মো. বিল্লাল মোল্লা, কুমিল্লা উত্তর: কুমিল্লার তিতাস উপজেলার চর দখলকে কেন্দ্র করে পার্শ্ববর্তী মেঘনা উপজেলার চর বিনোদপুর ও আলীপুর গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে তিতাস উপজেলার নতুন বাটেরাচর গ্রামের লোকজনের সংঘর্ষে এক নারী নিহত হওয়ার ঘটনার পর থেকে নতুন বাটেরাচর গ্রামে এখনো পর্যন্ত হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, নিহতের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় নিরীহ মানুষকে আসামি করায় প্রায় ৯০টি পরিবার ঘটনার দিন থেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কেউ রাস্তার পাশে, কেউ গাছতলায়, কেউ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে, আবার কেউ আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

এরই প্রতিবাদে শনিবার (১ আগস্ট) সকাল ১১টায় উপজেলার মজিদপুর ইউনিয়নের নতুন বাটেরাচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর উদ্যোগে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত নারী সদস্যরা অভিযোগ করেন, হত্যা মামলার ভয়ে গ্রামের পুরুষরা আত্মগোপনে থাকায় পুরো গ্রাম প্রায় পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে।

তাদের অভিযোগ, সংঘর্ষের পর থেকে তাদের ঘরবাড়িতে একাধিকবার হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা, বালুর শিপ, ট্রলার, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, ঘরের আসবাবপত্রসহ প্রায় ৯০টি পরিবারের আনুমানিক সাত কোটি টাকার মালামাল লুট করে নেওয়া হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, গত ২৬ জুলাই রবিবার দুপুরে তিতাস উপজেলার মজিদপুর ইউনিয়নের নতুন বাটেরাচর গ্রামের প্রবাসী মো. শাহবাজ ও মজনু মিয়া ব্যক্তিগত কাজে মেঘনা উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে গেলে চর বিনোদপুর গ্রামের আলী আকবর ও তার সহযোগীরা তাদের মারধর করে আটকে রাখে। খবর পেয়ে নতুন বাটেরাচরের লোকজন সেখানে গিয়ে তাদের উদ্ধার করে নিয়ে আসে। এ ঘটনার জের ধরে ওই দিন বিকেলে মেঘনার আলীপুর ও চর বিনোদপুর গ্রামের লোকজনের সঙ্গে তিতাসের নতুন বাটেরাচর গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে টেঁটাযুদ্ধ শুরু হয়। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলা সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ৪০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে তিতাসের ১০ জন এবং মেঘনার ৩০ জন রয়েছেন বলে জানা যায়। সংঘর্ষের পর নতুন বাটেরাচরের প্রায় ২০টি বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয় বলে অভিযোগ করা হয়।

সংঘর্ষ চলাকালে মেঘনা উপজেলার চর বিনোদপুর গ্রামের কুহিনূর আক্তার (৩৮) গলায় টেঁটা বিদ্ধ হলে ঘটনাস্থলেই মারা যান। এ ঘটনায় নিহতের স্বামী কাবিল মিয়া বাদী হয়ে নতুন বাটেরাচর গ্রামের ৬১ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় এজাহারভুক্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে মেঘনা থানা পুলিশ। এরপর থেকেই গ্রেপ্তার আতঙ্কে নতুন বাটেরাচর গ্রাম প্রায় নারী-পুরুষশূন্য হয়ে পড়ে। ভুক্তভোগীদের দাবি, ঘটনার দিন থেকে আজ পর্যন্ত গ্রামে লুটপাট ও আতঙ্কের পরিবেশ অব্যাহত রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে গ্রামবাসীর পক্ষে লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, দীর্ঘদিনের জমি-সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে এলাকায় একাধিক হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও হয়রানিমূলক মামলা হয়েছে। এতে বহু পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এবং অনেকেই এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বলে দাবি করা হয়।

লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়, একটি বৈঠকে স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূইয়া মহোদয় ,

আইনগতভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির আশ্বাস দিলেও পরবর্তীতে তারা অমান্য করে। এরপর প্রতিপক্ষের হামলায় কয়েকজন আহত হন এবং পরবর্তীতে নদীর তীরে এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। তাদের অভিযোগ, সুনির্দিষ্ট ফরেনসিক ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছাড়াই নিরীহ মানুষকে আসামি করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে গ্রামবাসী তিন দফা দাবি তুলে ধরেন। তাদের দাবিগুলো হলো— এক নারীর মৃত্যুর ঘটনায় ফরেনসিক ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা, হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

উপস্থিত গ্রামবাসীরা বলেন, তারা কোনো প্রতিশোধ চান না; বরং সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন— এটাই তাদের একমাত্র প্রত্যাশা।