…………….নজরুল ইসলাম ……………….

মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ইতিহাস। ভাষার জন্ম, পরিবারের বিকাশ, সমাজ ও রাষ্ট্রের নির্মাণ—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল পারস্পরিক সংযোগ, বিশ্বাস, ভালোবাসা এবং সহমর্মিতা। মানুষ শুধু যুক্তিবোধের জন্য মানুষ নয়; সে মানুষ তার অনুভূতির জন্য, অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসতে পারার জন্য, দুঃখের সময় একটি সান্ত্বনার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর একবিংশ শতাব্দীতে আমরা এমন এক অদ্ভুত বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে যোগাযোগের মাধ্যম যত বিস্তৃত হচ্ছে, ততই সম্পর্কের গভীরতা সংকুচিত হচ্ছে। পৃথিবী যেন হাতের মুঠোয় এসেছে, অথচ মানুষ ধীরে ধীরে মানুষের কাছ থেকেই দূরে সরে যাচ্ছে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি মানবসভ্যতার এক অনন্য অর্জন। এটি জ্ঞান, তথ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা ও যোগাযোগকে অভূতপূর্ব গতিশীলতা দিয়েছে। কিন্তু প্রতিটি প্রযুক্তির মতো এরও একটি নৈতিক সীমারেখা আছে। যখন প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন সে আর কেবল একটি যন্ত্র থাকে না; বরং মানুষের সময়, মনোযোগ ও অনুভূতির ওপর আধিপত্য বিস্তারকারী এক অদৃশ্য শক্তিতে পরিণত হয়। আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবিরাম নোটিফিকেশন, অন্তহীন স্ক্রলিং এবং ভার্চুয়াল স্বীকৃতির প্রতিযোগিতা সেই আধিপত্যেরই বহিঃপ্রকাশ।

আজকের নগরজীবনের এক নীরব দৃশ্য আমাদের গভীরভাবে ভাবায়। একই পরিবারের সদস্যরা একই ছাদের নিচে থেকেও যেন ভিন্ন ভিন্ন ভার্চুয়াল মহাবিশ্বে বসবাস করছেন। ডাইনিং টেবিলে কথোপকথনের জায়গা দখল করেছে স্মার্টফোনের আলো; শিশুর প্রথম গল্প শোনানোর পরিবর্তে তার হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে পর্দা; বন্ধুদের আড্ডায় হাসির চেয়ে ক্যামেরার ফ্রেমের গুরুত্ব বেশি। সম্পর্কের ভাষা ধীরে ধীরে ইমোজিতে সীমাবদ্ধ হচ্ছে, অথচ মানুষের হৃদয়ের অভিধানে এখনো কোনো ইমোজি চোখের জলের উষ্ণতা কিংবা আলিঙ্গনের নিশ্চয়তাকে ধারণ করতে পারেনি।

এই পরিবর্তন কেবল সামাজিক আচরণের নয়; এটি এক গভীর সাংস্কৃতিক রূপান্তর। মানুষ আজ নিজের বাস্তব অস্তিত্বের চেয়ে ভার্চুয়াল পরিচয় নির্মাণে অধিক মনোযোগী। অনুসারীর সংখ্যা, লাইক, শেয়ার কিংবা মন্তব্য যেন আত্মমর্যাদার নতুন পরিমাপক হয়ে উঠেছে। অথচ জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পর্কগুলো কখনো সংখ্যায় মাপা যায় না। মায়ের স্নেহ, বাবার নির্ভরতা, সন্তানের হাসি কিংবা বন্ধুর কাঁধ—এসবের কোনো ডিজিটাল বিকল্প নেই। মানুষকে মানুষ করে তোলে যে অনুভূতির জগৎ, সেটি অ্যালগরিদমের ভাষায় অনুবাদ করা সম্ভব নয়।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই পরিবর্তনের অভিঘাত পড়ছে শিশু ও তরুণ প্রজন্মের ওপর। তারা এমন এক পৃথিবীতে বেড়ে উঠছে, যেখানে বাস্তব খেলাধুলার মাঠ ছোট হচ্ছে, কিন্তু ভার্চুয়াল গেমের পরিসর ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে। প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় কমছে, মানুষের সঙ্গে কথোপকথন কমছে, কিন্তু পর্দার সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হচ্ছে। এর ফলে সহমর্মিতা, ধৈর্য, সামাজিক দক্ষতা এবং পারিবারিক বন্ধনের মতো মানবিক গুণাবলি ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। একাকিত্ব, উদ্বেগ ও মানসিক অবসাদও বাড়ছে নীরবে।

তবে প্রযুক্তিকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। সভ্যতা কখনো প্রযুক্তিবিরোধী হয়ে এগোয়নি; বরং প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণের উপযোগী করে তুলেই অগ্রসর হয়েছে। তাই আমাদের প্রয়োজন প্রযুক্তির ব্যবহার নয়, প্রযুক্তির সংস্কৃতি বদলানো। ডিজিটাল দক্ষতার পাশাপাশি গড়ে তুলতে হবে ডিজিটাল সংযমের চর্চা। পরিবারে প্রতিদিন কিছু সময় ‘স্ক্রিন-মুক্ত সময়’ নিশ্চিত করা, শিশুদের বই, খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চায় উৎসাহিত করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগকে বাস্তব জীবনের সম্পূরক হিসেবে ব্যবহার করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা আজ সময়ের দাবি।

এখানে রাষ্ট্রেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পাশাপাশি মানবিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যও সমান গুরুত্ব পেতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য, পারিবারিক মূল্যবোধ, নাগরিক সংস্কৃতি এবং সামাজিক সংহতির প্রশ্নকে সমান গুরুত্ব না দিলে উন্নয়নের ভিত একসময় ভঙ্গুর হয়ে পড়বে। উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড কেবল ইন্টারনেটের গতি নয়; বরং মানুষের মধ্যে বিশ্বাস, সহমর্মিতা ও সামাজিক আস্থার গভীরতা।

সভ্যতার প্রতিটি যুগ মানুষকে একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। আমাদের সময়ের সেই প্রশ্নটি সম্ভবত এই—আমরা কি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছি, নাকি প্রযুক্তিই আমাদের ব্যবহার করছে? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ সমাজের চরিত্র। কারণ মানুষের হাতের স্মার্টফোন যতই আধুনিক হোক, মানুষের হৃদয় যদি ক্রমশ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে, তবে সেই অগ্রগতি অসম্পূর্ণ।

শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে, মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নয়, মানবিক বুদ্ধিমত্তা; দ্রুতগতির ইন্টারনেট নয়, আন্তরিক সম্পর্ক; ভার্চুয়াল উপস্থিতি নয়, বাস্তব সান্নিধ্য। পর্দার আলো সাময়িকভাবে চোখকে আলোকিত করতে পারে, কিন্তু মানুষের মুখোমুখি বসে ভাগ করে নেওয়া একটি আন্তরিক মুহূর্তই হৃদয়কে আলোকিত করে। প্রযুক্তির যুগে তাই সবচেয়ে বড় প্রজ্ঞা হবে—পর্দাকে জীবনের অংশ রাখা, কিন্তু জীবনের কেন্দ্র না বানানো। কারণ সভ্যতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে প্রযুক্তির উৎকর্ষের ওপর যতটা, তার চেয়েও বেশি মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের উষ্ণতা রক্ষার ওপর।

লেখকঃ – নজরুল ইসলাম, গণমাধ্যম ও সমাজকর্মী
nazrulnews1970@gmail.com
০১৯১৯ ৫৩ ৫২ ৮৪
৩১.৭.২০২৬

লেখাটি একান্তই লেখকের নিজস্ব অভিব্যক্তি। এরজন্য সম্পাদক বা কর্তৃপক্ষ দায়ি নয়।