• বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৪৭ অপরাহ্ন
বিশ্লেষণ...........

ইরান যুদ্ধে বিশ্বজুড়ে যেভাবে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে

প্রভাত রিপোর্ট / ১৩৮ বার
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬


…………………….সাইফুর রহমান……………………….

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের মেঘ কখনো পুরোপুরি কাটে না। কিন্তু ইরানকে ঘিরে যে উত্তেজনা বছরের পর বছর ধরে জমে উঠছে, তা এবার নতুন মাত্রা নিচ্ছে। পারমাণবিক কর্মসূচি, ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত, প্রক্সি যুদ্ধ এবং আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার চাপ — এই সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক বিন্দুতে পৌঁছেছে যেখানে একটি পূর্ণমাত্রার সামরিক সংঘাতকে আর একেবারে অসম্ভব বলা যাচ্ছে না।
কিন্তু যুদ্ধটা শুধু বোমা আর রকেটের গল্প হবে না। এর আঁচ পড়বে অনেক দূর — বাংলাদেশের কৃষক থেকে শুরু করে আফ্রিকার দরিদ্র জনগোষ্ঠী পর্যন্ত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানে যুদ্ধ পূর্ণদমে লাগলে বিশ্বজুড়ে যে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে, তা ২০০৮ ও ২০২২ সালের খাদ্য সংকটকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই সংকটের সবচেয়ে বড় কারণগুলোর মধ্যে সবার আগে আসে একটি নাম — সার।
সারের বাজারে ইরান: যে নির্ভরতার কথা আমরা ভুলে গিয়েছি
আধুনিক কৃষির মেরুদণ্ড হলো নাইট্রোজেন সার — ইউরিয়া। আর ইউরিয়া তৈরির মূল কাঁচামাল হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। ইরান বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদকারী দেশ। এই বিশাল গ্যাস মজুদকে কাজে লাগিয়ে ইরান পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইউরিয়া ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানিকারক দেশে।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরানের সার রপ্তানি চলতে থেকেছে, বিশেষত এশিয়া ও আফ্রিকার বাজারে। কিন্তু সামরিক সংঘাত শুরু হলে পরিস্থিতি আমূল বদলে যাবে। ইরানের সার কারখানাগুলো সরাসরি হামলার লক্ষ্য হতে পারে, অথবা গ্যাস পাইপলাইন ও পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে রাতারাতি বিশ্ববাজারে লক্ষ লক্ষ টন সারের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দামে। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় মাত্র কয়েক মাসে ইউরিয়ার দাম তিনগুণ বেড়ে গিয়েছিল। ইরান যুদ্ধ হলে সেই পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা আছে, কারণ এবার মধ্যপ্রাচ্যের একটি বড় অংশ একসঙ্গে অস্থির হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশের মতো দেশের কথা ভাবুন, যেখানে ধান, পাট ও সবজি চাষে ইউরিয়ার চাহিদা বিশাল। সার আমদানি ব্যয় বাড়লে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, সেই বোঝা যাবে ভোক্তার ঘাড়ে — অর্থাৎ বাজারে খাদ্যদ্রব্যের দাম লাফিয়ে উঠবে।

হরমুজ প্রণালি: বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক সংকীর্ণতা

ইরান ও ওমানের উপকূলের মাঝখানে মাত্র ৩৩ কিলোমিটার চওড়া এক সমুদ্রপথ — হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ এই একটি পথ দিয়ে যায়। কেবল তেল নয়, এই পথে যায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য এবং সার।
হরমুজ বন্ধ হয়ে গেলে বা বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে জ্বালানি তেলের দাম আকাশছোঁয়া হবে। তেলের দাম মানে শুধু পেট্রোল বা ডিজেল নয়। তেলের দাম বাড়লে কৃষিতে সেচের খরচ বাড়ে, ট্র্যাক্টর চালানোর খরচ বাড়ে, ফসল কাটা ও মাড়াইয়ের খরচ বাড়ে। সবজি থেকে শস্য — সব কিছু বাজারে আনতে যে যানবাহন দরকার, সেটার জ্বালানির দাম বাড়ে। ফলে প্রতিটি খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ব্যয় ও পরিবহন ব্যয় একসঙ্গে বেড়ে যায়।
শস্যের বাজারে ধাক্কা: গম থেকে ভুট্টা, সব কিছুতেই আগুন

মধ্যপ্রাচ্য শুধু তেলের জন্য নয়, খাদ্যশস্যের জন্যও অনেকটাই নির্ভরশীল বাইরের উপর। ইরান, ইরাক, সৌদি আরব, মিশর — এই দেশগুলো বিশ্বের অন্যতম বড় গম আমদানিকারক। যুদ্ধ হলে এই দেশগুলো আতঙ্কিত হয়ে একসঙ্গে বিশাল পরিমাণে গম কিনতে ছুটবে, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হবে এবং দাম একলাফে অনেক উপরে উঠে যাবে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ঠিক এটাই হয়েছিল। সেই দুই দেশ মিলে বিশ্বের গম রপ্তানির প্রায় ৩০ শতাংশ সরবরাহ করত। যুদ্ধের কারণে সেই সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক গমের দাম কয়েক মাসে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশ, মিশর, লেবানন, তিউনিসিয়াসহ অনেক দেশে রুটি ও আটার দাম নাগালের বাইরে চলে গিয়েছিল।
ইরান যুদ্ধে সেই প্রভাব আরো জটিল হবে। কারণ এবার শুধু শস্যের সরবরাহ নয়, একসঙ্গে তেল, গ্যাস, সার এবং বৈশ্বিক শিপিং রুট — সব কিছুতেই ধাক্কা আসবে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিশ্লেষকরা একে বলছেন ‘মাল্টিপল শক’ বা একাধিক ধাক্কার পরিস্থিতি, যেখানে প্রতিটি সমস্যা অন্যটিকে আরো বাড়িয়ে দেয়।

জলবায়ু পরিবর্তন ও ভঙ্গুর খাদ্য ব্যবস্থা: ইরান যুদ্ধ হবে ‘শেষ পেরেক’

পৃথিবীর খাদ্য ব্যবস্থা এখন এমনিতেই টলটলায়মান। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, খরা এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ফসলের উৎপাদন অনিশ্চিত করে তুলছে। এল নিনো ও লা নিনার প্রভাবে এশিয়া ও আফ্রিকায় কৃষি মৌসুম বিপর্যস্ত হচ্ছে। ইতিমধ্যে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
এই ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে ইরান যুদ্ধ যদি যোগ হয়, তাহলে যা হবে তা একটি সাধারণ সংকট নয়, বরং এটি হবে একটি মিলিত বিপর্যয়। জ্বালানি দামের ঊর্ধ্বগতি, সারের ঘাটতি, শিপিং বিঘ্ন এবং বিনিয়োগকারীদের আতঙ্ক একসঙ্গে কাজ করলে খাদ্যদ্রব্যের বাজার এমন পর্যায়ে যেতে পারে যেখানে গরিব দেশের মানুষের পক্ষে দুবেলা খাবার জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়বে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) ইতিমধ্যে সতর্কবার্তা দিচ্ছে যে মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো বড় সংঘাত বিশ্বব্যাপী খাদ্য সাহায্য কর্মসূচিকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে, কারণ সাহায্য সামগ্রী পরিবহনের রুট বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশ: বিপদ কতটা কাছে?
বাংলাদেশের জন্য বিপদটা আসলে অনেক কাছে। বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৬০ লক্ষ টনেরও বেশি জ্বালানি তেল আমদানি করে, যার বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। তেলের দাম বাড়লে বিদ্যুতের দাম বাড়বে, সেচের খরচ বাড়বে, পরিবহন ব্যয় বাড়বে — এবং এই সব কিছু মিলিয়ে দেশের মূল্যস্ফীতি লাফিয়ে উঠবে।
এর পাশাপাশি, বাংলাদেশ প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ গম আমদানি করে — মূলত রাশিয়া, ইউক্রেন ও ভারত থেকে। ইরান যুদ্ধ হলে বৈশ্বিক গমের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হবে, তা বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়কে আরো বাড়িয়ে দেবে। আর সার সংকটে যদি দেশীয় কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়, তাহলে দ্বিমুখী চাপে পড়বে খাদ্য ব্যবস্থা।
প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি আছে। বাংলাদেশের কয়েক লক্ষ শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত। যুদ্ধের কারণে এই দেশগুলোর অর্থনীতি বিপর্যস্ত হলে শ্রমিকরা দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হতে পারেন, রেমিট্যান্স কমে যেতে পারে — এবং সেটি আবার দেশের সার্বিক আমদানি সক্ষমতাকে দুর্বল করবে।

কী করা যেতে পারে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঝুঁকি থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকা সম্ভব নয়, তবে সতর্কতা নিলে ক্ষতি কমানো যায়।
প্রথমত, সারের মজুদ বাড়ানো এখনই শুরু করা দরকার। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে কম করে তিন থেকে ছয় মাসের সার মজুদ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সার আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করা দরকার — শুধু মধ্যপ্রাচ্য বা রাশিয়ার উপর নির্ভরতা কমিয়ে কানাডা, মরক্কো ও অন্যান্য দেশ থেকে আমদানির বিকল্প তৈরি করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, জৈব সার ও প্রাকৃতিক কৃষি পদ্ধতির প্রচলন বাড়ানো দরকার, যাতে রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে কমে। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সক্রিয় থাকা দরকার — ইরান ঘিরে উত্তেজনা যাতে সামরিক সংঘাতে না গড়ায়, তার জন্য বহুপাক্ষিক আলোচনার পরিসর তৈরিতে ছোট ও মাঝারি দেশগুলোকেও কণ্ঠ তুলতে হবে।
খাদ্য কখনো শুধু খাবার নয় — এটি রাজনীতি, এটি ক্ষমতা, এটি বেঁচে থাকার লড়াই। ইরান যুদ্ধের পরিণতি শেষ পর্যন্ত মিলিটারি মানচিত্রে নয়, লেখা হবে বিশ্বের কোটি মানুষের খালি থালায়।


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও