শ্রমিকদের প্রকৃত আয় বৃদ্ধির শ্লথগতির কারণে—শ্রম আয় দুর্বল হয়েছে।
নারী ও তরুণরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, কারণ উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান স্থবির হয়ে কম উৎপাদনশীল খাতে সরে গেছে। দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে; ২০২৫ সালের জন্য মূল্যবৃদ্ধির পূর্বাভাস ছিল কোভিড-১৯ মহামারির সময়কার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ফলে দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২১.২ শতাংশে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ধারাবাহিক দারিদ্র্য হ্রাসের মডেল হিসেবে বিবেচিত হতো। সেই বয়ান এখন চাপের মুখে।
পুনরুদ্ধারে সময় লাগবে, তবু দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে।
বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ড. কে এ এস মুর্শিদ বলেন, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনরুদ্ধার রাতারাতি সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের তুলনায় নতুন সরকার ভালো ভিত্তি পাবে। তবে অর্থবহ পুনরুদ্ধার দেখতে প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে।”
এ মুহূর্তে নতুন সরকারের কাছে শিল্পমহলের বার্তা পরিষ্কার—জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করুন, বকেয়া পরিশোধ করুন, নীতিগত পূর্বানুমেয়তা ফিরিয়ে আনুন।
বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রবৃদ্ধি—সবই তারপর আসতে পারে। কিন্তু নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও গ্যাস ছাড়া পুনরুদ্ধার কেবল প্রতিশ্রুতিই থেকে যেতে পারে, বাস্তব সম্ভাবনা নয়।